চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কোনদিনই বাংলা ভাষায় উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটবে না’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী ডা. সাঈদ হায়দার।  ১৯২৫ সালে পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মরহুম সদরুদ্দিন আহমেদ, মা নেকজার নেছা। ডা. সাঈদ হায়দার ১৯৪১ সালে ঝালকাঠি গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে লোক প্রশাসন বিষয়ে লেটার মার্কসসহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৩ সালে তিনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাশ করেন।  ১৯৪৪ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে কেমিস্ট্রিতে অনার্স কোর্সে বিএসসি ক্লাসে ৬ মাস লেখা পড়া করেছেন।

বিজ্ঞাপন

এরপর তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। প্রথম বর্ষ সমাপ্ত করে দ্বিতীয় বর্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন ১৯৪৭ সালে। এমবিবিএস পাশ করেন ১৯৫৩ সালে। ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে প্রথম শহীদ মিনারের নকশাকারী ২ জনের ১ জন। এবং শহীদ মিনার নির্মাতাদেরও একজন।

সম্মাননা পুরস্কার: ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য ২০১৬ সালে একুশে পদক পান ডা. সাঈদ হায়দার।

গ্রন্থ: লোকসমাজ চিকিৎসা বিজ্ঞান, পিছু ফিরে দেখা, বাংলা ভাষা সাহিত্য নিদর্শন, ছবিতে স্মৃতিতে প্রেম ও প্রীতিতে, দি গ্রেট ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্ট।

২০০৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভাষা সংগ্রামী ডা. সাঈদ হায়দারে সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন তারিকুল ইসলাম মাসুম। 

তা. ই. মাসুম: ভাষা আন্দোলনে আপনার অংশগ্রহণ জানতে চাই।
ডা. সাঈদ হয়দার: হ্যাঁ, ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের বিশেষ অনন্য অবদান ছিল। ইতিহাসে ততটা প্রতিফলিত হয়নি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশে কখন হয়েছিল জানো? তখন আমরা ছিলাম ২৪ জন। ’৪৬ সালেই ঢাকা মেডিকেল কলেজের সৃষ্টি। আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারে। আমি ’৪৫ এ ভর্তি। একটু বেশি সময় লেগেছিল, তার পরের ব্যাচে বোধ হয় জনা ত্রিশেক ভর্তি হয়। ৫০ জন তখন আমরা কোথায় থাকব?

সে আমলে তুমি তো জানো না, আমিজপুরে কোয়ার্টার দেখছো? ওর পাশে ছিল বিরাট প্রান্তর। যাকে বলা হতো পলাশীর প্রান্তর। পলাশীতে তখন অনেকগুলো ব্যারাক ছিল। কী জন্য? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সৈনিকদের জন্য ব্যারাক। ওরা ওখানে থাকতো। কেন বলছি সেটা শোনো। এটা সলিমুল্লাহ হল থেকে বেশি দূরে না।সলিমুল্লাহ হলের পাশ দিয়ে রেল লাইন ছিল তখন। আচ্ছা, আর আমাদের ব্যারাকটা ঐ হোস্টেল ভিতরে।

ওরা একটা ব্যানার লাগিয়ে দিল রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাই। আধা উর্দু আধা বাংলায়। লড়কে লেঙ্গে এই রকম ভাব আসছে! ওরা খবর পেয়েছে, আমাদের অ্যাক্টিভিস্ট হোস্টেলে আছে বেশি। ওরা এসে অতর্কিতে আমাদের আক্রমণ করল। তো, আমরা তো আর জানি না। অতর্কিতে ধস্তা-ধস্তি, লাঠা-লাঠি, ঐ ঢিল নিক্ষেপ এই সবই তো হবে, তাই না?

