চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যেভাবে বিসিএসে নির্বাচিত মেধাবীরা, যে স্বপ্ন মেধাবীদের চোখে

মেধার পরীক্ষা বিসিএসের মাধ্যমে নির্বাচিত ভবিষ্যৎ কর্মকর্তারা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন যেখানে তৃণমূল পর্যায়ে তাদের জবাবদিহিতা থাকবে, আগামী প্রজন্মের জন্য তারা শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন, আর প্রযুক্তিকে পৌঁছে দিতে পারবেন সকলের কাছে। তাদের পূর্বসূরি সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে অনেক স্বপ্ন ভাঙ্গার বেদনা থাকলেও স্বপ্নবান মানুষগুলোকে শুরু থেকে যত্নে গড়ে তুললে আর উপযুক্ত পরিবেশ দিলে, নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে দেশেরই স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ৩৪তম বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসেস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করেছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। এতে দুই হাজার ১৫৯জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে ছয় হাজার ৫৮৪ জনকে।

এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে সরাসরি ভূমিকা পালন করবেন। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে তারা কেমন দেখতে চান এবং সেই বাংলাদেশ গড়তে তারা কীভাবে ভূমিকা পালন করবেন সেসব নিয়ে কথা হয়েছে বিসিএস পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো ফল করা কয়েকজনের সঙ্গে।

তাদের একজন মৌসুমী ভট্টাচার্য, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অবদান রাখার স্বপ্ন দেখেন যে মৌসুমী। সেই স্বপ্ন থেকেই অন্য কোনো পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি। বিসিএস পরীক্ষায় শুধু শিক্ষা ক্যাডারেই আবেদন করেছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করেছেন কিশোরগঞ্জের এই মেধাবী মেয়ে। স্বপ্ন বাস্তায়নের প্রথম সোপান, বিসিএস শিক্ষায় প্রথম হয়েছেন মৌসুমী।

এবার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পালা। মৌসুমী স্বপ্ন দেখেন, নতুন প্রজন্ম এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে যেখানে দেশের প্রতিটা ছেলেমেয়ে শিক্ষার সমান সুযোগ পাবে। আর শিক্ষার মাধ্যমে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে ছেলেমেয়েরা। শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করলেই কোনো ব্যক্তিকে শিক্ষিত মানুষ বিবেচনা করেন না মৌসুমী।

তার মতে, শিক্ষা ব্যাবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় আগ্রহী হয়। তৃণমূলের ছেলেমেয়েরা যাতে শহুরে ছেলেমেয়েদের মতো শিক্ষার সমান সুযোগ পায় সে ব্যাপারে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে মৌসুমীর। কেউ যাতে পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য সব ছেলেমেয়ের শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।

কঠোর পরিশ্রম আর অনুশীলনের কল্যাণে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম হতে পেরেছেন বলে মনে করেন মৌসুমী। আর বিসিএসে ভালো করার জন্য বাংলা, ইংরেজি এবং গণিতে নূন্যতম দক্ষতা থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

সমাজবিজ্ঞানে পড়ে শিক্ষকতা পেশায় যাচ্ছেন মৌসুমী, আর শিক্ষা বিষয়ে লেখাপড়া করে প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন ঢাকার মেয়ে মুনিয়া চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনিস্টিটিউট (আইইআর) থেকে লেখাপড়া শেষ করে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে ‘পাবলিক হেলথ’ বিষয়ে আরেকটি মাস্টার্স করছেন মুনিয়া। বিসিএস পরীক্ষায় তিনি যেমন প্রথম হয়েছেন, অনার্স-মাস্টার্সেও তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম।

বিজ্ঞাপন

মুনিয়া মনে করেন, দেশের বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করে চাকরি সংক্রান্ত লেখাপড়ায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েন। যে বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার সনদ নিচ্ছেন সেটা গৌণ হয়ে পড়ে। কিন্তু কেউ চাইলে সার্টিফিকেট অর্জন এবং চাকরির পরীক্ষায় একইসাথে ভালো রেজাল্ট সম্ভব।

দেশের তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ আছে বলেই প্রশাসনে কর্মকর্তা হতে আগ্রহী হয়েছেন মুনিয়া। তিনি মনে করেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে সম্মানজনক অবস্থানে এগিয়ে নিতে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ই-গভর্নেন্স এর পথে রয়েছে। এটাকে আরো কার্যকর করার পরামর্শ মুনিয়ার।

শিক্ষা গবেষণার লেখাপড়ায় অনেক ভালো রেজাল্ট করেও আমলা হতে চেয়েছেন মুনিয়া। কারণ বাবাকে দেখে অনুপ্রাণিত তিনি। সচিব চৌধুরী বাবুল হাসানের মতোই আমলা হতে চেয়েছেন তিনি। আর বলেছেন, সবসময় ভালো রেজাল্টের কৃতিত্বও বাবা-মায়ের।

মুনিয়ার পরই শাহ মুহাম্মদ সজীব, প্রশাসন ক্যাডারে দ্বিতীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। দ্বীপ জেলা ভোলার ছেলে সজীব বিসিএস পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে অনার্স তৃতীয় বর্ষ থেকে প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রতিদিন নিয়ম করে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে পড়াশোনা করতেন সজীব। তবে বিসিএস পরীক্ষার জন্য বিভাগের পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করতে পারেননি।

সজীব এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন যেখানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কোন দূরত্ব বা আড়াল থাকবে না। প্রশাসনের কর্মতৎপরতা আরো গতিশীল হবে। কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকবে না যে জটিলতার কারণে জনগণের সময় এবং অর্থের অপচয় হয়। ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’ কথাটিই জাদুঘরে চলে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন সজীব। প্রশাসনকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে আমলাদের কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে উন্মুক্ত থাকা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

মৌসুমী, মুনিয়া, সজীবদের মতো মেধাবী তরুণ কর্মকর্তাদের নিয়ে আশাবাদী সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, মেধার কোনো বিকল্প নেই। মেধাহীন মানুষ দিয়ে একটি রাষ্ট্রযন্ত্র চলতে পারে না। তাই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যতো বেশি মেধাবী মানুষ যুক্ত হবেন সরকার ততো শক্তিশালী হবে।

বিসিএসের মতো পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবীদের খুঁজে বের করার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন আলী ইমাম মজুমদার।

একজ মেধাবী মানুষ কোন বিষয়ে লেখাপড়া করে এসে কোন দায়িত্ব পালন করছেন, সেটাও মুখ্য নয় সাবেক এই আমলার কাছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, দেখা গেছে একজন রসায়নে লেখাপড়া করে গুরুত্বপূর্ণ আমলা হয়েছেন।

বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসনসহ অন্যান্য যেসব ক্যাডারে কর্মকর্তা নিয়োগ হয় সে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই মেধাবীদের খুঁজে বের করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। চলমান সিস্টেমেই এইসব মেধাবী কর্মকর্তাদের মেধার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন আলী ইমাম মজুমদার।