চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ

গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠেছিল বিপ্লবী বাঙালি জাতির সম্মিলিত, প্রত্যয় দীপ্ত কণ্ঠস্বর। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই প্রত্যয়গুলি স্থান করে নিয়েছিল কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে সগৌরবে। তবে পঞ্চাশের দশকটি ছিল ঐ প্রত্যয়গুলির উন্মেষকাল। বিকশিত হয় ষাটের দশকে অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিয়ে।
অতঃপর ১৯৭১ এ এসে তা আমাদের সুমহান সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধেরও মূল রণধ্বনিতে পরিণত হয় এবং ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে লাখো লাখো অস্ত্রধারী যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠেও তাদের শত্রু নিধনের মূল প্রেরণা হিসেবে। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা স্বীকৃত ছিল না-ছিল সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতা। ছিল না সমাজতন্ত্র ছিল সামন্তবাদ-পুঁজিবাদের অবাধ বিকাশের এবং মানুষকে শোষণের সীমাহীন সুযোগ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল না ছিল ধর্মীয় বিভক্তিমূলক দ্বিজাতিতত্ত্ব। গণতন্ত্র? না তা-ও না। যা ছিল তা হলো সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র।

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয় অর্জিত হলো-মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে। আর তার মাধ্যমে অভ্যুদয় ঘটলো ৩০ লক্ষ শহীদের প্রাণের চার লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের, কোটি বাঙালির ঘর-বাড়ি, সহায়-সম্পদ হারানোর এবং তার মাধ্যমে নিঃস্ব হওয়ার মাধ্যমে। আর এই পথেই পরাজয় চূড়ান্তভাবে ঘটলো পাকিস্তানী ‘দুর্ধর্ষ’ সেনাবাহিনীর, পাকিস্তানী শাসককুলের এবং পাকিস্তানী চরম প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শেরও।

ধারাবাহিকভাবে দুই যুগব্যাপী পরিচালিত অব্যাহত গণসংগ্রাম এবং নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের সংসদ ১৯৭২ সালেই মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই একটি সংবিধান জাতিকে উপহার দেয়-যাতে ঐ চার মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গৃহীত হয় গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ। এ ভাবেই ঐ চার রাষ্ট্রীয় মূল নীতি পূর্বেকার গণসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সুমহান আদর্শ সমূহকে রাষ্ট্রীয় জীবনে আত্মস্থ করে নেয়। পাকিস্তানকে ভৌগলিকভাবেই শুধু নয় আদর্শিকভাবেও চূড়ান্ত বিদায় দেওয়া হয়। রক্তের দামে কেনা হয় গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের আদর্শ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় এবং ঐ বাহাত্তরে প্রণীত বিধানটিই হলো যাত্রা শুরুর প্রথম ও ঐতিহাসিক অর্জন। দেশ বিদেশেও সংবিধানটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করেছিল তার ঘোষিত তিনটি লক্ষ্যের জন্য-গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু বারংবার তাঁর স্বভাবসুলভ কায়দায় তাঁর ঐ লক্ষ্যগুলি ঘোষণা করেন। অসংখ্য ভাষণে, অসংখ্য স্থানে।

জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ মোজাফফর) একটি মাত্র আসন ছিল ঐ সংসদে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভিব্যক্তি দেখতে পাওয়া যায় যখন সংসদ নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু স্পীকারকে বলেন মাত্র একজন হলেও বিরোধী দলীয় সাংসদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হোক তাঁর পরিপূর্ণ বক্তব্য সংসদে উপস্থাপনের জন্য।

