চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজনৈতিক দলগুলো কি পারেনা একেকটি স্বতন্ত্র মডেল হতে?

সম্প্রতি সংবাদপত্রে ধনী দল ও গরিব দলের জরিপ প্রকাশ পেল। তবে সেটা বাংলাদেশের নয়, প্রতিবেশী দেশ ভারতের। পত্রিকায় প্রকাশ, ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বিজেপির মোট আয় হয়েছে ১ হাজার ৩৪ দশমিক ২৭ কোটি রুপি। তালিকায় দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকলেও আয়ের দিক থেকে বিজেপির চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে সাবেক ক্ষমতাসীন ও বর্তমান বিরোধীদল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। দলটির আয়ের পরিমাণ ২২৪ দশমিক ৩৬ কোটি রুপি। ভারতে সবচেয়ে কম আয়ের দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই)। এ দলটির বার্ষিক আয় মাত্র ২ দশমিক ৮ কোটি রুপি।

বিজ্ঞাপন

দিল্লীর অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস(এডিআর) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাখিল করা আয়কর রিটার্নের ভিত্তিতে এই তথ্য তুলে ধরেছে ভারতের গণমাধ্যম দ্য কুইন্ট।

প্রতিবেদনটিতে ৭টি রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ রয়েছে। সেগুলো হল: বিজেপি, কংগ্রেস, বহুজন সমাজবাদী পার্টি(বসপা), ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি(এনসিপি) সিপিএম, সিপিআই ও তৃণমূল কংগ্রেস।২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ৭ টি রাজনৈতিক দলের মোট আয় হয়েছে ১০ হাজার ৫৫৯ দশমিক ১৭ কোটি রুপি। প্রতিবেদনে প্রকাশ, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বিজেপির আয় বেড়েছে ৮১ দশমিক ১৮ শতাংশ। বিজেপির ৫৭০ দশমিক ৮৬ কোটি রুপি থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৪ দশমিক ২৭ কোটি রুপি। অন্যদিকে ক্ষমতা হারানো কংগ্রেসের আয় কমেছে ১৪ শতাংশ। তাদের ২৬১ দশমিক ৫৬ কোটি রুপি থেকে আয় কমে হয়েছে ২২৫ দশমিক ৩৬ কোটি রুপি।

চলতি বছরে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। দলটির ব্যয় ৭১০ দশমিক ০৫ কোটি রুপি। এ ব্যয় তাদের আয়ের চেয়ে কম। কংগ্রেস খরচ করেছে ৩২১ দশমিক ৬৬ কোটি রুপি, সেটা তাদের আয়ের চেয়ে বেশী। মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি(বসপা) ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে মোট আয় করেছে ১৭৩ দশমিক ৫৮ কোটি রুপি আর ব্যয় করেছে ৫১ দশমিক ৮৩ কোটি রুপি। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বসপার আয় ছিল ৪৭ দশমিক ৩৮ কোটি রুপি, এবারে তা আরও বেড়েছে। এনসিপির আয় চলতি অর্থ বছরে বেড়েছে ১৭ দশমিক ২৩৫ কোটি রুপি, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ছিল ৯ দশমিক ১৩৭ কোটি রুপি।

সিপিএমের আয় কমেছে ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছে ভারতে সবচেয়ে ধনী দল বিজেপি ও সবচেয়ে গরিব দল কমিউনিষ্ট পার্টি। একটা পরিবারকে ধনী বললে পরিবারটির সকলেই ধনের সমান অংশীদার হয়। একটি পরিবারকে ঘিরে থাকে বাবা, মা, ভাই, বোন, ভাতিজা সহ অনেকেই। রাজনৈতিক দলগুলোও কি পরিবারের মত হতে পেরেছে? দল ধনী মানে কি দলের সবাই এ ধনের সমান অংশীদার? আর দলের আয়ের উৎস কী? না কি দল ধনী মানে দলের সব নেতাদের সামষ্টিক যোগফল?

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে সবচেয়ে ধনী দল কোনটা আর গরিব দল কোনটা? ভারতের মতো কেউ জরিপে তা উল্লেখ করবেন কি? কংগ্রেস বিজেপির চেয়ে অনেক পুরনো দল হওয়া সত্ত্বেও ধনের দিক থেকে কেন পিছিয়ে গেল? সিপিএম নিজে গরীব থেকে কীভাবে গরীবী হটাবে? বিজেপির সবচেয়ে ধনী দল হওয়ার রহস্য কী? এটা কি বিজেপির সকল নেতা-কর্মীর সামষ্টিক সম্পত্তির আলোকে? না দলীয় ফান্ডের উপর ভিত্তি করে? জরিপকারীর এ বিষয়টা পরিস্কার করা উচিত ছিল। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রভৃতি। এসব দলের মধ্যে ধনী দল কোনটা ও ধনের উৎস কী তা সুস্পষ্ট করা বাঞ্চনীয়। একটি দলে কেউ গরিব আর কেউ ধনী এই পার্থক্যের জরিপি ব্যাখ্যা কী?