তো, হলো, আমাদেরও তো কম ছেলে না? শ’খানেক। ওরা তখন তাড়াতাড়ি ঐ বাসে। বাসগুলো তখন কী জানো? এসব বাস তো দেখো নাই? তখন সারা ঢাকায় বোধ হয় গোটা বিশেক বাস ছিল। এটা (নতুন ঢাকা) এদিকে তো নাই। এগুলো তখন তৈরি হয়নি। তো, ঐটা ঐ পাটুয়াটুলী-মতিঝিল যেত, মুড়ির টিনের মতো। মোমিন কোম্পানির বাস। তো, ওরা ওর ভিতরে লাঠি, গজারীর লাঠি নিয়ে আসছিল। নিয়ে আমাদের আক্রমণ করল। তা. ই. মাসুম: এটা কবে?
ডা. সাঈদ হয়দার: এটা হলো ১৯৪৭ এর শেষে, ’৪৮ এর প্রথম। আমাদের এই হোস্টেল ব্যারাক তখন তৈরি।
তা. ই. মাসুম: এরা এসেছিল কি ঢাকার লোকজন?
ডা. সাঈদ হয়দার: ঢাকার লোকজন। যারা কুট্টি।
তা. ই. মাসুম: উর্দুভাষী কুট্টি?
ডা. সাঈদ হয়দার: হ্যাঁ, উর্দুভাষী কুট্টি। তারা ১৯৪৮ এ আমাদের বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ছিল। এদের কীভাবে আমাদের দলে আনা হলো জানো? সে গল্প জানো না?
তা. ই. মাসুম: সরফুদ্দিন স্যার বলেছেন।
ডা. সাঈদ হয়দার: শুনছো? দ্যাটস কারেক্ট। সরফুদ্দিন তার ভিতরে ছিল। ওকেই পাঠানো হয়েছিল। ঠিক আছে? কারণ ও নিজে তো ঢাকাইয়া। কুট্টি না অবশ্য, ঢাকাইয়া। কুট্টি আবার একটা স্পেশাল, ঢাকাইয়াদের মধ্যে যারা উর্দুভাষী। তো, ওর (সরফুদ্দিন আহমেদ) কাছে তো শুনছো? তো, সেইভাবে ঢাকাইয়া কুট্টিদের আমাদের পক্ষে আনা হলো, ১৯৫২তে।

এ কথা সবাইতো জানে, ১৯৫২ সালের ২১শে ফ্রেব্রুয়ারি অতর্কিতে গুলিবর্ষণ হয়েছিল মেডিকেল ব্যারাকে। গুলি বর্ষণের পরে আন্দোলনের চরিত্র পাল্টে যায়। কেমন করে যেন, মেডিকেল ব্যারাক হয়ে উঠল প্রধান কেন্দ্র। বেশ কয়েকটা কাজে ইউনিনিমাস হয়ে ওঠে মেডিকেল ব্যারাক।
প্রথমত: আহত নিহতদের পরিচর্যা করা এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া।
দ্বিতীয়ত: দ্বিতীয় কাজটা যেটা হচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের মূল নেতৃত্ব যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, এই বিচ্ছিন্ন নেতৃত্বকে একত্রকরণ, এই একটা বড় কাজ আমাদের ছাত্রকর্মীরাই করেছে।
তৃতীয়ত: এরপরে যে কাজটার কথা বলতে চাই, তা হলো ২১ তারিখ সকাল থেকেই আমাদের মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে একটা কন্ট্রোল রুম খোলা হয়। যার বিপরীতে অবস্থান পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির।  মেডিকেল কলেজ কন্ট্রোল রুমের অবিরত প্রচারণা অ্যাসেম্বলি কক্ষে আলোড়ন সৃস্টি করে তর্কে-বিতর্কে জড়াতে।  এবং তা আন্দোলনকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যায়।
চতুর্থত: চতুর্থ যে কাজটা হয়েছিল, মেডিকেল ব্যারাকের ছাত্রদের অংশগ্রহণে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ।

প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে নকশাবিদ দুজনের মধ্যে আমি একজন।  শহীদ মিনার সেইখানে নির্মাণ করা হয় যেখানে বরকত প্রথম গুলিবিদ্ধ হয়।  তখন ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল।  মিলিটারির পদচারণা ছিল।  এর মধ্যে সকল ছাত্রের যৌথ শ্রমের ফসল এই শহীদ মিনার।  এটার তাৎপর্য বোঝা গেল পরের দিন।  তখন শোকাহত মানুষ, তখন তো ঢাকা ছোট ছিল, হাজার হাজার মানুষ আমাদের হোস্টেল প্রাঙ্গণে এই শহীদ মিনার দেখতে আসলো।  ফুলে ফুলে ভরে গেল শহীদ মিনার।
আর সরকার নিশ্চুপ বসে ছিল না।