সংসদের অভ্যন্তরেই শুধু নয়। সংসদের বাইরেও সরকারী দল-বিরোধীদল সমূহের আন্তঃসম্পর্ক ছিল পরস্পরের প্রতি পরস্পরের শ্রদ্ধা মিশ্রিত। পারস্পারিক আস্থা-বিশ্বাস ছিল লক্ষণীয়। আর এতেই, বা এভাবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অভিযাত্রার শুভ সূচনা ঘটেছিল-আজ যা নেহায়েতই এক বিস্মৃত অধ্যায় মাত্র। একটি স্বপ্ন মাত্র।
গণতন্ত্র বিকশিত হতে হলে যেমন বহু দলের অস্তিত্ব থাকতে হবে-তেমনি আবার দলগুলির মধ্যে তাদের নেতা-কর্মীদের আচার-আচরণের মধ্যে পারস্পারিক আস্থা ও বিশ্বাস এবং যোগাযোগ সংলাপ প্রবৃত্তির প্রচলন থাকাও অপরিহার্য। দলগুলির মধ্যেকার নানাবিধ বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে এবং তা থাকাই তো স্বাভাবিক। এই মতভিন্নতা-পারস্পারিক আলাপ-আলোচনা ও সৌহার্দমূলক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই বিদূরিত হতে পারে বহু মতভিন্নতা এবং তা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যও হতে পারে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অল্প কিছুকাল পরেই ছাত্রলীগের একটি বড় অংশ যখন ‘বৈজ্ঞানিক’ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল “জাসদ” গঠন করে- তখন থেকে ঐ রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পশ্চাদপসরণ পর্বটি সুরু হতে থাকে। চালু হয় অস্ত্রের ভাঙ্গার বিরোধিতা। শ্লোগান উত্থাপিত হয়, “শেখ মুজিবের চামড়া-তুলে নেব আমরা” এবং আরও আরও উত্তেজনা সৃষ্টিকারী শ্লোগান। শুধু তাই নয়, হত্যা-গুপ্ত হত্যার রাজনীতিও চালু হয় স্বাধীন বাংলার মাটিতে। যা মুক্তিযুদ্ধের দলগুলির দ্বারা সর্বদা নিন্দিত ছিল।

বেদনার সাথে এও পরিলক্ষিত হতে থাকে, জাসদের হাত ধরেই বে-আইনি ঘোষিত মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক দল জামায়াতে ইসলামী যেন নতুন করে এ দেশের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে গোপনে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পেতে থাকলো। তারা জাসদের অনেককে আত্মগোপনে থাকতে সহায়তাও করতে থাকলো। ধীরে ধীরে নতুন করে নকশালী রাজনীতি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে নামে শ্রেণী শত্রু খতমের রাজনীতি নতুন করে দেখা দিলো। ডাল-ভাতে পরিণত হতে থাকলো হত্যার ও অস্ত্রের রাজনীতি।

এরই এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশে জরুরী অবস্থা জারী করে প্রকাশ্য রাজনীতি বন্ধ করে দেন। এর সুযোগও নিতে থাকলো উগ্র সরকার-বিরোধী মহলে। তাদের পরিচালিত গোপন কার্যকলাপ দিব্যি অব্যাহত থাকলো। বন্ধ হলো বরং আইন মেনে চলা মূলধারার দলগুলির কার্যক্রম যা ছিল প্রকাশ্যে পরিচালিত। উধাও হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, পারস্পারিক সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাশীলতার সংস্কৃতি। রাজনীতির অর্থই দাঁড়ালো পারস্পারিক শত্রুতা। উধাও হতে থাকলো গণতন্ত্রের চেতনা। পরিণতি যা হওয়ার তাই হতে শুরু করলো। রাজনীতির অঙ্গন থেকে শক্তিকামী জনগণ দূরে-বহুদূরে অবস্থান নিতে শুরু করলেন। নৈরাজ্য গ্রাস করলো দেশটাকে।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতির সুযোগ দেশী-বিদেশী স্বাধীনতা বিরোধী চক্রান্তকারীরা নিতে দ্বিধা করলো না। তারই পরিণতিতে ঘটে গেল পনেরই আগস্টের ভয়াবহ হত্যালীলা-ঘটলো সামরিক অভ্যুত্থান। ষড়যন্ত্রের নায়ক খোন্দকার মোশতাক প্রথমে হলেন তথাকথিত রাষ্ট্রপতি এবং পরে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখল। গোলাম আযমের আবির্ভাব, জামায়াতের প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার লক্ষ্যে বে-আইনি পন্থায় সংশোধন করে “বিসমিল্লাহ্” সংযোজন ও জামায়াতে ইসলামীসহ সকল ধর্মাশ্রয়ী দলকে বৈধতা প্রদান। এগুলির কোন অস্তিত্ব ছিল না বাহাত্তরের সংবিধানে।
মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যেতে থাকলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রেও। অনেকে হয়তো ভুলে গিয়ে থাকবেন ভোররাতে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর বিশাল বপু ধানমণ্ডির ৩২ নং বাড়ীর দোতলায় উঠবার সিঁড়িতে নামমাত্র প্রহরায় পড়েই থাকলো আর সন্ধ্যায় খোন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে নিজেকে “প্রেসিডেন্ট” হিসেবে ঘোষণা করে বললেন ‘সোনার ছেলেরা’ দেশটাকে রক্ষা করেছে শেখ মুজিব ইসলামকে ধ্বংস করে দিচ্ছিলো।” আবার বাহিনী প্রধানরাও তাঁর অধীনে দ্রুত শপথ নিলেন-তাঁর আদেশ নির্দেশ পালন করলেন।

