চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

র‌্যাব-পুলিশ ‘দ্বন্দ্ব’ এবং নাগরিক ভীতি

গত সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো র‌্যাব মহাপরিচালকের একটি চিঠি এবং সবশেষ ২৬ অক্টোবর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান কর্তার একটি সংবাদ সম্মেলনে এ দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা– আরও পরিস্কার করে বললে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা নাগরিক হিসেবে আমাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। কারণ দেশের প্রধানতম দুটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই দূরত্ব কিংবা বৈরিতা আরও বেশি ঘণীভূত হলে এটি আখেরে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই হুমকিতে ফেলবে।

র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল পুলিশেরই একটি এলিট ফোর্স হিসেবে, যারা বড় বড় অপরাধ বিশেষ করে জঙ্গি দমনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। কিন্তু সম্প্রতি জঙ্গি দমনে পুলিশেরই বিশেষায়িত শাখা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটও একইভাবে জঙ্গি দমনে বেশকিছু সফল অভিযান চালিয়েছে। এ দুই বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্বের পেছনে ‘ক্রেডিট নেয়ার এই প্রতিযোগিতা’ কতখানি দায়ী, তা নাগরিকদের জানার কথা নয়। তবে জঙ্গি দমন ইস্যুতে তাদের মধ্যে যে একটা প্রতিযোগিতা আছে, তা র‌্যাব মহাপরিচালক এবং কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট প্রধানের বক্তব্যে কিছুটা আঁচ করা যায়।

গত ৮ অক্টোবর ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে পাঁচতলা একটি ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ বিষয়ে ২১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ দাবি করেন, আব্দুর রহমানই জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির প্রধান। তার মূল নাম সারোয়ার জাহান। আর সাংগঠনিক নাম শায়খ ইব্রাহিম আবু হানিফ। র‌্যাবের দাবি, ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাসহ ১৮টি নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারী নব্য জেএমবি।

কিন্তু ২৬ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম র‌্যাবের ওই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, নিহত সারোয়ার জাহান নব্য জেএমবির প্রধান নন; বরং তিনি মধ্যম সারির নেতা। আর ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যায় নব্য জেএমবি জড়িত-এমন বক্তব্যও নাকচ করে দেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব জানিয়েছিল, নব্য জেএমবির ২১ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, নব্য জেএমবির কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা ডিএমপি বা ডিবির কাছে নেই।

এই ঘটনার আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশের বিরুদ্ধে র‍্যাব সদস্যদেরকে হেনস্থা করার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেন র‌্যাব মহাপরিচালক; যেখানে তিনি উল্লেখ করেন, দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে। সংঘর্ষে জড়াতে পারে র‍্যাব-পুলিশ। র‍্যাবের দাবি, অনেক সময় পরিচয় পাওয়ার পরও র‌্যাব সদস্যদের হেনস্থা করছে পুলিশ। কিছু কিছু ঘটনায় র‍্যাব সদস্যদের লাঠি এবং রাইফেল দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

যদিও র‌্যাব-পুলিশের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হলে সেটি সরাসরি নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি বিষয়টিকে র‍্যাব-পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে বলেন, ঘরের মধ্যে ভাইবোনের মধ্যেও তো ঝগড়াঝাটি হয়।

asad

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে নাগরিকদের খুব বেশি আশ্বস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব-পুলিশের দ্বন্দ্ব এবং জঙ্গি দমন ইস্যুতে তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। সমস্যাকে অস্বীকার করা মানে সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া। সুতরাং দ্রুত এই দুই বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন না হলে এবং তাদের মধ্যে যুক্তিপূর্ণ ভারসাম্য বা চেক অ্যান্ড ব্যালান্স তৈরি না হলে, এ মুহূর্তের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ জঙ্গি দমন অভিযান ব্যাহত হবে।

যদি এই দুই বাহিনীর মধ্যে রেষারেষি অব্যাহত থাকে তাহলে এমন ঘটনা ঘটাও অস্বাভাবিক নয় যে, অভিযানে কেউ নিহত হবার পরে র‌্যাব সংবাদ সম্মেলনে নিহতকে জঙ্গি বলে দাবি করলো, কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হলো যে, নিহত ব্যক্তি জঙ্গি কি না বা নব্য জেএমবির নেতা কি না, তা নিশ্চিত নয়। যদি এরকম ঘটনা ঘটে তাহলে পুরো জঙ্গিবিরোধী অভিযানই প্রশ্নের মুখে পড়বে– যা কারোরই কাম্য নয়। তাছাড়া রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাহিনীর মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকে এবং যদি তারা পরস্পরের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই অভিযানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করে,তাহলে কখনো সখনো নিরপরাধ লোকের ফেঁসে যাওয়া বা নিহত হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাবে। আবার বড় দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে জঙ্গি ও অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠী এর সুযোগ নেবে। এমনকি সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও এর থেকে ফায়দা নেয়ার সুযোগ খুঁজবে।

প্রশ্ন হলো, র‌্যাব-পুলিশের মধ্যে কেন এই বৈরিতা? বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সশস্ত্র বাহিনী থেকে আসা কর্মকর্তারা তাদের সহযোগী পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সেনাবিদ্বেষী মনোভাবের অধিকারী বলে মনে করেন। এজন্য পুলিশ সদস্যরা সামরিক বাহিনী থেকে আসা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানতে চান না। আবার র‌্যাবে থাকা পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা হয়তো মনে করেন, সেনা কর্মকর্তাদের ফৌজদারি আইন, পুলিশ প্রবিধান সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। তাছাড়া র‌্যাব পুলিশ বাহিনীর অঙ্গ এবং এর শীর্ষ নেতৃত্বে পুলিশ কর্মকর্তা থাকলেও অভিযানে মুখ্য ভূমিকায় থাকেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। সুতরাং পরস্পরের প্রতি এই ধারণাগত সমস্যা এবং মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব র‌্যাব-পুলিশের মধ্যে বৈরিতার একটা বড় কারণ বলে অনেকে মনে করেন।

তবে কারণ যাই হোক, রাষ্ট্র ও নাগরিক নিরাপত্তার স্বার্থে এ দুই বাহিনীর মধ্যে বৈরিতা শূন্যে নামিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই এবং সেটি করতে হবে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক পর্যায় থেকে। আইনত র‌্যাব যেহেতু পুলিশের অঙ্গ, সুতরাং এটি পুলিশের আওতায় থাকবে এটিই স্বাভাবিক। তেমনি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বাদ দিলে এ বাহিনীটি অকার্যকর হয়ে পড়বে- এমন আশঙ্কাও রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেকেই যাতে ন্যায্য ও প্রাপ্য মর্যাদা লাভ করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। র‌্যাবকে পুলিশ থেকে আলাদা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত অভিজাত বাহিনী গঠনের পরামর্শও কেউ কেউ দিয়েছেন। কিন্তু সেটিও একেবারেই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বিষয়; যেখানে সাধারণ নাগরিকের কোনো কথা বলা বা মতামত দেয়ার আপাদৃষ্টিতে কোনো সুযোগ নেই।

সর্বোপরি কথা হচ্ছে, নামে র‌্যাব-পুলিশ-কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট অথবা অন্য যা কিছুই হোক না কেন, সাধারণ নাগরিক আসলে চায় নিরাপত্তা। তারা চায় দেশ জঙ্গিমুক্ত হোক। মানুষ নিরাপদে পথ চলুক। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। আর সেটি নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ এবং তাদেরই এলিট ফোর্স র‌্যাবের মধ্যে সমন্বয় ও সুসম্পর্কের বিকল্প নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)