২৬ তারিখে এই শহীদ মিনারকে দড়ি দিয়ে, কাছি দিয়ে, ভেঙে উপড়ে ফেলে নিয়ে গেল।  শেষ টুকরো টুকরো ওখান থেকে অপসারণ করে নিয়ে গেল।  কিন্তু আমাদের সেই স্মৃতির মিনার তারা ভাঙতে পারেনি।  এটা আমাদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে রইল।  প্রতিটা জাতীয় ইস্যুতে আমরা এই শহীদ মিনারের কাছে ছুটে যাই। আমাদের সব সমস্যার সমাধান খুঁজি।

বলছি যে, আমাকে যখন কোনো জায়গায় নিয়ে যায় সম্মাননা দেয়ার জন্য।
সেখানেও বলে, আপনারা আমাদের কী দিয়ে গেলেন? আমি এইটুকু বলতে চাই যে, আমাদের প্রজন্ম পরবর্তী দু’প্রজন্মকে দুটো জিনিস দিয়ে গেছে।  একটা ভাষা আন্দোলনের সফলতা।  আর দ্বিতীয় হচ্ছে হাজার বছরের অর্জন স্বাধীনতা।

বিজ্ঞাপন

এই ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।  তাই যদি তোমরা, এখন মানুষের বড় কষ্ট, আমরা একটা ক্রান্তি লগ্নে আছি।  এই ক্রান্তি লগ্নে আমাদের শহীদ মিনারই আমাদের সঠিক পথ দেখাবে।  আমাদের ভুললে চলবে না যে, আমাদের বাংলাদেশে যত সমস্যা এরকম বহু দেশে আছে।  ভেদাভেদ আছে, গোলাগুলি আছে, সব জায়গায়ই চলছে।  কিন্তু এর ভেতরেই আমাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে হবে।  এবং আমাদের সেই সমাধান, যাতে আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি।

অর্থনৈতিক মুক্তি, স্বাধীনতার সুফল যদি ঘরে ঘরে না পৌঁছে দেয়া যায় তাহলে আমাদের সমস্ত কিছু ব্যর্থ হয়ে যাবে।  আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে যে জিনিস দিয়ে গেলাম।  যে দুটি জিনিস তা হচ্ছে, ভাষা আন্দোলনের সফলতা এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন তার স্বাধীনতা।

ভাষা আন্দোলনের সাফল্যের প্রতীক হয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।  এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আমাদের সাহস যোগায় প্রতিটি সমস্যায়।  তাই প্রতিটি সমস্যায় এবং দুর্যোগে এই শহীদ মিনার আমাদের পথ দেখিয়ে দেবে।
বর্তমানে আমরা সমস্যা সংকুল আছি বটে, কিন্তু একবার যদি শহীদ মিনারের কাছে দাঁড়াই তাহলে শহীদ মিনার ডাক দিবে কিসের? ডাক দিবে ঐক্যের।  তোমরা ঐক্যবদ্ধ হও।  যেমনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন মতাদর্শের সমস্ত বলি দিয়ে যুব এবং ছাত্র সমাজ ভাষা আন্দোলনে।