অর্থাৎ পুনরায় রাষ্ট্রের মুসলমানীকরণ, বাংলাদেশের ইসলামীকরণ বা প্রকারান্তরে পাকিস্তানীকরণ শুরু হয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ সাধন প্রক্রিয়া নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়। আওয়ামী লীগ-ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদেরকে রুশ-ভারতের দালাল বলে প্রকাশ্যে অভিহিত করা শুরু হয়-পাকিস্তান-বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে যেন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ফলেই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণতও হলো। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বস্থতম বন্ধু ভারত ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের শীতলীকরণ পক্রিয়াও। একই সাথে সেই পাকিস্তান আমলের মতই শুরু হয় আওয়ামী লীগ-ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীদের জেল জুলুম প্রভৃতি। প্রক্রিয়াটি শুরু করেন মোশতাক জোরদার করেন জেনারেল জিয়া।

জিয়া ক্ষমতা দখল করে ঐ গ্রেফতার প্রক্রিয়াই শুরু করেননি, তিনি গোলাম আজমকে ফিরিয়ে আনলেন পাকিস্তান থেকে, সামরিক আইন জারী করে ঐ আইন বলে সংবিধান সংশোধন করে ধর্মাশ্রয়ী দলগুলিকে বৈধতা প্রদান (জামায়াতে ইসলামী সহ) করেন সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহ্” সংযোজন করে সেই পাকিস্তানী ধারাকে পুনর্বার ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করেন। জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগত, দেশী ও বিদেশী স্বার্থে ঐ ধারার পুনর্বাসন করতে শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধুর আমলে পাক-বাহিনীর সাথে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সহযোগিতা করার অভিযোগে আটক বন্দীদেরকেও দ্রুতই মুক্তির নির্দেশ দিয়ে তাদেরকেও রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেন। মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের গ্রেফতার করে ফাঁসিতেও লটকালেন।
পরবর্তীতে অপর সামরিক শাসিত হোসেন মুহাম্মদ এরশাদ ঐ ‘ইসলামী’ ও ‘পাকিস্তানী’ করণ প্রক্রিয়া নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান সংবিধানে “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” লিপিবদ্ধ করে। এগুলি কিন্তু কেউ কোনদিন দাবী করেনি বা পৃথিবীর কোথাও এমন ধরণের রাজনীতি (বিপরীত ধর্ম) প্রতিষ্ঠা করতে দেখাও যায়নি। রাষ্ট্রীয় মৌলনীতির পশ্চাদমুখী পরিবর্তনের আধুনিক বিশ্বে অপর কোথাও নজির নেই।

