চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘যেটা দৈনিক ব্যবহার করি, সেইডাই দেহি উর্দু হইয়া আইসা পড়ছে’

ভাষা সংগ্রামী ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলামের বাবা মির্জা হেলাল উদ্দিন। ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের কালিহাতির চারানে তার জন্ম।

বিজ্ঞাপন

ভাষা সংগ্রামী ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম কলকাতা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস এর ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ব্যাচে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। এমবিবিএস পাশ করেন ১৯৫১ সালে। ভাষা আন্দোলনে তিনি তমদ্দুন মজলিশের সদস্য এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাজ করেন তিনি। ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিফ কনসালটেন্ট অব সার্জারি হিসেবে কাজ করেছেন সাক্ষাতকার গ্রহণের সময়। ২০০১ সালের ৩০ জানুয়ারি তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়।

তা. ই. মাসুম: ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন কবে?
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: আমি নাইন্টিন ফোর্টি সিক্সে ব্রিটিশ পিরিয়ডে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হই।

সাক্ষাতকার দিচ্ছেন ভাষা সংগ্রামী ড. মির্জা মাজহারুল ইসলাম। সাক্ষাতকার গ্রহণ করছেন তারিকুল ইসলাম মাসুম

তা. ই. মাসুম: আপনার তো ১৯৫১ সালে ছাত্রত্ব শেষ হলো, আপনি অনারারী কাজ করছেন।
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: হ্যাঁ। কিন্তু তখন আমি ছাত্রের কাজই করে যাচ্ছি, যেহেতু আমি সিনিয়র মোস্ট স্টুডেন্ট, তখন থেকেই এবং আমি লিডার ছিলাম ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের। নাইন্টিন ফোর্টি এইট থেকে আমরা আরম্ভ করেছিলাম এইটা। ভাষা আন্দোলনের যত বিক্ষোভ, সব তখন থেকেই আরম্ভ হইছিল।
বলতে গেলে ১৯৪৭ সনেই, আমি তো তখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকতাম। আমি যখন ভর্তি হই, তখন কিন্তু এই হোস্টেল তৈরিই হয় নাই। পরে নাইন্টিন ফিফটিতে আমরা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে আসি। কাজেই আমরা, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলেই তো একটা নিউক্লিয়ার গ্রো করে।
এই যেখানে প্রফেসর আবুল কাশেম, ওনার দুই একজন সঙ্গী-টঙ্গী নিয়া প্রথম আরম্ভ করলেন, ভয়ে ভয়ে, ভয়ে ভয়ে।
আর উনি একটু মোল্লা পত্তনের মানুষ ছিলেন তো! ওনার বাসা ছিল আজিমপুরে। এই আমি, আমার সঙ্গে তখন ছিলেন শামসুল আলম সাহেব, যিনি রাষ্ট্রভাষা কমিটির মেম্বার ছিলেন আমিও প্রথম কমিটির মেম্বার ছিলাম। আমরা ঐখান থেকে আজিমপুরে যাই! এই যে ব্যাপারটা হইল, এই যে দেশটা হইল? কিন্তু এর ল্যাংগুয়েজ নিয়া যে কথা উঠছে? এটার কী হবে? তমদ্দুন মজলিস তখন ঠিকই জন্ম হইল।
কাজেই আমরা এটা নিয়া যত গবেষণা-টবেষণা, যত ষড়যন্ত্র সব আমরাই করছি।
তারপরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে, যেহেতু আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র নাইন্টিন ফোর্টি এইট, তখন আমাকে বলা হইল, আমাকে হুকুম দেওয়া হইল যে, মেডিকেল কলেজকে আপনি ছাত্রদের নিয়ে বিক্ষোভটা হবে।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সচিবালয়মুখী ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র ও জনতার মিছিল, এই মিছিলের নেতৃত্ব দেন ভাষা সংগ্রামী ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম। ছবি তুলেছেন ভাষা সংগ্রামী আ জা মু তকীয়ূল্লাহ।

