চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যার নেশা তার কাছে, রাষ্ট্রের কী বলার আছে!

কারও ফেসবুকের নেশা, কারও টাকার নেশা, কারও ঘুরে বেড়ানোর নেশা-এমনি নানা নেশায় আসক্ত মানুষ। কিন্তু এসব নেশা তাড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগ বা ভূমিকা নেই, রাষ্ট্রের যত মাথাব্যথা তা ওই মাদকের নেশার বিরুদ্ধে! কেন বাবা, কোনো মানুষ যদি সজ্ঞানে নেশা করে, আগুনে কিংবা সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়, তাতে কার কি? ‘নিজের চরকায় তেল দাও’ এই নীতি সমাজের সকল ক্ষেত্রে, সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কেন হবে না? এই কথাগুলো আসছে সরকারের আকস্মিক মাদকবিরোধী পুলিশি অভিযানের দেখে! মানুষ একটু নেশা করবে, একদল মানুষ নেশার উপকরণ উৎপাদন-বিপণন করবে, কিছু মানুষ ঝিমাবে, পরকালের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাবে, আর কিছু মানুষ অর্থ ও ক্ষমতার মালিক হবে-এতে রাষ্ট্রের আপত্তি থাকবে কেন? কারও ভালোলাগা ও পছন্দে বাগড়া দেয়া কি রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে? তা যদি না হয়, তাহলে রাষ্ট্র কেন ‘বন্দুকযুদ্ধ’কে ‘পেট্রন’ করছে? কি দরকার এই বেহুদা অভিযানের?

অবশ্য যারা ইতিবাচক দৃষ্টিতে সব কিছুকে দেখতে অভ্যস্ত তারা এই অভিযানের ভিন্ন মানে দাঁড় করাচ্ছেন! তাদের কথা হলো: সরকার আসলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করছে। এক বোদ্ধা বন্ধু সেদিন বলছিলেন, আমাদের মতো অধিক জনসংখ্যার দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পুরনো কার্যক্রমগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে, পরিকল্পিত পরিবার গঠনে এখন আর তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। ‘ছেলে হোক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট’, ‘দুটির বেশি সন্তান নয়, একটি হলে ভালো হয়’-এই স্লোগানগুলো এখন আর শোনা যায় না। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধি আমাদের মতো ছোট আয়তনের দেশের জন্য এখনও এক নম্বর সমস্যা।

বিজ্ঞাপন

তাহলে কি সরকার এই সমস্যা সমাধানের পথ থেকে সরে এসেছে? আমার বন্ধুর মতে, না, সরকার এখন কৌশল পরিবর্তন করেছে মাত্র। মুখে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে কথা না বললেও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাজটি সরকার ঠিকই অব্যাহত রেখেছে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাখব-পুলিশ যেভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করছে, তাতে করে তাদের জাতিসংঘের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পুরস্কার পাওয়া উচিত বলে বন্ধুর মত!

আমার বন্ধুর কথাগুলো একেবারে মিথ্যে নয়। একথা তো ঠিক যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক অবদান রেখে চলেছে। বেপরোয়া যান চালকদের পরেই সম্ভবত তাদের অবস্থান।

তবে সম্প্রতি মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে যেভাবে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ চলছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে, তাতে অনেকেই গভীর ‘হতাশা’ ব্যক্ত করেছেন। এই হতাশা ব্যক্ত করার অবশ্য সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। এই চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের যুগে আমি কী খাব, কী বলব, কী পরব, কী পান করব-সেটা নিয়ে রাষ্ট্র মাথা ঘামাবে কেন? নারীবাদীরা যদি বলতে পারেন, ‘শরীর যার, সিদ্ধান্ত তার’ তাহলে অন্যরা কেন বলতে পারবে না, দেহ যার, সে কী খাবে আর কী পান করবে, সিদ্ধান্ত তার! ব্যক্তির ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে রাষ্ট্র কেন মাথা ঘামাবে? নির্বাচনে যেমন ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’; খাওয়া-পরার ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত নয় কি? আমার খাওয়া আমি খাব, যা খুশি তাই খাব!

মদ-গাঁজা-ভাং-ফেনসিডিল-ইয়াবা, কুত্তা-বিড়াল-সাপ-ব্যাং-টিকটিকির লেজ, কেরোসিন তেল, সাপের বিষ যা খুশি তাই খাওয়ার স্বাধীনতাই যদি কারও না থাকে, তাহলে আর মুক্তিযুদ্ধ করে, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট পাঠিয়ে, লাভটা হলো কি? নেশা ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? আর মাদকের নেশা ছাড়া অন্য কোনো নেশা জমে নাকি? নেশার কথা বললেই চোখের সামনে নানা ধরনের নেশার সামগ্রীগুলো মনের পর্দায় ভেসে উঠে। শরীরটা অবশ আর মনটা উদাস হয়ে যায়!

