চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যেসব বিষয় দেখে নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করতে হবে

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক মাঠে ততই উত্তাপ বাড়ছে, প্রতিনিয়ত পাল্টেছে রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ। নতুন মেরুকরণ, নির্বাচনী জোট, রাজনৈতিক নেতাদের দলবদল, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, ইভিএম পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে সরগরম এখন বাংলাদেশ। নির্বাচন কমিশন কি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে এ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ জল্পনা কল্পনা রয়েছে। তাছাড়া নির্বাচনে কি সব দল অংশগ্রহণ করবে সে বিষয়েও জনমনে আগ্রহ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি ছোট দলের সাথে বড় দল এবং বড় দলের সাথে ছোট দলের নির্বাচনী জোট নিয়েও আলোচনা ও গবেষণা শুরু হয়েছে। আবার রাজনীতিতে যে সকল প্রতিষ্ঠিত জোট রয়েছে সেগুলোর মধ্যে আসন বন্টন নিয়ে আলোচনা, প্রার্থী বদল, নতুন মুখের অনুসন্ধান, তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি সংক্রান্ত বিষয়েও ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক মহলে নতুন নতুন প্রার্থীদের ছড়াছড়ি। সবকিছু মিলিয়ে দেশের মানুষ একটা উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশের প্রত্যাশা করছে।

এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়ে আলোকপাত করা। প্রকৃত অর্থে, এমপি প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে যে বিষয়ের উপর জোর দেওয়া উচিত সে বিষয়ে বেশ কিছু মতামত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

প্রথমত: তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে। কারণ, প্রার্থীর যদি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকে তাহলে কোন মনোনয়ন প্রত্যাশীকে রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দেওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। তাই, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধকরণের স্বার্থে রাজনীতিবিদদের সচেতনতা ও সততার বিকল্প কোন কিছুই হতে পারে না। বাংলাদেশের প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদের মাঝে মধ্যে হতাশার সুরে আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই, রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে প্রাক্তন আমলা ও ব্যবসায়ীরা।নির্বাচন কমিশন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১ তম সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ রাজনীতি সম্পর্কে সব দলগুলোকে সতর্ক ও যথাযথ ভূমিকা রাখার ব্যাপারে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার অনুরোধ রেখেছেন। তিনি নানামুখী উদাহরণ দিয়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধে এবং রাজনীতির মাঠটাকে রাজনীতিবিদদের জন্য বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাজনীতিবিদদের নিকট অনুরোধ করেছেন। সুতরাং বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

তাই প্রথিতযশা এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দুর্বাত্তয়ান বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন বোর্ডে তৃণমূল থেকে উঠে প্রথিতযশা রাজনীতিবিদদেরকেই বেশি দেখা যায় অর্থাৎ মনোনয়ন প্রদানের বিষয়টি তাদের হাতেই ন্যস্ত থাকে। তথাপি তারা কেনই বা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না, আবার তাদেরকেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে কথা বলতে শোনা যায়। লোকচক্ষুর অন্তরালে কোন চাপ কিংবা ষড়যন্ত্রের কারণে কোনভাবেই রাজনীতির সাথে জড়িত নয় এমন কাউকে অন্তত:পক্ষে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া ঠিক নয়। যারা উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো অতিথি পাখি হয়ে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করে থাকেন তাদের উচিত হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জনগণের কাতারে একাকার হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। তাহলেই তাদের প্রার্থীতার সঠিকতা যাচাই বাছাই সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত: মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা বর্তমানে ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দলীয় নেতাদের ব্যক্তিগতভাবে পু্রস্কৃত করে কিংবা প্রলোভন দেখিয়ে অনেকেই মনোনয়ন বাগিয়ে নিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা মনোনয়ন বঞ্চিত হচ্ছেন, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ঐ এলাকা এবং ঐ এলাকার জনগণ। ঐসব প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে এলেও জনগণের সাথে সম্পৃক্ত না থাকায় এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে তেমন কোন প্রভাব আসেনি। কাজেই মনোনয়ন বাণিজ্যের সংস্কৃতি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তৃতীয়ত: নির্বাচনকে সামনে রেখে উঠতি নেতাদের প্রচারণায় সরগরম থাকে এলাকাগুলো। অথচ বাকি সময় তাদের কোন খবরাখবর থাকে না। অর্থাৎ জনগণের সাথে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে তেমন কোন যোগাযোগ থাকে না নির্বাচনকালীন উঠতি নেতাদের। তাই তাদের উদ্দেশ্য ও রাজনীতির মসৃণতা নিয়ে সকলকে সজাগ হতে হবে। তাছাড়া রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ও আমাদেরকে ভাবতে হবে। তা না হলে রাজনীতির পথে দীর্ঘদিন ধরে হাটা মানুষগুলি রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়বে। দলের সংকটকালীন ও প্রয়োজনের সময়ে যে সকল কর্মীরা ত্যাগ ও হামলা এবং বিভিন্নভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন মনোনয়ন দেওয়ার সময়ে তাদেরকেই প্রাধান্য দিতে হবে। না হলে দলের স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যাবে নিমিষেই। রাজনীতিতে আগ্রহ কমে আসবে মেধাবী প্রজন্মের। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরকে পরিবার থেকে রাজনীতির বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

চতুর্থত: যাদের বিরুদ্ধে প্রমাণসম দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তাদেরকে কোনভাবেই রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া ঠিক নয়। এর ফলে অপরাধীরা রাজনীতিতে আসার উৎসাহ দেখাবে না। যার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতির মাঠটা কেবলমাত্রই রাজনীতিবিদেদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

মোটকথা হচ্ছে, একজন সৎ রাজনীতিবিদের যে সব গুণের সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করা দরকার। প্রকৃত রাজনীতিবিদের যে সব গুণের সমাহার দরকার তার মধ্যে অন্যতম হলো: সৎ, বুদ্ধিমত্তা, পেশাদারিত্ব, দেশপ্রেম, জনগণের যে কোন বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়াবার সৎসাহস, দলের বিপদে হাল ধরা এবং পেশা হিসেবে রাজনীতিকে গ্রহণ করার সক্ষমতা যাদের রয়েছে তাদেরকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)