চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ: রাশিয়া-চীনের সমালোচনায় সমাজতন্ত্রীরা

পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের জাল ভেঙে যে অক্টোবর বিপ্লবের ফলে জন্ম নিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া এবং পরবর্তীতে সমাজতান্ত্রিক চীন, সেই বিপ্লবের আদর্শ থেকে সরে আসায় এই দুই রাষ্ট্রের সমালোচনায় মুখর হলেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সমাজতন্ত্রীরা।

বিজ্ঞাপন

অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান থেকে তারা বললেন, বিপ্লবের মূল চেতনা থেকে সরে আসায় রাশিয়া আজ মাফিয়াদের রাজ্যে পরিণত হয়েছে, চীন হয়েছে গণহত্যার সহযোগী।

ব্যক্তি মালিকানার বিশ্বকে বদলে দিয়ে সামাজিক মালিকানার মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার স্লোগান নিয়ে শুক্রবার বিকেলে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন।

উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেন তেল গ্যাস, খনিজ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য-সচিব অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বামপন্থী নেতারা।



অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন: অনেকে বলেন সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেছে। কিন্তু না, সমাজতন্ত্রের পতন ঘটেনি। কয়েকটি রাষ্ট্র কেবল এ চেতনা থেকে সরে এসেছে। কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত মুক্তির জন্য সমাজতন্ত্র অনিবার্য।

তিনি বলেন: সমাজতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হলে সমাজের কী দশা হয়, রাশিয়ায় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মেয়েরা সেখানে যে মাত্রার মুক্তি পেয়েছিল, পুঁজিবাদী বিশ্বে তা ছিল অকল্পনীয়। বিচ্যুত রাশিয়াতে দেখা গেছে সেই মেয়েদের একাংশ আশ্রয়হীন হয়ে পণ্য হিসেবে নিজেদের দেহকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে ইউরোপে, আমেরিকায়। যে অধ্যাপক গবেষণা করতেন, দেখা গেছে তিনি ভিক্ষায় বের হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

চীনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এা ইমেরিটাস অধ্যাপক বলেন: চীন যখন সমাজতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হলো, তখন টের পাওয়া গেল তারা ভয়ংকর রকমের জাতীয়তাবাদী হয়ে পড়েছে। ওই জাতীয়তাবাদ পুঁজিবাদী। তার দুর্বার প্ররোচনায় চীন এখন ফ্যাসিবাদী তৎপরতাকে সমর্থন দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন: যে ঘটনা একাত্তরে আমরা দেখেছি, এখন তা দেখছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গারা শিকার হচ্ছে নির্বিচার গণহত্যার, নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, শিশুরা পিতৃত্বহীন হয়ে পড়ছে। চীন সবকিছুই জানে। কিন্তু চীনের পুঁজিবাদী সরকার নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ায়নি, দাঁড়িয়েছে পীড়নকারী মিয়ানমার সরকারের পক্ষে।

‘পুঁজিবাদীদের কেউ কেউ তবু রোহিঙ্গাদের জন্য তথাকথিত মানবিক সাহায্য পাঠাচ্ছে, চীন ততটুকুও করবে না। কারণ, মিয়ানমার সরকার চীনকে নানা রকমের অর্থনৈতিক সাহায্য দেবে, রোহিঙ্গারা তো কিছুই দিতে পারবে না। রাশিয়াও চীনের মতোই আচরণ করছে। যে ভারত একাত্তরে আমাদের দেশের এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা, সাহায্য সরবরাহ করেছে, সে-ও দাঁড়িয়েছে মিয়ানমারের পক্ষে। কারণ একই। পুঁজিবাদী স্বার্থ।’

তিনি মনে করেন, একাত্তরের হানাদার, বাংলাদেশের ধর্ষক এবং মিয়ানমারের সেনাসদস্য—সবাই একই আদর্শে দীক্ষিত। সেই আদর্শ পুঁজিবাদ। অক্টোবর বিপ্লব এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন: অক্টোবর বিপ্লবের চেতনা থেকে সরে গিয়ে রাশিয়া এখন মাফিয়াদের রাজ্য। তারা আজ রোহিঙ্গাদের হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মিলায়। বাংলাদেশে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে পুরো দেশকে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেয়। চীন আজ গণহত্যাকে সমর্থন করে।

অক্টোবর বিপ্লবের চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ফলে ইরাক, ইরান, সিরিয়াসহ পৃথিবীতে সব বর্বরতম ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিস্ট সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার আগে সদ্য প্রয়াত সমাজতন্ত্রী জসীম উদ্দিন মণ্ডলের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পর আগামী ৬ নভেম্বর শেষ হবে এ উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতা।