চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রোগীর জন্য ডাক্তারের সময় মাত্র ৪৮ সেকেন্ড

গ্রাম থেকে ঢাকায় একবার ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন সাধন বসু। এক ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন তিনি। এর আগে এলাকাতে অনেক ডাক্তারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, সমাধান মেলেনি। এবার সেসব ছেড়ে ঢাকায় এসে ডাক্তার দেখানোর পরে তার মূল অভিযোগ হচ্ছে, এখানে ডাক্তাররা সময়ই দিতে চাননা। সমস্যার কথাগুলোই মন দিয়ে শোনেন না, সমাধান দেবেন কি!

বিজ্ঞাপন

একই কথা ছিলো আদুরি বেগমেরও। মানসিক স্বস্তি না পাওয়ার আভাষ টের পাওয়া যায় তার কথায়। যদিও শারীরিক সমস্যা অনেকখানিই নিয়ন্ত্রণের পথে।

বাংলাদেশি ডাক্তারদের নিয়ে রোগীদের প্রধান অভিযোগ ডাক্তার সময় দেননা। সময় নিয়ে শোনেন না সমস্যার কথা। তাহলে সমাধান কি দেবেন?

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার একটি গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের ডাক্তাররা রোগীদের সময় দেন মাত্র ৪৮ সেকেন্ড। ৬৭টি দেশের ২ কোটি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার ডাক্তারি সেবার উপর পরিচালিত জরিপে এ চিত্র উঠে আসে। ১১১ টি প্রকাশনার মাধ্যমে ১৭৯টি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় আন্তর্জাতিক মেডিকেল সেবা সংক্রান্ত জার্নাল বিএমজেতে।

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুইডেনের ডাক্তাররা যেখানে প্রতিটি রোগীর পেছনে ২২.৫ মিনিট সময় ব্যয় করেন, সেখানে বাংলাদেশের ডাক্তাররা মাত্র ৪৮ সেকেন্ড সময় ব্যয় করেন।

তবে এই সমস্যার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের কোনো দোষ দেখছেন না বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইহতেশামুল হক। তিনি বলেন, এটা একটা গবেষণা রিপোর্ট। এতে বাংলাদেশের ডাক্তারদের কোনো দোষ আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।। একে আমাদের দেশের রোগীর তুলনায় ডাক্তারদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। প্রতিটি দেশে পরিকল্পনামাফিক হাসপাতাল থাকে, আমাদের দেশে সেটা নেই। ফলে একজন ডাক্তারকে দিনে ১৫০ থেকে ২৫০ জন রোগী দেখতে হয়। এত এত রোগীকে সময় দিতে হলে সেটা অবশ্যই সময়ের হিসেবে কমে আসবে।

বিজ্ঞাপন

তবে এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয় রোগীকেই। ইহতেশামুল হক বলেন, ডাক্তার রোগীর সব ধরনের সমস্যা খুটিয়ে খুটিযে জানতে চাইবেন। সেটা না হলে রোগীর তো মানসিক স্বস্তিও হবে না। তাছাড়া আমাদের দেশে রোগীর রেফারেন্সের সুযোগটা খুবই কম। সারা বিশ্বে স্ট্রং রেফারেন্সের ব্যবস্থা থাকে যেটা আমাদের দেশে নেই। মানে দেখা যায়, যাদের ডাক্তার দেখানোর দরকার তারা তো দেখায়, তার পাশাপাশি রোগীর সমস্যা ছোট হলে তারাও হুট করেই হাসপাতালে ঢুকে পড়ে ডাক্তার দেখানোর জন্য। এই কারণেই আরো বেশি সমস্যায় ভুগছে যারা সত্যিকারের রোগী তারা। ডাক্তারকে তো সবাইকেই চিকিৎসা দিতে হয়। ফলে চাপ বাড়তেই আছে।

তবে এই গবেষণার উপরে ততটা ভরসা রাখতে চাননা বারডেমের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত শিশু বিশেষজ্ঞ ফাহমিদা রহমান লুনা বলেন,  একজন রোগীকেই আমাদের অনেক সময় নিয়ে দেখতে হয়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য তো অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। তাদের চিকিৎসার জন্য তৈরি করতেই অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়, তারপরে না চিকিৎসা। তাই এই গবেষণা রিপোর্টটি সঠিক তথ্য দিচ্ছে বলে আমি মনে করি না।

সমস্যা সমাধানে একটা রেফারেন্সের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো বলে মনে করেন ইহতেশামুল হক। এতে করে কোন রোগীর কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে যাবে নাকি সাধারণ চিকিৎসকের কাছেই তার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে সেটা বুঝতে পারতো। সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকেই। সরকার যদি দেশের রোগী সংখ্যা অনুসারে ডাক্তারদের বিভাজন করে রাখে এবং কোন জায়গায় কত ডাক্তার থাকবে সেটা নির্ধারণ করে রাখে তাহলে এই সমস্যা থেকে সমাধান পাওয়া সম্ভব। তারা সিদ্ধান্ত নিবে ডাক্তার রোগীকে ১ ঘণ্টা সময় দিতে পারবেন নাকি ১০ সেকেন্ড সময় দিবেন। তারা লোকসংখ্যা অনুযায়ী ডাক্তারের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন।

এছাড়া আরেকটি সমাধানের কথা বলেন তিনি, যেসব রোগীর ভাবনা হচ্ছে, ডাক্তারের পথ দিয়েই যাচ্ছি তাহলে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ নিয়ে নেই, সেই রোগীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে আমাদের সমস্যার আরো সমাধান হতো।

একই কথা বলছিলেন ফাহমিদা রহমান লুনা, এই সমস্যা সমাধান আনতে দরকার ম্যানেজমেন্ট। সেটা করতে পারলেই রোগি তার প্রাপ্য সুবিধাটুকু পাবে।স্বনামধন্য মেডিকেল জার্নাল বিএমজেতে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ডাক্তারদের কাছ থেকে মাত্র ৫ মিনিটেরও কম সময় পেয়ে থাকেন। এছাড়া ঐ দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যয়ও তুলনামূলক অনেক বেশি বলে জানিয়েছে প্রতিবেদনটি।

গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৫টি দেশের ডাক্তাররা রোগী দেখার ক্ষেত্রে ৫ মিনিটেরও কম সময় দিয়ে থাকে। ২৫টি দেশের ডাক্তাররা ৫-৯.৯ মিনিট, ১১ টি দেশের ডাক্তাররা ১০-১৪.৯ মিনিট, ১৩ টি দেশ ১৫-১৯.৯ মিনিট সময় দিয়ে থাকে। তিনটি দেশের ডাক্তাররা তার রোগীদের ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় দিয়ে থাকে।

প্রতিবেদনে  আরো বলা হয়, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট পদ্ধতি চালু নেই । ফলে, ডাক্তাররা প্রতিদিন ৯০ জন বা তারও বেশি রোগী দেখে থাকেন। শুধু তাই নয়, পুনরায় সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা যথেষ্ট পরিমাণ টাকা  আদায় করেন।