সেক্রেটারিয়েটে, সে বিক্ষোভে আপনার মেডিকেল কলেজের ছাত্রগুলা নিয়ে আপনি চইলা আসবেন। যেহেতু আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলেই থাকি, কাজেই কোনো অসুবিধা ছিল না তো।
কাজেই, ঐ চার্জটা আমাকেই দেওয়া হইছিল। আমি সে কাজটা করেছিলাম। আমি, বর্তমানে যেখানে হাইকোর্টের গেটটা, যেখানে মাজার হইছে, যেখানে শিক্ষা ভবন হইছে, তখন কিন্তু শিক্ষা ভবন ছিল না ওখানে। কিছুই ছিল না ওখানে। খালি হাইকোর্টটা ছিল আর কার্জন হল ছিল আর ঐ পাশে আব্দুল গণি রোডে দু’একটা লাল বিল্ডিং ঐখানে একটা মন্ত্রীও ছিলেন।
’৪৮ সনে আমরা ওখানে মিটিং করে, তখন আমাদের ওপর পুলিশ হামলা করে। হামলা করার পরে দৌড়িয়ে নিয়ে যায় এবং কাশেম সাহেবকে তো কার্জন হলে ঢুকিয়ে দিলেন। আমরাও পরে দৌড়াইয়া-দৌড়াইয়া কার্জন হলে যাইয়া আশ্রয় নেই। আই ওয়াজ দ্য লিডার অব মেডিকেল কলেজ।
কাজেই খুব সিনিয়র ছিলাম। তখন এই সময়কার এই আন্দোলনে আসতে আমাদের অনেক ভয়ানক চিন্তা করে আসতে হইছে।
ঐ গভমেন্টকে কেউ অপোস করবে? এরকম একটা কন্ডিশন তখন ছিল না।
আমরা কেন উদ্বুদ্ধ হইলাম? আমরা দেখলাম যে ঢাকায়, পপুলেশন তখন ১ লাখও ছিল না সেই ঢাকায়, ’৪৭এ ডিভিশন হওয়ার পরে। রিফিউজি এসে গেল ২ লাখের মতো! জায়গা নাই! থাকার জায়গা নাই, রেলওয়ের কম্পার্টমেন্টে লোক থাকে, হিন্দুরা যেগুলা ভ্যাকান্ট করে ফেলে গেছে সেগুলায় লোক থাকে। অফিস আদালতের বারান্দায় মানুষ থাকে। এরকম একটা অবস্থা!
সময়টা এমনই ছিল যে, তখন কিন্তু রিক্সা-টিক্সা এগুলা কিছু ছিল না।
সব ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতাম আমরা। যেটা আজকাল দেখেন না? শেরাটনের সামনে ঘোড়ার গাড়ি রেখেছে?
দ্যাট ওয়াজ দ্য সফিস্টিকেটেড ট্রান্সপোর্ট এ্যাট দ্যাট টাইম!
ঐটা আমরা সলিমুল্লাহ হলের থেকে যদি সদরঘাটের(চিত্তরঞ্জন এভিনিউ) ওখানে, কোন সিনেমা দেখতে যেতে হতো, আমরা ৪ জন ঐটার মধ্যে উঠতাম এবং এই চার জনে ২ আনা করে দিয়া আট আনা দিয়ে চলে যেতাম ওখানে। আবার রাত্রে ঠিক সিনেমা দেখে চলে আসতাম আরেকটায় করে।
আচ্ছা, যাইহোক এই ঘটনার দিন, আমরা ঐ পর্যন্ত করেছিলাম। ঐ সময়ই কিন্তু শেখ মুজিব, তোহা, অলি আহাদ, এই লিডারগুলি এ্যারেস্টেড হইয়া যায়।

তা. ই. মাসুম: ১১ মার্চ?
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: হুম। ১১ই মার্চে যে এ্যারেস্ট হইছিল এর মধ্যে অনেক কিন্তু, হাজার খানেক ছাত্র-জনতা এ্যারেস্টেড হইয়া যায়। সেই ১১ই মার্চের এই এ্যারেস্টের পরে।
সারা দেশে কিন্তু বিক্ষোভটা হইছিল ১১ মার্চ। তারপরে ওরা বুঝতে পারল যে, এটা একটা কঠিন জিনিস হয়ে যাচ্ছে। তখন আবার এই ঠিক মার্চ মাসেই কিন্তু, কায়েদে আযমের (ঢাকায়) আসার কথা। তো আমরা ঐ সুযোগ বুঝেই ঔটা করছিলাম। যে তাকেও আমরা বিক্ষোভ করব।
সেই সময় আমাদের নাজিমুদ্দিন সা’ব, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। উনি আমাদের সঙ্গে একটা কম্প্রোমাইজে আসেন। সেই কম্প্রোমাইজটা ছিল, আমরা ছেলে-পেলেদের যাদের এ্যারেস্ট করেছি তাদের ছেড়ে দিব, আমরা এ্যাসেম্বলিতে পাশ করিয়ে দিব। যে একটা ওয়ান অব দি স্টেট ল্যংগুয়েজ হওয়া উচিৎ বাংলা। এই ওয়াদা করেন। ওয়ান অব দি স্টেট ল্যাংগুয়েজ। দুইটা, উর্দুর সাথে। আমরা কিন্তু এক্সেস দাবি করি নাই। আমরা কিন্তু দাবি পুরাটাই করতে পারতাম! ফিফটি সিক্স পার্সেন্ট আমরা।
কিন্তু সেই সন্ধি উনি ভেঙে ফেললেন নাইন্টিন ফিফটি টুতে এসে। কাজেই আন্দোলনটা ’৪৮ এর পরে একটা ভাটা পড়ে ছিল, বেশি একটা আন্দোলন-টান্দোলন নাই, এই রকম চলছিল আর কি।
কিন্তু ঐ সময় যখন উনি এসে আবার বক্তৃতায় বলে ফেললেন, না, উর্দু এন্ড উর্দু …, উনি ঐ কায়েদে আযমের ল্যাংগুয়েজের মতোই বলে ফেললেন। যেটা কায়েদে আযম ১৯৪৮ সালে বলেছিলেন, সেইটাই। তো, তখন তো আর উপায় ছিল না। তখন ঐ ২১শে ফেব্রুয়ারি। এইটাই হইল ব্যাকগ্রাউন্ড।
আর আপনি যদি তার আগে জানতে চান ভূমিকা। এটা প্রেক্ষাপট জানতে চান?
তাহলে ভারত বিভক্তির পর, আমি ভারত বিভক্তির পর থেকেই ধরি যে, মুসলিম লীগের যে ফর্মূলায় বিভক্তি হওয়ার কথা ছিল।
সেটা ছিল যে, ইস্টে একটা মুসলিম মেজরিটি স্টেট একেবারে স্বাধীন সার্বভৌম স্টেট হবে। এবং ওয়েস্টে একটা হবে স্বাধীন সার্বভৌম স্টেট।
মাঝখানে ইন্ডিয়া আরেকটা হবে। এই তিনটা ডিভিশন হওয়ার কথা, আমাদের লাহোর রেজ্যুলেশন নাইন্টিন ফোর্টিতে যেটা ফজলুল হক সাহেব (শেরে বাংলা এক কে ফজলুল হক) মুভ করেছিলেন।
সেটায় ছিল। কিন্তু এরা সেই ফর্মূলায় আর রইল না। এটা কবে হইল? নাইন্টিন ফোর্টি সিক্সে।
ফোর্টি সিক্সে, আমি তখন কলকাতায়। আমি কিন্তু কলকাতা থেকে আসলাম। তো ফোর্টি সিক্সে কলকাতায় তখন, ওরা বলল যে না, দুইটা স্টেট হবে। একটা পাকিস্তান একটা ইন্ডিয়া।
ইস্ট পাকিস্তান আর ওয়েস্ট পাকিস্তান এইভাবে হবে। এটা, এই ফর্মূলাটা আমাদের বাংলাদেশের, বর্তমান বাংলাদেশের, পূর্ব বাংলার লোকেরা মেনে নিতে পারে নাই।
বরং আমরা তো মেনে নিতে পারিই নাই, আমরা কলকাতায় থাকতাম, আমরা বলতাম কলকাতাই আমাদের রাজধানী হবে। তো এই রকম একটা সিচুয়েশনে ওরা এই প্রপোজালটা যখন মুসলিম লীগ যখন একটা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে করল যে, ইস্ট পাকিস্তান ওয়েস্ট পাকিস্তান একটা থাকবে। মিলে এক পাকিস্তান, সেটা মাইনা নিতে পারে নাই কয়েকজন লোকে।
এক, প্রপোজাল ফজলুল হক সাহেবও মানেন নাই। তারপরে বদরুদ্দীন ওমরের ফাদারের নাম ছিল জানি কি?

তা. ই. মাসুম: আবুল হাশিম।
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: মুসলিম লীগের তখন উনি, উনিও তখন বেরিয়ে আসছিলেন মিটিং থেকে। অপোস (প্রতিবাদ) কইরা।
আমি একটা প্রমাণ আপনাকে দেই, যখন ডিভিশন হইয়া গেল।
হইয়া যাওয়ার পরে যখন ঢাকায় চলে আসতে হবে তখন কয়েকজন লোক আসে নাই, কলকাতা থেকে।
এক হইল শেখ মুজিব আসে নাই, সোহরাওয়ার্দী আসে নাই, ভাসানী আসে নাই, ফজলুল হকও আসে নাই। তারা খুব একটা ইনিসিয়েশন নিল যে, ঢাকায় আইসা উঠবেন? এটা তারা করে নাই। কিন্তু তাদের মনের মধ্যে দুঃখ যে, যা চেয়েছিলাম তা পাই নাই।
ইভেন, সোহরাওয়ার্দী শরৎ বোসের সাথে প্যাক্ট করে ফেলছিলেন, যে আমরা বাংলাদেশটাই আলাদা করব। যে, বেঙ্গলটাকে আমরা ওয়ান অব দ্য স্টেট করে ফেলব। সেই জন্য তাদের সাফারিংও হইছে। তারা পলিটিক্সে আসতে পারে নাই। তারপরে এই যে, সোহরাওয়ার্দীকে ঢুকতেই দেয় নাই দুই বছর! এই ইস্ট পাকিস্তানে! সে কলকাতায়ই রয়ে গেল। তো, এই সব ইতিহাস কিন্তু খুব একটা ভাল ইতিহাস ছিল না।
তার ভিতর যখন, ওরা ‘৪৭এ করল কি, স্ট্যাম্প, পোস্ট কার্ড, টাকা, পয়সা, যেটার মধ্যে ব্রিটিশ পিরিয়ডেও বাংলায় লেখা ছিল! ইভেন ইন কয়েন! সেগুলি উঠাইয়া দিল! উর্দু আর ইংরেজি হইয়া গেল।
তো ছাত্ররা ক্ষেপবে না ক্ষেপবে কে?
আমরা যেটা দৈনিক ব্যবহার করি, টাকা-পয়সা, বাবা মার কাছে পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখি, সেইডাই দেহি যে উর্দু হইয়া আইসা পড়ছে!
এইডাই আমাদের খ্যাপাইল বেশি! যে না, তাইলে তো আর এক ব্রিটিশ গেছে! আরেকটা তো আসতেছে! এখনই বাধা দিতে হবে! কী ভাবে করা যায়? ডাইরেক্ট কিছু করা যাবে না, ইন্ডিরেক্টলি কিছু করতে হবে।
এরপরে যা ঘটল, সেটা হইল, একটা এনিমিটি হইতে আরম্ভ করল উর্দু আর বাংলার সঙ্গে। সেইটাই আমাদের উর্দুওয়ালাদের সাথে, তারা অফিসিয়াল অফিস বা আদালতে যত জায়গায়ই আমরা যাই, উর্দুতে কথা না বললে আমাদের পাত্তা দেয় না। ইভেন কোনো কোনো জায়গায় ধ্বস্তা-ধ্বস্তিও হইয়া গেল।
আর ঐদিনের ঘটনা, আপনি যদি ঠিক ঐদিনের ঘটনা জানতে চান, ২১শে ফেব্রুয়ারির ঘটনাগুলা যদি জানতে চান, তাহলে আমি তখন ঢাকায়, আমি যেহেতু ফিফটিতে চলে আসছি সলিমুল্লাহ হলের থেকে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাক। এখানে কিন্তু ঐ ব্যারাক, এখানে কিন্ত ঐ দালান-টালান না। বাঁশের ব্যারাক, বাঁশের ছাউনি।
এই ব্যারাক, তার ছবি-টবিও আছে এই বইতে। ঐটায় পাবেন আপনি। সেই বাঁশের ব্যারাকে থাকতাম আমি, ১৯/৫ নম্বর রুমে থাকতাম। কাজেই সকাল বেলা আমতলার মিটিং সেরে, আমতলার মিটিংএ থেকে আমরা এই হোস্টেলের দিকে আসতে ছিলাম। আমাদের আসতে আসতে বেশ সময় হয়ে গেল। আমি হাসপাতালেও কিছু কাজ করেছি ঐ সময়।
কিন্তু ঠিক ৩টার সময় যখন আমরা ঐ ইটা ভেঙে সব লোক চলে আসল, দেয়াল ভেঙে আমরা চলে আসলাম। আমরা কিন্তু বাইরে গেলে এ্যারেস্টেড হয়ে যেতাম। যত এ্যারেস্ট দেখতেছেন?
এ সব বাইরে দিয়া যারা গেছে তারাই। আর আমরা কয়েকটা চালাক যারা ছিলাম, তারা দেয়াল ভেঙে ভিতর দিয়ে আসলাম। ভিতর দিয়া হোস্টেলে এসে গেলাম যে, আমরা এ্যসেম্বলিতে চলে যাব। ঐ এ্যাসেম্বলির সামনে গিয়া আমরা বিক্ষোভ করব। তখন ঐ এ্যাসেম্বলির মিটিং চলছিল।
তো আমরা ভিতরে ঢুইকা হোস্টেল পর্যন্ত চইলা গেলাম। এই তখন আমি যদি একটা চেহারা আমাকে বলতে বলেন যে, এই এলাকাটা কেমন ছিল?
এই ধরুন, শহীদ মিনার এলাকা, মেডিকেল কলেজ, ইউনিভার্সিটি, কার্জন হল আর এইগুলার মধ্যে তখন খালি ধোঁয়া। এ ধোঁয়াগুলা কী? টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া।
আর পুলিশ, আর ছাত্র আর জনতা। ভয়ানক একটা অবস্থা হয়ে গেছিল ওখানে। তখন আমরা ভেতর দিয়ে গিয়ে হোস্টেলে ঢুকলাম।
হোস্টেলে ঢোকার পরে দুই দিকে ফেসিং করা হইল। ওরা, পুলিশও দাঁড়াইল, আমরাও দাঁড়াইলাম। এদিক দিয়ে ঢিল-ঢুল যত সব মারা হইল। তখন এই বেলা গড়িয়ে গেছে, এমন একটা সময়।
কয়েকটা ম্যাজিস্ট্রেট, ওখানে কতগুলো ছোট ছোট্ট রেস্টুরেন্ট ছিল তারই পেছনে ওরা বইসা দেখতেছিল এইগুলি।
তারাই হুকুম দিল! গুলি করার। তখন ঢাকার ডিসি নন বেঙ্গলি। এসপিও নন বেঙ্গলি। সব কিন্তু নন-বেঙ্গলি এরা। নাম-টামও বলতে পারি।

বিজ্ঞাপন

তা. ই. মাসুম : নাম বলেন।
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: ইদ্রিস, তার পরে মাসুদ, এগুলা ওরাই। এ্যাডমিনেস্ট্রেশন তারাই সব। চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহম্মেদ। ‘হি ইজ রানিং দি হোল শো’।
নূরুল আমিনের বলবার কিছুই নাই এখানে। প্রধানমন্ত্রী, কিছুই করার নাই। তখন ডাইরেক্ট করাচীর ইনস্ট্রাকশনে এরা চলতেছে।
তো এরাই তখন মাঠে, কাজেই গুলি চালাইতে তাদের বেশি অসুবিধা হয় নাই।
এবং গুলি তারা চালাইল। হোস্টেলের ভিতরে আইসা ঢুকে গুলি করল। এই গুলি করার সময়টায় আমি হোস্টেলে। ২০ নাম্বার ব্যারাকের সামনে একটা পড়ে গেল। এই থাইয়ের মধ্যে গুলি লাগছে তার। ব্লিডিং হইয়াই মারা গেল, আমরা নিয়া সারতে পারলাম না। তখন কয়েকটা (গুলিবিদ্ধ আহত) নিয়া আমরা দৌড়াইয়া চলে আসলাম।
আমারে আবার হাসপাতালে ডাকা-ডাকি করতেছিল। যে, তোমার তো ওখানে যাওয়ার কথা না, তোমারে যেগুলি ইনজিউরড সেগুলোর চিকিৎসা করার কথা। তখন আমি ওখানে চিকিৎসায় লেগে গেলাম।
ডেড বডি যদি জানতে চান? এগুলি কাপড় দিয়া ঢেকে রেখেছিল। সবগুলি এক কাপড় দিয়া। মানে এমনভাবে ঢাকছে যে, গোনার কোন উপায় নাই। আমরা পালাইয়া পালাইয়া যাইয়া গুনতেও পারলাম না। পুলিশ ওখানে পাহারা দিয়া রাইখা দিছিল। আমাদের এই অপারেশন থিয়েটারের এক পাশে।
আরগুলি তো আপনার এগুলি জানেন, কার কার? গুলি চলছিল কোথায়?
আর একটা, একটা ডেড বডি আমি পড়া দেখছি ইসে, এখন যে আউটডোর গেটের সামনে, মাঠের কোনাটা, এখানে একটা পড়ে ছিল। এটা একবারে ই হয়ে ছিল, মাথা (মগজ) বেরিয়ে গেছে। এটা আমার নিজের চোক্ষে দেখছি। আর হোস্টেলের মধ্যে দুইটা পইড়া ছিল, রাস্তায়ও ছিল। এই এলাকাটা যখন আমাদের চোখের সামনে ছিল, তখন দেখেছি। একবারে আই উইটনেস্।
আর কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকলে বলতে পারেন আপনি।

ভাষা সংগ্রামী ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলামের ১৯৫২এর ছবি

তা. ই. মাসুম: ভাষা আন্দোলন করলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে কী পেলেন?
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: হুম্, আমি তাইলে কী পেলাম! এটা বলব যদি ম্যাক্সিমাম আমাদের অর্জন, এই ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্টটাই কিন্তু আমাদের স্বাধীনতার দিকে নিয়া গেছে। এই আপনার মুক্তিযুদ্ধের শুরু। আমরা এইটাই বলব। ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্ট মুক্তিযুদ্ধের শুরু।
তারপরে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে আমরা জিতেছি। আমাদের প্রাপ্যতা আরো বেশি ছিল।
যে নিজের ল্যাংগুয়েজে, সারা দুনিয়ায় বাংলা ভাষা-ভাষী স্টেট হবে। সারা দুনিয়ায় আমরা দাঁড়াইয়া যাব। এবং আমরা, সবই তো আমরা পুওর এর মিডল ক্লাস, আমাদের মধ্যে জমিদাররা ছাড়া ওয়েল টু ডু লোক এই বাংলাদেশে ছি না।
তো কাজেই, আমরা মনে করছিলাম যে, জনগণের শাসন যখন আসবে আমরা ঐ উন্নত দেশের মতো হয়তো আমরা দাঁড়াইয়া থাকতে পারব। তাদের মতো বলতে পারব, তাদের মতো আমরা উন্নত জীবনও যাপন করতে পারব।
আমি একটা মেডিকেল ছাত্র হিসেবে যা করেছি, আমার মনে হয় আমার কর্তব্য আমি করেছি।
আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছি বিইং এ গভমেন্ট সার্ভেন্ট। যেটা আরকেউ করতে পারে নাই!
ঐ বইয়ের মধ্যে পাবেন।
তার পুরো সাক্ষী আমার শফীউল্লাহ। মেজর শফীউল্লাহ। জেনারেল শফীউল্লাহ সে আমার কাছে, আমি যখন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রফেসর ছিলাম।
সে যেয়ে ডেকে আমাকে বলল, আমাকে দুইটা ডাক্তার দেন আমি যুদ্ধে যাচ্ছি।
আমার সার্জিক্যাললি ট্রেইন ডাক্তার নাই।
আমি বারান্দা থেকে খালি দুইটা লোককে আইডেন্টিফাই করেছিলাম,
এই তোরা যুদ্ধে যাবি না-কি?
আমার সঙ্গে দুইটা ক্যাপ্টেন।
বলে, যাবি না-কি? স্যার কী বলছেন? সবার যেতে হবে। আমরা যাকে বলব, সেই যেতে হবে।
আমি বলি, তোমরা যাইবা না-কি?
বলল, হ্যাঁ যাব।
খুব বোল্ডলি বইলা ফেলল দুইটা ডাক্তার, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ডাক্তার।
সেই দুইটা ডাক্তার নিয়া ওরা চইলা যায়। সেই দুইটা ডাক্তার নিয়া একটা ব্রিগেড নিয়া ওরা চইলা যায় যুদ্ধের দিকে। তারপর তারা পার হইয়া ইন্ডিয়া চইলা যায়।
তারা রীতিমত যুদ্ধ করে ফিরে এসে আমাকে সালাম করছে।
সেদিনও আমি জেনারেল শফীউল্লাহর সামনে এই কথাগুলা বলতে ছিলাম।
আমার দুই ডাক্তার একটার নাম মোহাম্মদ আলী, আরেকটা আবিদুর রহমান। আমি জানি, তাদের খোঁজখবর আমি এখন পর্যন্ত আমি রেখেছি ঐ দুই ডাক্তারের। এবং সে বলছে আপনার ঐ দুই ডাক্তারের খোঁজখবর আমার কাছে আছে, তারা কোথায় কী করছে।
সুন্দর বলছে আপনার ঐ দুই ডাক্তারের নাম আমি মনে রাখছি। তারা কে কোথায় এবং কীভাবে আছে। এবং আমাকে বলা হইছে, যে আপনিই দিয়েছেন স্যার, এখন মারা গেলে উনিই দায়ী হবেন।
যুদ্ধের সময় ওরা না-কি বলছে, স্যার, আমরা মারা গেলে আমাদের স্যারই দায়ী হবেন। আমাদের বাপ-মাকে বলে আসতে পারি নাই।
কী কথা দেখেন? কথার কত ভ্যালু? আবার ওরাই এসে আমাকে সালাম করে বলছে,
স্যার আপনি ভাল কাজ করছেন।
যুদ্ধের সময় কিন্তু ওরা বলছিল যে, মনে হয়েছিল আপনাকেই মেরে ফেলি আমরা। আমাদের এখানে আসতে হইত না। এখন মরে যাব কি-না জানি না।
কিন্তু আবার যুদ্ধে জিতে গিয়ে, তখন আপনাকেই আবার সালাম করেছি। যে আপনি খুব ভাল কাজটাই করেছিলেন।
আর ঐ ময়মনসিংহের যত সার্ভিস মুক্তিযুদ্ধের, যতভাবে পারা যায়, করা হয়েছে।
কিন্তু আমার লাইফ ও ডেঞ্জারে ছিল। আমি মরে যেতাম। যুদ্ধে আমি মরে যেতাম যদি তাড়াতাড়ি ইন্ডিয়ান আর্মি ল্যান্ড না করত।
তো প্ল্যান-ট্যান হইছিল, ওরা সময় পায় নাই। আমি কিন্তু ওদেরই চিকিৎসা করছি হাসপাতালে। আন্ডার বেয়নেট। এরকম একটা ঘটনা এখানে লেখা আছে। আমার কাছ থেকে বের করে নিছে ইত্তেফাক। এটা একটা সত্যি কথা, এটা অত দিন বলি নাই, বলতে বাধ্য হইছি। এই বইতে পাবেন আপনি।
আপনি দয়া করে, আমি আপনাকে একটাই রিকোয়েস্ট করব, আপনি বইটা পড়ে তার পর লিখবেন। আমি এত কথা এই সময়ের মধ্যে বলতে পারলাম না।

