চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রামপাল: ‘আস্থা’র আহ্বান বিশ্বাসে পরিণত হোক

রামপালে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না, তার ‘প্রমাণ’ দিয়ে এই প্রকল্প সরানোর দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতায় আন্দোলনরত একদল পরিবেশবাদী এবং বিএনপি’র সংবাদ সম্মেলনের প্রেক্ষাপটে সরকারের বক্তব্য নিয়ে গত ২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে আসেন সরকার প্রধান।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুকন্যা হিসেবে বাংলাদেশের নাগরিকদের তার উপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে বিরোধিতাকারীদের ‘অপপ্রচারে’ কান না দেয়ার আহ্বানও জানান তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নজির দেখানোর পাশাপাশি সুন্দরবনে যে কোনো দূষণ এড়াতে নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। এরপর রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গুরুত্ব তুলে ধরে একটি প্রামাণ্যবচিত্রও দেখানো হয়।

সাধারণ জ্ঞানে আমরা জানি, বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ সামুদ্রিক সীমানা। এখানে জাপান ও নেদারল্যান্ডসের মতো নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে, যা হবে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, রামপাল প্রকল্পের জন্য বাগেরহাটে ১৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে (অনেক পরিবারকে উচ্ছেদ করে) বালু ভরাটের মাধ্যমে দু’টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য চুক্তি হয় বাংলাদেশ (বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড; পিডিবি) ও ভারতের (ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন; এনটিপিসি) মধ্যে। এই প্রকল্প হবে বাংলাদেশের পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের মাত্র ৯-১৩ কিলোমিটারের মধ্যেই (যদি সরকারিভাবে দাবি হচ্ছে যে এটি সুন্দরবনের বাফারজোনের ১৪ কিলোমিটার দূরে), যা সুন্দরবনের বনাঞ্চল, পরিবেশ ও জীবসম্পদের জন্য বিপদজনক। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের টিকে থাকার জন্য আশংকাজনক।

এরচেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে এই প্রকল্প হবে কয়লাভিত্তিক। যার নির্মাণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিরুৎসাহিত করা হয় বা হচ্ছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন। কারণ এটি পরিবেশবান্ধব নয় এবং মানুষ ও জীববৈচিত্রের জন্য ক্ষতিকর। যেমন, কানাডা ও ফ্রান্সে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে রয়েছে কঠোর আইন।

পরিবেশবাদীদের সমালোচনা সত্ত্বেও ২০০ কোটি ডলার অর্থায়নে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তিটি করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হবে দুই দেশের সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি নামে একটি কোম্পানিও গঠন করা হয়েছে। এই প্রকল্পের অর্থায়ন করবে ১৫% পিডিবি, ১৫% ভারতীয় পক্ষ আর ৭০% ঋণ নেয়া হবে। যে নীট লাভ হবে সেটা ভাগ করা হবে ৫০% হারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পিডিবি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে।

মাত্র ১৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে ভারতীয় এনটিপিসি ৫০ শতাংশ মালিকানা পাবে এবং পিডিবিকে এনটিপিসি থেকে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অর্থাৎ আমাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমাদের পরিবেশ ও জনপদ নষ্ট করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যের কাছ থেকে আমাদের কিনতে হবে! ধারণা করা হচ্ছে- এই প্রকল্প থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম হবে স্বাভাবিক বাজারমূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ। পিডিবিকে লোকসানজনক ভর্তুকি দিতে হবে অথবা বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। তাছাড়া রয়েছে এই প্রকল্পের জন্য গৃহীত ঋণ ও এর সুদের হার। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের জন্য কতোটা লাভজনক, সেটি বুঝতে আমরা সক্ষম নই।

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র  মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২০ কিমি এর মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় না।  ইআইএ রিপোর্ট অনুসারে প্রস্তাবিত ১৩২০ মেগাওয়াট রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে। সরকার নির্ধারিত সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিমি এনভাইরনমেন্টালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) থেকে ৪ কিমি বাইরে বলে নিরাপদ হিসেবে দাবী করা হয়েছে।  অথচ ভারতীয় এনটিপিসি বাংলাদেশে সুন্দরবনের পাশে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে সেই ভারতেরই ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশান অ্যাক্ট ১৯৭২ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে কোন বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল,  জৈব বৈচিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্যকোন সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না।

বিজ্ঞাপন

ইআইএ রিপোর্টের এক জায়গায় বলা হয়েছে প্রকল্পের স্থানটি একসময় একেবারে সুন্দরবনেরই অংশ ছিল। সেটলার বা বসতি স্থাপনকারীরা বন কেটে আবাসভূমি তৈরী করেছে। “The area is about 14 km northeastwards from the Nalian Range of Sundarbans. Once it was a part of Sundarbans but had been evacuated by the settlers.”(ইআইএ, পৃষ্ঠা ২০৮)

