চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রত্নগর্ভা এক সংগ্রামী মায়ের গল্প

ডা: পারভীন হাকিম আনোয়ার। একজন সংগ্রামী মা। একজন সফল মা। যার জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে সীমাহীন সংগ্রামের গা শিউরে ওঠা গল্প। তবে সব বাধার দেয়াল পেরিয়ে তিনি আজ একজন সফল মানুষ। তিন সন্তানের সফল জননী এই মায়ের তিন মেয়ে-ই কর্মজীবনে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। বড় মেয়ে সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট জজ। মেজো এবং ছোট মেয়ে চিকিৎসক।

বিজ্ঞাপন

রত্নগর্ভা এই মা নিজেও কর্মজীবী। গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের ক্যাটালগার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি একজন হোমিওপ্যথি চিকিৎসক। অফুরন্ত জীবনীশক্তি তার। অক্লান্তকর্মী এই মা ৫৫ বছর বয়সেও সবকিছু করে চলেছেন সীমাহীন দক্ষতায়।

মা দিবসে সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা তুলে এনেছি এই মায়ের জীবনের গল্প।

পারভীন হাকিমের জন্ম কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ধনকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে। ১০ ভাইবোনের পরিবারে তিনি তৃতীয়। বাবা আব্দুল হাকিম পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। স্থানীয় হাসপাতালে চাকরি করতেন তিনি। স্বল্প আয়ে ১০ সন্তানকে মানুষ করতে হিমশিম খেতে হতো বাবা-মাকে। ছোট থেকেই পারভীন হাকিম ছিলেন ভীষণ মানবিক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মা আম্বিয়া খাতুনকে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখে মায়ের কষ্ট লাঘবে মায়ের কাজে সহায়তা করতেন তিনি। তবে মা শুধু সন্তানদের একটি কথাই বলতেন আমি এসব কষ্ট করছি কিন্তু তোমাদেরও যেনো এমন কষ্ট করতে না হয়, সেজন্য তোমরা লেখাপড়া করো।

বাবা আব্দুল হাকিমও সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে ছিলেন ভীষণ সচেতন। সেজন্য বেতনের টাকা পেয়ে প্রথমেই সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য কাগজ আর কেরোসিন কিনতেন। যেহেতু সেসময় গ্রামে বিদ্যুতের আলো ছিলনা সেজন্য ল্যাম্পের আলোই ছিলো একমাত্র ভরসা।

ডা: পারভীন হাকিম ছোট থেকেই লেখাপড়ায় ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। যেকোনো পরিস্থিতিতে লেখাপড়া তাকে করতেই হবে। সেসময় রাত জেগে জেগে ল্যাম্পের আলোয় লেখাপড়া করতেন তিনি। ইচ্ছে ছিলো বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার কিন্তু মেয়েদের স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় পড়েছেন মানবিক বিভাগে। পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়া-লেখা করেছেন। রাতের বেলা গ্রামের মানুষ ভয় দেখানোর জন্য টিনের চালে ঢিল মারলেও দমে যাননি তিনি।

এসএসসিতে মানবিক বিভাগ থেকে হায়ার সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছিলেন তিনি। দেখতে বেশ সুন্দরী হওয়ায় বাবা সাহস পান না মেয়েকে গ্রামে রেখে পড়ানোর। এজন্য নিয়ে আসেন রাজধানী ঢাকায়। সেখানে এসে হলিক্রস এবং ইডেন দুটি কলেজেই চান্স পান তিনি। তবে হোস্টেলের সুবিধা থাকায় ভর্তি হন ইডেন মহিলা কলেজে। কয়েকমাস এক ফুপাতো বোনের বাসায় থেকে লেখাপড়া করার পর সিট হয় গণরুমে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর স্থানান্তরিত হন নিয়মিত রুমে। সারামাস নোট করা আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তিনি। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনো জগৎ ছিলো না তার। এরই মাঝে শামসুন্নাহার ফাতেমা নামের হোস্টেলের এক মেয়ে নিজের ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য বেশ পছন্দ করতে শুরু করে পারভীনকে।

