চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাবি’র বর্ষবরণে বাদ যাননি বিদেশিরাও

চৈত্র মাস বিদায় দিয়ে আগমনী বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে বৈশাখ। সকল দুঃখ-কষ্ট গ্লানি বিদায় দিয়ে যাত্রা শুরু করেছে নতুন বছর। নতুন বছরকে বরণ করে নিতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। বাঙালির প্রাণের উৎসব উদযাপন করতে যোগ দিয়েছেন বিদেশিরাও। অনেক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে চলছে বর্ষবরণের উৎসব।

বিজ্ঞাপন

চারদিকে হৈ চৈ আর গান বাজনায় মুখর। বৈশাখের রং যেন সবার গায়ে শোভা পাচ্ছে। কেউ বসে নেই। যে যার মতো প্রিয় জনের সাথে বরণ করে নিচ্ছে বাঙালি জাতির প্রথম মাসটি। বাঙালির এ উৎসব দেখে মুগ্ধ বিদেশিরাও। নববর্ষের স্বাগত জানাতে বাঙালিদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন তারা।

নববর্ষকে স্বাগত জানাতে দিনব্যাপী উৎসবে মেতে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কলাভবনের সামনে দেখা হলো ডোমেন জোসেফ নামের এক অধ্যাপকের সঙ্গে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর শিক্ষক। বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগে পিএইচডি করছেন।

তিনি জানান, বাঙালির এই উৎসবকে দেখে তিনি অভিভূত। বলেন, আমরা ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করি। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদযাপন ভঙ্গি সত্যিই খুব ভাল লাগছে। সবাই কত উল্লাস করছে! অনেকদিন হলো এ দেশে আছি। তাই আমিও এ উৎসবের রং গায়ে মাখার চেষ্টা করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে তার মতো আরও প্রায় ত্রিশজন বিদেশি রয়েছেন যারা বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। উৎসব উদযাপনে তারাও পিছিয়ে ছিলেন না। সকাল থেকেই বিভাগের অনুষ্ঠানগুলোতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় তাদের। 

বিজ্ঞাপন

রাবির চারুকলা অনুষদ সকাল ৯টার দিকে হাতি, ময়ূর আর ঘোড়ার ডামি নিয়ে শোভাযাত্রা বের করে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় ঘোড়ার ডামি ‘গতি’র বার্তা বহন করবে। এটি দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে থাকা বাংলাদেশে অর্থনীতির বর্তমান গতিকে উপস্থাপন করবে। আর ময়ূরের নাচ ও রঙিন পালক উৎসবের আমেজকে নির্দেশ করবে। আর হাতির ডামি যা বাংলাদেশের ধাবমান বৃহৎ অর্থনীতির প্রতীক হিসেবে বার্তা বহন করবে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শোভাযাত্রায় উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান, উপ-উপাচার্যদ্বয় অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা ও অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়াসহ সহস্রাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অংশ নেন। শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলায় গিয়ে শেষ হয়।

সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতেই কানে ভেসে আসে মন মাতানো বাঁশির সুর আর গান। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় শিক্ষার্থীরা নাচে গানে বরণ করে নিচ্ছেন নতুন বছরকে। প্রতিটা বিভাগেরই ছিলো ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন। সেখানে কেউ ঢাক বাজাচ্ছেন, কেউ গাইছেন, কেউ আবার নাচছেন। শিক্ষার্থীরা কেউ সেজেছেন বর, বউ, জেলে, কামার-কুমার, কৃষক প্রভৃতি। দেখলে মনে হবে বাঙালি সংস্কৃতির আদিরূপ শিক্ষার্থীরা ধারণ করে মেতেছেন বর্ষবরণে।

এদিকে, নববর্ষকে বরণ করতে ক্যাম্পাস সেজেছে ভিন্ন সাজে। তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন মঞ্চ। সেখানে সঙ্গীত, নৃত্য, আবৃত্তি, অভিনয়, কৌতুক পরিবেশন করছেন শিক্ষার্থীরা। বাংলা, ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ফাইন্যান্স বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগ ও চারুকলা অনুষদ আলাদাভাবে কর্মসূচির আয়োজন করে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী ভবন, রবীন্দ্র ভবন, মমতাজ উদ্দীন কলাভবন, স্টেডিয়াম প্রাঙ্গন, বুদ্ধিজীবি স্মৃতিফলক চত্বর, পুরাতন ফোকলোর চত্বরসহ ক্যাম্পাসের প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই বিভিন্ন বিভাগের ছোট-বড় মঞ্চ। সেখানে শিক্ষার্থীরা বাউল, লোকসঙ্গীতসহ বিভিন্ন ধরনের বৈশাখী গান, কেউ আবার নৃত্য পরিবেশন করছেন। পুরাতন ফোকলোর চত্বরে বৈশাখ উপলক্ষে ফটোগ্রাফিতেও চলছে ধুম। এ ছাড়াও ক্যাম্পাসে বিভিন্ন জায়গায় কেউ বৈশাখি পাঞ্জাবি, শাড়ি, গামছা, ফুল বিক্রির দোকান বসেছে। কেউ কেউ আবার সেলফি তুলছেন, কেউ আবার প্রিয়জনের সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত। 

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই নয়, রাজশাহীর বিভিন্ন জায়গা থেকে শত শত মানুষ ক্যাম্পাসে বেড়াতে এসেছেন। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মতিহারের এই সবুজ চত্বরটি।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির ঐক্যের উৎসব। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার উৎসব। উৎসব ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি ও বিগত দিনের অপ্রাপ্তির হিসাব মিটিয়ে ফেলার। নতুন এই বছরে পরস্পরের ভেদাভেদ ও দ্বন্দ্ব ভুলে বাঙালিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে এই প্রত্যাশাই যেন প্রতিটি বাঙালির।