তা. ই. মাসুম: স্যার, তাহলে এখন এই বাংলাদেশে। এর মধ্যে আর অর্জন কী? আমরা মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছি, এরপরে?
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: আমি কিন্তু খুব আশাবাদী। বর্তমান অবস্থায় একটা কেয়ারটেকার গভমেন্ট থাকছে, তাও আমি খুব আশাবাদী, আমরা বোধ হয় সেই পথে যাচ্ছি। আমরা হয়তো সেই প্রান্তে গিয়ে পৌঁছতে পারব।
যে দিন বোল্ডলি বলতে পারব, ‘বাংলাদেশ ওয়ান অব দি বেস্ট কান্ট্রি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’। এটা আমার হোপ, আমি ৮২ বছর বয়সে বলছি, আমি হয়তো দেখে যেতে পারব না। কিন্তু আপনি এটা দেখবেন, বাংলাদেশ ওয়ান অব দি বেস্ট কান্ট্রি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড হবে।
কারণ আমরা কাজ করতে জানি, আমরা কাজ করি, আমাদের কাজ করাইয়া নিলে আমরা কাজ করি। সারা পৃথিবীতে আমাদের নাম আছে।
আমি ব্রিটিশ ডিগ্রি নিয়া আসছি, এই দেশের ডিগ্রি নিছি, আমি আমার টপ লেভেলে আছি।
মেডিকেল ছাত্র হিসেবে আমি, একটা সাবজেক্ট সার্জারি, আমি তার টপে আছি। আজ পর্যন্ত ৮২ বছর বয়সে এমবিবিএস এর পরীক্ষা আজকে নিতেছি ওখানে। যেখান থেকে উঠে আসলাম। আজকেই কিন্তু নিতেছি। আমি দেখলাম যে এটা আমার একটা কর্তব্য।
তারিকুল ইসলাম মাসুম আসছে, সে হয়ত এ পদটা ভুলে যাবে যে, উনি হয়ত পরীক্ষার জন্য আমার সাথে দেখা করলেন না।
বলবেন যে, আমার একটা ইম্পর্টেন্ট ইন্টারভিউ উনি এ্যাভয়েট করছেন। আমি সেটা করি নাই।