একদিন ভোরে নামাজ শেষে কোরান তিলাওয়াত করার সময় ফাতেমা তার আম্মাকে নিয়ে আসেন পারভীনের রুমে। পরিচয় হওয়ার পর চলে যান ফাতেমার আম্মা। এর কিছুদিন পরই ছিল পারভীনের প্রথম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষা। এরই মাঝে কলেজ থেকে কয়েকদিনের ছুটি দেয়া হয়। পারভীন বাসায় চলে যান। গিয়ে দেখতে পান এক অপরিচিত ভদ্রলোক তাদের বাড়ির উঠোনে বসে আছেন। বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে জানতে পারেন ওই ভদ্রলোক তার ছেলের সাথে পারভীনের বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এসেছেন এবং তিনি ফাতেমার বাবা।

বিজ্ঞাপন

বিয়ের কথা শুনেই কান্নাকাটি শুরু করেন তিনি। তবে মেয়েকে লেখাপড়া করানোর শর্তে এবং ঢাকায় মেয়ের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাবা মেয়ের বিয়েতে রাজি হন। হুট করেই বিয়ে হয়ে যায় পারভীনের। সময়টা ১৯৮০ সাল। তখন তার বয়স ১৫ বছর ৮ মাস। বিয়ের পরপরই হোস্টেল থেকে সিট কাটিয়ে পরভীনকে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে উঠতে হয়। পরদিনই ধরতে হয় সংসারের হাল। ২২-২৩ জনের এক বিশাল সংসার। খুব ভোরে উঠে রান্না বাড়া করে বাড়ির সব কাজ শেষ করে কলেজে যেতেন তিনি। হাজার কাজের মাঝেও ঠিকই বের করে নিতেন নিজের পড়ার সময়।

এভাবে প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষ  শুরু হয় তার। এরই মাঝে গর্ভবতী হন তিনি। এইচএসসি পরীক্ষাও খুব সন্নিকটে চলে আসে। শ্বশুরবাড়ি থেকে বিন্দুমাত্র সমর্থন না থাকায় স্বামী ডা: মো: আনোয়ার হোসেনের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন এমআর করানোর। শ্বশুরবাড়ি শহরে হলেও সেখানের পরিবেশটা ছিলো কুসংস্কারাচ্ছন্ন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাসপাতালেও যান স্বামীর সাথে। তবে এমআর করানোর জন্য প্রথম রুম থেকে দ্বিতীয় রুমে যাবার সময়ই শুনতে পান নারী কণ্ঠের তীব্র চিৎকার। দেখতে পান ব্যাথায় কাতর নারীদের ধরে ধরে বের করে আনছে তাদের স্বজনরা। এসব দেখে কোনোকিছু না ভেবেই এক দৌড়ে হাসপাতাল বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসেন। পেছন পেছন ছুটতে থাকেন তার স্বামী। এরপর স্বামীকে জানান সন্তান নিতে রাজি তিনি।

সময় ঘনিয়ে আসে। শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষা। সেসময় ঘনিয়ে আসে সন্তান প্রসবের ক্ষণও। স্বামী আনোয়ার হোসেন প্রতিদিন পারভীনের পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে অপেক্ষা করতেন খাবার নিয়ে। স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে চিকিৎসকের কাছে নেয়ার জন্য। এরই মাঝে শেষ পরীক্ষার দিন সন্তান প্রসবের বেদনা ওঠে এই মায়ের। এরপর তার কোল আলো করে আসে তাদের প্রথম সন্তান তাহেরা আনোয়ার। যিনি বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র ল’ রিসার্চ অফিসার হিসেবে (সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট জজ)।

এর তিনমাস পরই ফল বেরোয় এইচএসসি পরীক্ষার। মা পারভীনের তখন অদম্য আকাঙ্খা স্নাতক ভর্তি হবার। তবে এক্ষেত্রে পুরোপুরি বেঁকে বসে শ্বশুরবাড়ির সবাই। এরপর তাদের অনেক বুঝিয়ে রাজি করতে সক্ষম হন বিএ ভর্তি হবার জন্য। সেসময় তার বাবা তাকে ভর্তি করে দেন। শ্বাশুড়ি শর্ত দেন বাচ্চা নিলে পরীক্ষা দিতে দেবেন। পড়ালেখার প্রতি ভীষণ টান ছিলে এই মায়ের। অনেক কষ্টের মাঝেও  হায়ার সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে পাশ করেন বিএ পরীক্ষায়। নিজের ভালো ফলের আনন্দে সেদিন বার বার বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদেছেন এই মা। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা নিয়ে সারাদিন সংসারের কাজ করে সরারাত লেখাপড়া করে সফল হন তিনি।