রাজনৈতিক দল সমূহের নেতা-নেত্রীদের পারস্পারিক সুসম্পর্ক, সম্মানবোধ প্রবৃত্তি ( যেমন রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মান উপলব্ধি করতে সাহায্য করে-তেমনই সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশে গৃহীত সংবিধানে বিধৃত রাষ্ট্রীয় মৌলনীতি সমূহের বিপরীত মুখী নীতি প্রতিস্থাপনও মারাত্মকভাবে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিম্নমানের পরিচায়ক বলেও বিবেচিত। এই ধারা বা সংশোধনী সমূহ আজও আমাদের সংবিধানে দিব্যি শোভা পাচ্ছে-সম্পূর্ণ বিস্ময়করভাবে।

কালপরিক্রমায় আমরা দুটি বৃহৎ দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কে) ক্ষমতায় বসতে দেখলাম ভোটের মাধ্যমে। এই পর্যায়েও দেখা গেল, দুই সামরিক একনায়কই অবৈধ ও অগণতান্ত্রিকভাবে ন্যুনতম গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বা ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না দেখিয়ে যে পাকিস্তানী ধারার রাজনীতিকে অবৈধ পন্থায় সাংবিধানিক বৈধতা দিলেন, তার সযত্নে গণতন্ত্রায়ণ (গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় পন্থায়) করে জাতিকে উপহার দিয়ে তারই স্থায়ী রূপ দিলেন দ্বিধাহীন ভাবে। বর্জিত হলো ‘হাজারো গণসংগ্রাম একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে সংসদ গৃহীত চার রাষ্ট্রীয় মূল নীতি ও আদর্শ যা বাহাত্তরের সংবিধানে ৪ নভেম্বর, বাহাত্তরে অনুমোদিত ও প্রচলন করা হয়েছিল তাকে।

দিনে দিনে ক্রমাগতভাবে গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধিকতর নিকৃষ্ট প্রচলন জাতিকে অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। পারস্পারিক দোষারোপ, একে অপরকে রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশের শত্রু দুর্নীতিবাজ লোভী, রাষ্ট্রক্ষমতা প্রত্যাশী থেকে সুরু করে আরও কুৎসিত মন্তব্য পরস্পরের প্রতি ছুঁড়তে দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন। একজন আইনজ্ঞ সাংবাদিক তো সম্মানিত একজন নারী সাংবাদিককে “চরিত্রহীন” বলে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে দিব্যি অপদস্থ করলেন। মহিলা সাংবাদিকটি যথার্থই বলেছিলেন, ঐ আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর তো প্রমাণও আছে। ঐ আইনজীবী অতীতে বেশ কয়েকবার ইসলামী ছাত্র শিবিরের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন ভাষণও দিয়েছেন অথচ কোন দেশ প্রেমিক বুদ্ধিজীবীই ইসলামী ছাত্র শিবির বা জামায়াতে ইসলামীর সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে এ যাবত যোগ দেন নি। একমাত্র তিনিই দিয়েছেন যদিও তিনি প্রকাশ্যে কোন দল করেন না। জামায়াতে ইসলামী এমন একটি দল যার সব সদস্যের পরিচয় দলটি কদ্যপি প্রকাশ করে না। একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং একজন অতি সম্মানিত প্রথিতযশা সাংবাদিক প্রয়াত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সন্তান হয়ে এমন কুৎসিত অভিযোগ একজন সম্মানিত নারীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এসে সমগ্র নারীকুলকেই অপমানিত করে যে সংস্কৃতি ও রুচিবোধের পরিচয় তুলে ধরলেন তা জাতির বিবেককেই আহত করেছে।

নিবন্ধটির পরিসর আর না বাড়িয়ে বলতে চাই-বাঙালি জাতি দৃঢ়ভাবে গণতন্ত্র চায়-চায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ। তাই যে অপসংস্কৃতির পাহাড় দিনে দিনে জমেছে তার দ্রুত অপসারণও কামনা করে। গণতন্ত্র বিরোধী সংস্কৃতি দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না-গণতন্ত্রকে বিলুপ্তই করা যায় শুধু। তাই দ্রুত এ রোগমুক্তিই কাম্য।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)