কেন রাজনৈতিক দলগুলো একটি পরিবারের মতো হয়ে উঠতে পারছেনা? বক্তৃতায় ও বিবৃতিতে সম অধিকার, সম মর্যাদা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জোরালো কন্ঠ উচ্চারিত হয়। কিন্তু নিজ দলে এ পর্যন্ত কেউ কি তাদের বক্তব্যের দৃষ্টান্ত হতে পেরেছে? প্রতিটি রাজনৈতিক দল যদি নিজ দলে নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়নের এক একটি মডেল হতো তখন জনগণ বুঝতে পারতো কোন দল ক্ষমতায় গেলে তার রূপ কী হবে। মুখে বলে ইসলাম ও কোরঅানের উদ্ধৃতি। কিন্তু নিজ দলে ইসলাম ও কোরআনের নির্দেশনা কোন ইসলামী দল মেনে চলছে? মুখে বলে গণতন্ত্র কিন্তু বাস্তবে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের রীতিনীতি কোন গণতন্ত্রী দল মেনে চলছে? মুখে বলে সাম্যবাদ ও সমতার আদর্শের কথা। কিন্তু নিজ দলে কোন দল সমতার আদর্শ বাস্তবায়ন করতে চলেছে?রাজনৈতিক দলগুলো কেন পারছেনা নিজ নিজ আদর্শের একেকটি মডেল হতে? আর জনগণকে সুযোগ দিতে যেকোন একটি মডেল গ্রহণের?

একই সংগঠন করে, একই মেধা ও একই পদমর্যাদা কিন্তু আর্থিক অসমতা কেন? কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত ফ্ল্যাটবাড়ি কেনে, কেউ মাথা গোঁজার মতো সামান্য একটি নিজগৃহ তৈরি করতে পারে না? কেন রাজনৈতিক দলগুলো হতে পারছেনা নিজ নিজ আদর্শিকতার একেকটি দৃশ্যমান প্ল্যাটফর্ম? সবাই ক্ষমতায় গিয়ে জনসেবা করতে চায় কেন? তাদের উদ্দেশ্য কি জনসেবা নাকি নিজের সেবা? আমরা বাংলাদেশে ধনী দল ও গরীব দলের বৈশিষ্ট্য দেখতে চাই। কোন বৈশিষ্ট্যে তারা ধনী দল হল ও কোন বৈশিষ্ট্যে গরীব তাও জানতে চাই। পৃথিবীতে সাম্যবাদের কথা বলে অনেক কমিউনিষ্টকেও দেখা গেছে অসাম্যের চাষ করে নিজেকে রাজা ও অন্যদের প্রজা ভাবতে।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই আদর্শ দিয়ে ক্ষমতাকে জয়ের টার্গেট না করে ক্ষমতা দিয়ে আদর্শ জয়ের টার্গেট করা হচ্ছে। যেমন ক্যু করে অগণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতা গ্রহণ করে গঠন করছে গণতান্ত্রিক দল। কেউ বলছে বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। কেন তারা বলতে পারলোনা আদর্শিক চেতনাই ক্ষমতার উৎস?

দিনের পর দিন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা বাড়ছে। নেতাদের বক্তৃতা বিবৃতিগুলোতে যে অন্তরের ছোঁয়া নেই, চেতনার স্পর্শ নেই তা আর মানুষের বুঝতে বাকী নেই।ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নিজস্বতা বিকিয়ে দিতেও কেউ এতটুকু দ্বিধান্বিত হয় না। অসাম্প্রদায়িক দাবীদার দলটি আপোষ করছে সাম্প্রদায়িকতার সাথে। মুক্তিযোদ্ধা সঙ্গী বানাচ্ছে রাজাকারকে।বাম পরছে ডানের পোশাক। ডান পরছে বামের পোশাক। সকলেরই মূল টার্গেট ক্ষমতা। বাংলাদেশে এই প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে মানুষের আস্থাবোধ ফিরে আসার এতটুকু লক্ষণ নেই। এ থেকে উত্তরণের উপায় হল নিজ দলের অভ্যন্তরে আদর্শিক বৈশিষ্ট্যের প্ল্যাটফর্ম তৈরি। সমতা, মানবিকতা, বৈষম্যহীনতা ও সুনাগরিকত্বের নিজ নিজ দলীয় মডেল সৃষ্টি করতে হবে। সে মডেলগুলো হবে একেক দলের একেক রকম। মানুষ দেখেশুনে যে কোন একটি মডেল গ্রহণ করবে ও প্রয়োজনে বদল করে নতুন মডেল গ্রহণ করবে।

এমন একটি রীতি গড়ে তোলাই সুস্থধারার গণতন্ত্র চর্চার জন্য প্রয়োজন। মুসলিম দরবেশ চেনা যায় তাদের জীবন যাপনের ধরন দেখে। হিন্দু সাধু, বৌদ্ধ পুরোহিত ও খ্রিষ্টান পাদ্রী প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শিক্ষিত মানুষ ও মূর্খ মানুষও চেনা যায় পোশাক আশাক ও যাপিত জীবনের বৈশিষ্ট্যে। সৎ মানুষ ও অসৎ মানুষও ফুটে ওঠে তাদের ব্যবহারের মাধ্যমে। রাজনৈতিক দলগুলো কি নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য দিয়ে জনগণের কাছে যেতে পারেনা? তারা কি পারেনা এক একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের মডেল হতে? যাতে দৃশ্যমান বাস্তবতায় জনগণ বেছে নিতে পারে যে কোন একটি মডেল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)