এরই মাঝে যত্ন করে মানুষ করছেন নিজের সন্তানদেরও। এর পরপরই একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চাকরি পান তিনি। একই সাথে ভর্তি হন হোমিওপ্যথি চিকিৎসাবিদ্যায়। সেক্ষেত্রে স্বামীও তার সঙ্গী হন। সেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি শিখতে থাকেন টাইপিং। এরই মাঝে তিনি চাকরির পরীক্ষা দেন গ্রন্থাগার অধিদপ্তরে। সেখানেও সফল হন। তবে এরপরই  তাকে চাকরিতে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকার জন্য চাপ দেয়া হয় শ্বশুরবাড়ি থেকে। ছিঁড়ে ফেলা হয় তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটি। তবে সৌভাগ্যবশত আরেকটি ফটোকপি থাকায় সে যাত্রায় বেঁচে যান পারভীন। ওই চাকরিতে যোগদানের পরপরই শ্বশুরবাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় তার স্বামী সন্তানসহ পুরো পরিবারকে। তার স্বামী যে পারিবারিক ব্যাবসা করতেন সেখান থেকেও বঞ্চিত করা হয়। ছোট ছোট তিন সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন মা পারভীন হাকিম।

সেদিন কাছে ছিলো মাত্র ৫০ টাকা। একটি খাট আর কয়েকটি বাসনপত্র। এরই মাঝে চাকরি, তিন সন্তান, সংসার, লেখাপড়া সবকিছু শক্ত হাতে সামলাতে থাকেন তিনি। সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য সবকিছু করতে রাজি ছিলেন তিনি। সারাদিন চাকরি করে, চেম্বার শেষে বিকেলে বাচ্চাদের জন্য  বাজার করে ফিরতেন তিনি। সেদিন মা পারভীনের মনটা অনেক ভালো থাকতো যেদিন অনেক বাজার করে, রান্না করে মুখরোচক নানা খাবারে বাচ্চাদের জন্য টেবিল ভরে সাজিয়ে দিতে পারতেন। রাত জেগে পড়া বাচ্চাদের মন খুশি করার জন্য রাত দুটোর সময়ও পোলাও মাংস রান্না করে তাদের খাওয়াতেন তিনি। বাচ্চাদের খুশিতে সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যেতো তার।

মা পারভীন হাকিমের ভাষায়: আমার মেয়েরা খুব ভালো, খুব ভদ্র ওরা অনেক লেখাপড়া করেছে। আমি সবসময় চাইতাম আমার মেয়েরা যেনো মানুষের মত মানুষ হয়। আমি ওদের মেয়ে হিসেবে না, মানুষ হিসেবে বড় করেছি।

একের পর এক মেয়ে সন্তান হওয়ায় অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে এই মাকে। তবে কোনো কথাই কানে তোলেননি তিনি। স্বামীর কাছ থেকেও পেয়েছেন সহযোগিতা, ভালোবাসা।

তার মেয়েরাও মায়ের আশা পূরণ করেছেন। বড় মেয়ে এইচএসসিতে বোর্ড স্ট্যান্ড করেছেন বর্তমানে তিনি সিনিয়র সহকারি জজ। মেজো মেয়ে ডা: নাসরিন আঞ্জুম আনোয়ার সহকারি সার্জন হিসেবে কর্মরত আছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছোট মেয়ে ডা: বুশরা সিদ্দিকী আনোয়ার এমবিবিসএস সম্পন্ন করেছেন ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে।

তিন মেয়েকেই বিয়ে দিয়েছেন। তাদের স্বামীরাও কর্মক্ষেত্রে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। স্বামী সন্তান নিয়ে এখন যেনো চাঁদের হাট এই মায়ের।