ভাষা আন্দোলনে আমরা হানাহানি করিনি।  আমাদের মধ্যে আদর্শগত বিভেদ থাকলেও, জাতীয় যে ইস্যু তাতে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছি।  ঐক্যবদ্ধভাবে সে আন্দোলনকে সফলতার দিকে নিয়ে গেছি।  এখন আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে, আমাদের আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক দিক থেকেই ছিল না।  এর পেছনে আমাদের ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি, সবকিছুই অগ্রগতির জন্য, রক্ষা করার জন্য, এবং ভাষাকে মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত করবার জন্য আমাদের যে ইচ্ছা ছিল সেটাও এর ভেতরে, এই আন্দোলনের ভেতরে।  কিন্তু আমরা কি সেদিক থেকে এগিয়েছি?আজ আমরা দেখি মানুষ, এমনকি টেলিভিশনের পর্দায় দেখি সংলাপে দোভাষীর কথা।  দু’ভাষা এক সঙ্গে করে বলা হয়।  এগুলো ঠিক নয়।  আমাদের প্রমিত-চলিত বাংলা ভাষা শিখতে হবে।  এবং সেটা প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত।
ইংরেজি আমরা নিশ্চই শিখব।  কোনো ভাষার প্রতি আমাদের বিদ্বেষ ছিল না। আমরা উর্দুর বিপক্ষে কোনো আন্দোলন করিনি।  আমরা উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম।  কোনো ভাষার প্রতি আমাদের বিদ্বেষ নাই।  আমরা ইংরেজি শিখব।  যখন ইংরেজি বলব তখন আমরা ইংরেজিই বলব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন অধ্যাপককে আমি জানি, একজন সিরাজুল ইসলাম, আপনি জানেন।  আরেকজন আপনি জানতেন, মুনির চৌধুরী, তাকেও আপনি জানেন।  আরো দু’একজনের নাম আমি ভুলে গেছি।  যারা ইংরেজির অধ্যাপক। ক্লাসে একটা বাংলাও বলেন না।  কিন্তু বাইরে যখন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেন, তখন তারা নির্ভুল চলিত প্রমিত বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেন।  আমাদের সেই ভাষা শিখতে হবে।

যদি বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে বাংলিশ বা দোভাষীর মতো সংলাপ শুনি, কচি মনে এগুলো চলে যায়।  আঞ্চলিক ভাষাকে আমি অমর্যাদা করব না।  কিন্তু আমাদের প্রমিত ভাষা শিখতে হবে এবং এটা খুবই দরকার।  আমাদের লেখা শিখতে হবে, পড়া শিখতে হবে বাংলায় প্রথমেই।  কারণ মাতৃভাষায় যে শিক্ষা, সেই শিক্ষাটা যতো সহজে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে।  মস্তিষ্কে কোষগুলো সেটাকে ধারণ করতে পারে, অন্য কোনো ভাষায় তা হয় না।  কারণ এর পেছনে মন বলে একটা জিনিস লাগে, যা সেই ঘটনা প্রবাহকে, সেই যে পাঠ্য বিষয়টিকে ধরে রাখে।

আমাদের সাহিত্য, আমাদের সাহিত্য অনেক এগিয়েছে বলব, এমন কি পার্শ্ববর্তী দেশে পশ্চিম বঙ্গে যাকে আমি বাংলা ভাষাভাষী যে বিরাট অংশ বলে মনে করি তাদের সাহিত্য থেকে আমরা খুব পিছিয়ে নাই।  কিন্তু একথা তো ঠিকই যে, আমরা এখনো সাহিত্যে কোনো কালজয়ী লেখা বের করতে পারিনি।  অনেকের লেখা ভাল, শব্দ চয়ন ভাল।  সব মিলিয়ে শিল্পবোধও ভাল।

কিন্তু সব মিলিয়ে সব জায়গায় আমার মনে হয় একটা লেখার পেছনে একটা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কাজ করে।  এটাকে পরিহার করে আমরা যদি সত্যিকার সাহিত্য রচনা করতে পারি।  আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের ওপর, ভাষা আন্দোলনের ওপর একটা কালজয়ী কিছু করে যেতে পারতাম পরবর্তী প্রজন্মদের জন্য।  তাহলে সে একটা বড় কাজ হতো।  আরো কিছু বলতে হবে বাবা?
তা. ই. মাসুম: এই প্রসঙ্গ এখানে থাক।  এখন আসব বর্তমান প্রসঙ্গে।  ভাষা আন্দোলন যারা করেছেন আপনারা আমাদের দিয়েছেন একটা সফল আন্দোলন একটা সফল মুক্তিযুদ্ধ।  ভাষা আন্দোলন যখন শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সালে সে থেকে ধরলে এখন ৬১ বছর।  আর ৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলো সেই থেকে ধরলে ৩৬ বছর।  এই প্রজন্মের মধ্যে যেই অভাববোধগুলো আছে আপনি বললেন এতক্ষণে।  যে, ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি, বাংলিশ হয়ে যাওয়া, এছাড়া আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা আছে সে বিষয়ে আমি আপনার সাথে একমত। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত, আমি দেখেছি সাধারণ মানুষ যারা খুব বেশি লেখাপড়া জানেন না, কিন্তু গ্রামটা বা বাড়িটা বা এলাকটা সম্বন্ধে ভাল জানেন এরা কিন্তু ততটা স্বার্থপর নন, যতটা তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিতরা বা নীতিনির্ধারক যারা আছেন।  এখন বাংলাদেশকে তো এগিয়ে যেতেই হবে।  আমরা থাকব না, দেশ থাকবে।  সেই জন্য আপনার কিছু যদি বলার থাকে?
ডা. সাঈদ হয়দার: আমাদের প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে।  পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে, বাংলাদেশ চিরদিন বেঁচে থাকবে, কিন্তু সে বাংলাদেশকে একটি সফল দেশ, একটি স্বার্থক দেশ, একটি উন্নত দেশ করতে হবে।  আমরা তো এখন উন্নয়নশীলও নই।  সর্বনিম্ন উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছি আমরা।  একে উন্নয়নশীল করতে হলে, আমাদের এখন বর্তমানে দু’টো যে সমস্যা দেখি।  তার একটা হলো কর্মসংস্থানের অভাব।  আর দ্বিতীয় হলো আমাদের উৎপাদনে এমন প্রাচুর্য হয়নি, যাতে আমরা স্বনির্ভর হতে পারি। এজন্য আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।  যাতে আমাদের যে অভাব, সে অভাব না থাকে।  আমি এটুকু বলতে পারি যে, জাপানের মতো দেশ যে এত উন্নত হয়েছে, সেখানে তো এক ফোটা গ্যাস নাই।  আমাদের গ্যাসের মতো একটা সম্ভার রয়েছে।  একটা গ্যাসের এত মজুদ রয়েছে বলে শুনি যে, আমাদের নাকি এটা বিদেশেও রপ্তানি করা যায়? সেই দেশের হয়েও এত জনবল নিয়ে আমরা উন্নতি করতে পারছি না কেন? নিশ্চয়ই কোথাও গলদ আছে।
এটা তো আমি ধরিয়ে দিতে পারব না? এটা অর্থনীতিবিদ যারা, যারা রাজনীতিবিদ, বহু ক্ষেত্রে যাদের জ্ঞান রয়েছে, তাদের এটা বের করতে হবে।

তবে আমি এইটুকু বলতে চাই যে, জাপানিরা বা চীনারা বা ছোট ছোট দেশ, তারা কিন্তু মাতৃভাষাকে কখনো অবহেলা করেনি।  মাতৃভাষাকে নির্ভর করেই তারা শিক্ষা গ্রহণ করেছে।  একটা কথা অনেক সময় বলা হয় যে, আমাদের পরিভাষা নাই! তো উচ্চ শিক্ষা কী করে হবে? আমি আপনাকে এইটুকু আশ্বস্ত করতে পারি, অন্তত আমি যে লেখাপড়া করেছি, চিকিৎসা বিজ্ঞানের পুরোটাই বাংলায় করা সম্ভব।

১০ হাজার শব্দের বাংলা, বাংলা একাডেমি করেছে, যার সদস্য একজন আমিও ছিলাম।  সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেই ১৯৭৩ এ।  ’৭৩ থেকে ’৭৫, তারপরেই তো নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আমরা এগিয়েছি।  আমাদের দেশের সমস্ত কাজ বিনষ্ট হয়ে গেছে।
তো, এই শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।  এবং শিক্ষার ভেতরে আমাদের এমন কলা-কৌশল শিখতে হবে যাতে আমরা উৎপাদনশীল হই।  ক্ষেতে-খামারে, কলে-কারখানায়।  বিনিয়োগ তখনই হবে যখন সত্যিকারের আমরা একটা জনগণ সরকার পাব।  সত্যিকারের প্রতিনিধি এবং দায়িত্বশীল সৎ এই রকম নেতৃত্ব আমাদের ভিতর আসবে।

