চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রক্তে লাল জেব্রা ক্রসিং, আমরা বলি ‘দুর্ঘটনা’

এদেশে সড়কের জেব্রা ক্রসিংয়ের সাদা রঙ লাল হয় মানুষের রক্তে! জীবন থেকে জীবন হারিয়ে যায় মুহূর্তে। নিরাপদ হয় না সড়ক। দীর্ঘ হয় মৃত্যুর মিছিল। তবু আমরা সড়কে বেপরোয়া ঘাতকের দ্বারা সংঘটিত মৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ বলি!

বিজ্ঞাপন

এই ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি বলার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে হত্যার মতো অপরাধের সাথে এক প্রকারের নির্লিপ্ত আপস করি। যে আপসের ফলে সড়কে সংঘটিত অপরাধের বিচার হত্যার মানদণ্ড ছুঁতে পারে না।

তাই ‘দুর্ঘটনা’ নামক এক আপসকামী শব্দের বদৌলতে হত্যার মতো অপরাধের দায় থেকে একের পর এক মুক্তি পায় সড়কের বেপরোয়া ঘাতক।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবারের একটি মৃত্যু আমাদের সবার হৃদয়ে দাগ কেটেছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেইটের সামনে থাকা জেব্রা ক্রসিংয়ে বেপরোয়া বাসের চাপায় প্রাণ হারিয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। জেব্রা ক্রসিং লাল হয়েছে আবরারের রক্তে। কেবল আবরার নয়, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়কে ঝরছে প্রাণ। তবু বেপরোয়া ঘাতকরা থেকে যাচ্ছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বাইরে।

বিজ্ঞাপন

কারণ খোদ রাজধানীসহ দেশের প্রায় সকল সড়কের অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকা কিছু গডফাদার বেপরোয়া ঘাতকদের অপরাধের দায় থেকে বাঁচাতে বহুমাত্রিক বাধার দেয়াল তুলে রাখে। যে দেয়ালে কেবলই ফুটে ওঠে ক্ষমতার রাজনীতি – অবৈধ অর্থ আর অস্ত্রের ঝনঝনানি।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে সড়কে অযাচিত আধিপত্য বিস্তার করা গুটি কয়েক গডফাদার আর বেপরোয়া ঘাতকদের বিরুদ্ধে আমরা নাগরিকেরা ঐক্যবদ্ধভাবে কখনো সোচ্চার হই না। আমরা প্রতিনিয়ত একান্ত নিজের জীবন, নিজের নিরাপত্তা, নিজের সাফল্য আর নিজের ভালো থাকার সুযোগ খুঁজি। এই সুযোগ সন্ধানী মানসিক বোধ থেকে তৈরি হওয়া বিবর্ণ এক সমাজে আমরা প্রকারান্তে একে-একে ধুঁকে-ধুঁকে মরি।
ক্ষেত্রবিশেষে আমরা মরার আগেও মরি, আবার ছা-পোষা হয়ে সমাজে বেঁচে থেকেও মরি।বিইউপি-শিক্ষার্থী নিহত-হাইকোর্টের নজরে

তাই ‘একক’ কিংবা ‘নিজ’ কেন্দ্রিক বোধ থেকে সমাজের নাগরিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যের ব্যথাকে অনুভূতি দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। আর সচেতনতার সাথে সোচ্চার হতে হবে সামাজিক অনিয়ম আর অসঙ্গতির বিরুদ্ধে। কেবল সোচ্চারই নয়, যে কোন সামাজিক সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য লেগে থাকতে হবে। সেই সাথে জীবন আর মৃত্যুর চিরন্তন সত্যের মাঝে স্বাভাবিকভাবে ভালো থাকার নিশ্চয়তা এই রাষ্ট্রের কাছ থেকে আদায় করে নিতে হবে। আর চাইতে হবে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।

আর এই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির প্রসঙ্গ আসলেই প্রথমে আমাদের চোখ রাখতে হবে অনিরাপদ সড়কে। ফেরাতে হবে সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা। এবং ‘দুর্ঘটনা’র নামে সড়কে প্রাণ কেড়ে নেয়া চলমান মৃত্যুর মিছিল থামাতে সম্মিলিতভাবে সচেষ্ট হতে হবে এখনই। সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে প্রচলিত আইনের পরিবর্তন এবং কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়নে চাপ তৈরি করতে হবে আমাদেরকেই। সর্বোপরি দেশের নাগরিকদেরই হতে হবে সমাজের পাহারাদার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)