তা. ই. মাসুম: আপনি এখন না পারলে, আমি আবার আসতাম। আমিও মানুষের সময়ের মূল্যটা বুঝি। এবং বোঝার চেষ্টা করি। এবং আমিও চেষ্টা করি সময়ের সাথে চলার।
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: ভেরি গুড!

তা. ই. মাসুম : দোয়া করবেন স্যার।
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: সকাল নয়টায়, এত তাড়াতাড়ি আসছি, অন্য জায়গার ফাংশন ছেড়ে দিয়ে। একেবারে পৌনে নয়টায় বসে গেছি, এই তারিকুল ইসলাম মাসুম আসবে।
ঐ ওকে বলছি (একজন সহকর্মীকে দেখিয়ে), ঐ যে ওকে জিজ্ঞেস করেন! বলছি যে, চ্যানেল আইএর লোক আসবে, তুমি তাদের বসাইবা। আমি ইম্পর্টেন্স দিয়েছি। জাতীয় কাজ হিসেবে এটা মনে করে।

তা. ই. মাসুম: স্যার আরেকটা বিষয়, ঐ সময়ে আপনার যারা সহযোগী ছিলেন, বন্ধু ছিলেন এরকম কারো ঠিকানা বা নাম্বার কি আপনার কাছে আছে?
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: আছে তো, ঐ যে যারা ২১শে ফেব্রুয়ারি যেদিন শেষ হইল আমরা ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২৩শে ফেব্রুয়ারি যে আামরা একটা শহীদ মিনার করলাম।
কাগজটা প্রথম আমার কাছে, আমার বন্ধু বদরুল আলম সে আইসা বলল, এই, ওরা তো একটা শহীদ মিনার করতে বলে।
আমি কই, চল যাই কে বলছে? শহীদ মিনার তো আমি আগে বলছি।
বলে যে, এইটার একটা স্মৃতি থাকতে হবে। শহীদ মিনার না বলে একটা স্মৃতিস্তম্ভ করতে হবে।
আমি শহীদ মিনারটা তখন বলতে পারি নাই। একটা স্মৃতিস্তম্ভ কইরা দিমু হোস্টেলের মধ্যে। এটা সাকসেস হইল, ঐ বদরুল আলম বেঁচে নাই, মরে গেছে। বদরুল আলম ছোট্ট একটা ছবি, ঐ ছবিটা ওটার মধ্যে আছে, এই যে এইটা (বইয়ের মধ্যে)।

তা. ই. মাসুম: এইটা।
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: হ্যাঁ, ও একটা ছোট্ট ছবি নিয়া আাইসা বলে, এইভাবে করলে কেমন হয়? আমি বললাম যে, ছোট করে করবি। রাত্রের মধ্যে বেশি বড় কইরা করতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। পরে সবগুলা এ্যারেস্টেড হইয়া যাব। তো ছোট কইরাই কর। ও তাড়াতাড়ি এইটা বানাইয়া দিল। আমি আবার তখন, আমাদের ঐ গোলাম মাওলা ছিল আমাদের ভিপি।

তা. ই. মাসুম: ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের?
ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম: হ্যাঁ, ভিপি ছিল গোলাম মাওলা আর জিএস ছিল সরফুদ্দিন। এছাড়া সাঈদ হায়দারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই এরা সবাই মিলে একটা নকশা তৈরি করে, রাতারাতি রাজমিস্ত্রি এনে নিজেদের শ্রমে তৈরি করে ফেলমাম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।
আই ওয়াজ ওয়ান অব ফাউন্ডার অব দি মন্যুমেন্ট শহীদ মিনার। প্রথম শহীদ মিনারের প্ল্যানিংএ আমি ছিলাম।
আমরা গরীবের ছেলে, এই কাজ করতে যেয়ে জেলে গেলে কী হবে? একটা মহৎ কাজ করে যদি বাদও পড়ে যাই, তাহলেও সৎ ও মহৎ জিনিস করে যাই। এটা একটা পরীক্ষা। এটাই ভাল কাজ।

চলবে….