বাস্তবতা হচ্ছে- ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজন ও বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানোর জন্য আমাদের প্রচুর বিদ্যুৎ দরকার। এই দেশে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন না থাকা অনেকটা স্বপ্নতুল্য। ফুরিয়ে আসছে গ্যাসের মজুত। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ক্রয় না করলে অথবা নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন না করলে দেশ জ্বালানি-বিপর্যয়ে পড়বে। বিদ্যুৎ ক্রয় দীর্ঘ মেয়াদিভাবে লাভজনক নয়। তাই আমাদের মনোযোগ দিতে হবে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে। কী ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন দেশের জন্য লাভজনক ও নিরাপদ? কোথায় সেই কেন্দ্র হওয়া উচিত? রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কি অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক এই সুবিধাগুলো প্রদান করবে?

শুধু সুন্দরবন নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের মানুষ ও জনপদের জন্য ব্যাপারটি ক্ষতিকর হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের পাশে বসবাসকারী মানুষজন দীর্ঘমেয়াদে ৩-৬ গুণ বেশি আক্রান্ত হন ক্যানসার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও নিউরোডিজেনারিটিভ স্নায়ুরোগে, যেহেতু কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে সৃষ্ট বায়ু ও জল দূষণ মানুষকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সরকার বলছে যে এই প্রকল্পের ফলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অথচ এই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। যারা এখন ভূমি ও কর্মহীন।

এনটিপিসি যদি এই প্রকল্প ভারতের অংশের সুন্দরবনের আশপাশে করতে চাইতো তবে অনুমতি পেতো না। ভারতীয় আইন মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও জনবসতির ১৫-২৫ কিলোমিটারের মধ্যে এই ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন নেই। তবে এনটিপিসি কেন বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশে এসে ৯-১৩ কিলোমিটার মধ্যে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে আগ্রহী?

উল্লেখ্য, ভারতের মধ্যপ্রদেশে এই এনটিপিসি আরেকটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন পায়নি। তাহলে কী বাংলাদেশ নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে? তাজমহলের সৌন্দর্যহানি যেন না হয় পরিবেশ দূষণের কারণে সেজন্য ভারতীয় সরকার এর আশপাশের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনও ধরনের বিশাল কারখানা (যা পরিবেশ দূষণ করতে পারে), বিমানবন্দর স্থাপন কিংবা বিশাল প্রকল্প স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের দেশে সুন্দরবন সংরক্ষণে এমন আইন তো নেই-ই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, একেকটি প্রকল্প মানে হচ্ছে একেকটি দুর্নীতির উৎস। পদ্মাসেতু সংক্রান্ত দুর্নীতির জন্য কানাডার আদালত পর্যন্ত গিয়েছে। খটকা লাগে পিডিবি ও বাংলাদেশ সরকার এতোসব জনমত, গবেষণা, সমীক্ষা ইত্যাদি উপেক্ষা করে কার স্বার্থে, কী লোভে সুন্দরবনের কাছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে এতো মরিয়া? কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি স্থাপন করতেই হয় তাহলে সেটি উত্তরাঞ্চলের যেকোনও জেলায় কেন নয়?

পৃথিবীর পরিবেশসচেতন মানুষের কাছে এখন ‘রামপাল’ মানে সুন্দরবনবিধ্বংসী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দেশে এবং বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য, সুন্দরবনের কাছে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমেই এর বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিল বন বিভাগ। ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রধান বন সংরক্ষক পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সচিবকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন, সুন্দরবন ‘রামসার সাইট’ সুন্দরবনের অংশ। যার লিগ্যাল কাস্টোডিয়ান বন অধিদফতর। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে এবং ল্যান্ডস্কেপজোনে এমন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে না। যা সুন্দরবন তথা এর রামসার সাইটের জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। কয়লাভিত্তিক পাওয়ারপ্ল্যান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে। প্রধান বন সংরক্ষক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপালে স্থাপনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান চিঠিতে।

২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু কন্যা হিসেবে বাংলাদেশের নাগরিকদের তার উপর ‘আস্থা’ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। আমরা আস্থা রাখতে চাই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই শেষ পর্যায়ে এই প্রকল্প বাতিল হবে। যেমনটি বাতিল হয়েছিলো মুন্সীগঞ্জের আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিমার্ণের প্রকল্প।।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)