অনেক সময় বলা হয় যে, নেতা কে হবে? কেউ হবে না।  আমরা যদি সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করতে থাকি যে, আমাদের ভাল হতে হবে উচ্চকিত হতে থাকি তাহলে নেতৃত্ব আপনা আপনি এরমধ্য দিয়েই গড়ে উঠবে।
তা. ই. মাসুম: ঠিক আছে স্যার।
ডা. সাঈদ হয়দার: বাবা, আর তো কিছু বলতে পারব না।
তা. ই. মাসুম: আপনি বললেন, উচ্চ শিক্ষার পরিভাষা তৈরির উদ্যোগ দেয়া হয়েছিল, আপনি তার সদস্য ছিলেন, সেই বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?
ডা. সাঈদ হয়দার: হ্যাঁ,(টি টেবিলের নীচ থেকে একটা বই বের করলেন) তুমি এই সব বই দেখ না! তিন খণ্ড বেরিয়েছে, কমিটি হয়েছে একটা মেডিকেল কলেজের পাঠ্যপুস্তক বাংলা করার জন্য।  তিন ভলিউম বাংলা একাডেমি পাবলিশ করেছিল, এখানে হয়তো দু’এক ভলিউম আছে।  (আমার হাতে বইটা দিলেন, তিনি আরো একটা বই বের করলেন।  বইটার নাম ‘লোকসমাজ চিকিৎসা বিজ্ঞান, ডা. সাঈদ হায়দার)।  এগুলো মেডিকেল কলেজের বই।  (পাতা উল্টাতে উল্টাতে) একটা ইংরেজি শব্দও তো নাই।
তা. ই. মাসুম: এই বইগুলো এখন চলে?
ডা. সাঈদ হয়দার: চলবে না তো? (রাগে ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে হাতের বইটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন) রাজনৈতিক যদি কোনো ইয়ে না থাকে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি না থাকে, তবে কোনো দিনই বাংলা ভাষায় উচ্চ শিক্ষার কোনো প্রসার হবে না।
তা. ই. মাসুম: আপনি কতগুলো বই বাংলা করেছিলেন?
ডা. সাঈদ হয়দার: কোনগুলো?
তা. ই. মাসুম: এই যে বই?
ডা. সাঈদ হয়দার: এটা তো তিন ভলিউম একই সাবজেক্টের।  তারপরে তো ’৭৫ এসে গেল! এটা বোধ হয় ’৭৩-’৭৪ এর।  তারপরে তো দেশে উল্টা দিকে চললাম! আমরা কি ভুলে গেছি যে, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান প্রথম বাংলা ভাষায় সেই জাতিসংঘে তার ভাষণ দিয়েছিলেন? কিন্তু তারপরে অনেকেই তো আমাদের বাংলাদেশের ওখানে গিয়ে ভাষণ দিয়েছেন কারো মুখ থেকে তো একটা বাংলা উচ্চারণ শুনিনি?

আমাদের প্রথম কথা, আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টি করতে হবে।  আমাদের যে শক্তি আছে, আমাদের জনবল যে অনেক, সেটা জানতে হবে।  আমি চ্যানেল আইকে ধন্যবাদ জানাই যে, শাইখ সিরাজের মতো লোক গ্রামে গঞ্জে ছুটে বেড়াচ্ছেন।  কৃষির কী সমস্যা তা তুলে ধরছেন।  কৃষির ওপর আমাদের নির্ভর করতেই হবে।  চায়নার(চীন) মতো দেশও কৃষির ওপর নির্ভরশীল।  তাই বলে আমরা শিল্পকে ভুলে যাব না।  কৃষির উন্নতির জন্য যেসব কাজ সেগুলো আমাদের করতে হবে।

আমরা তো জানি, আমরা দুর্নীতিতে ডুবে ছিলাম।  এই দুর্নীতিকে একদিনে উপড়ে ফেলা যাবে না।  দুর্নীতি কম বেশি সব জায়গায় থাকেই।  কিন্তু এই সব নিয়েই প্রশাসনিক এমন একটা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যার ভিতরে আমরা এগিয়ে যেতে পারি।  যাতে পিছিয়ে না আসতে হয়।  যাতে এটা স্তব্ধ হয়ে না যায়, আমাদের অগ্রযাত্রা।  অগ্রযাত্রা যাতে ব্যাহত না হয়।  কী আর বলব? আমি কিছু বলতে পারি না। অনেকে থাকলে বলা যায়।
তা. ই. মাসুম: ঠিক আছে স্যার।

চলবে…