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে পড়ে কল্কির কথা! কল্কিতে প্রথম দু’ তিনটে টানের পরই মাথাটা বেশ হাল্কা লাগে, জিভ শুকিয়ে আসে, বুক আর পেটের খোঁদলটা যেন ভরাট হয়ে যায়। দুনিয়ায় কত লোকেই তো ‘চাকরি হবে’, ‘উন্নয়ন হবে’ ইত্যাদি গ্যাস খেয়ে বুক ভরায়, তা হলে আর গাঁজার বদনাম কেন?
কল্কে ধরা প্র্যাকটিস করতে হয়! দশ আঙুলের ফাঁকে, কল্কের গোড়ায় জড়ানো ন্যাকড়ায় কী ভাবে ঠোঁটটা লাগাব? অসতর্ক হলেই ছ্যাঁকা! অনেকে সিগারেটে গাঁজা ভরে খায়, তারা স্নাতক স্তরে পৌঁছায়নি। সাধুদের আখড়ায় সিগারেটে গাঁজা খেলে গেরুয়াধারীরা বেশ অসন্তুষ্ট হন।

বিজ্ঞাপন

এক সময় গাঁজা ছিল আমাদের দেশের ‘গাঁও-গেরামে’ ঐতিহ্যে ভরপুর এক নেশার সামগ্রী। হোমিওপ্যাথী দোকানগুলোতে রীতিমতো ‘এখানে গাঁজা পাওয়া যায়’ এমন সাইনবোর্ড দিয়ে এই ধন্বন্তরি জিনিস বিক্রি করা হতো। সাহেবি আমলের শুরুতেও মুখ্যত ভবঘুরে, বৈরাগী এবং নিম্নবর্গের কৃষিজীবীরাই গাঁজার নেশা করতেন। পরে শহর তৈরি হল, হাফ-আখড়াই, জেলেপাড়ার সঙ ও পক্ষীর দল শুরু শুরু করল গাঁজার নেশা। পক্ষী হওয়া মোটেই সহজ ছিল না। যে গেঁজেল টানা ১০৮ ছিলিম গাঁজা খেতে পারতেন, তাঁকে একটা ইট দেওয়া হত। এ ভাবে পাওয়া ইট দিয়ে যিনি ঘর তুলতে পারতেন, তাঁরই ‘পক্ষী’ খেতাব জুটত। নগরসভ্যতার আগে থেকে চলে আসা গাঁজাপ্রেম শহর-নগরগুলোতেও অটুট থাকে। সিপাহি বিদ্রোহের মাত্র দুই বছর পর ‘হুক্কাপুরাণ’ বইয়ে লেখা, ‘তামাকু হইল দেখ পৃথিবীর সার/গাঁজা ভাঙ ধুতুরা তবে হৈল অবতার।’

শিল্পায়নে আমরা পিছিয়ে থাকলেও মনে রাখতে হবে, গঞ্জিকায়নে বাংলাই পথিকৃৎ! গাঁজা টানলে বেশি কথা বলতে ভালো লাগে না, নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। মনঃসংযোগ তখন একমুখী। মদের নেশাটা অন্য রকম। দু’তিন চুমুক দেওয়ার পর মনটা ছড়িয়ে যায়, কথা বলতে ইচ্ছা হয়। এ ব্যাপারে সমতল আর পাহাড়ের মদে তফাত নেই। সাঁওতাল পল্লীর মহুয়ার মদ আর শুয়োরের মাংস নিয়ে চমৎকার আড্ডা জমে! মহুয়া গ্লাসে বা খুরিতে পান করা যায়, কিন্তু হাঁড়িয়া অন্য রকম। কানা উঁচু কলাইয়ের থালায় চুমুক দিতে হয়। পার্বত্য জেলাগুলোতে আবার দোচুয়ানি। এক পেগ মারার পর শীত উধাও! মেমোরি আউট! শেরপুর, নেত্রকোনার গাড়ো অধ্যুষিত এলাকায় আবার চু। পান্তাভাতের জলের মতো পেট ভরে খাওয়া যায়। হাঁড়িয়ার মতো প্রথম স্বাদে টকটক, তার পর চমৎকার! মদের নেশায় পাহাড় আর জঙ্গল একই ভাবে হাসে!

আমার আরেক নেশাখোর বন্ধু বুক চিতিয়ে বলেছিল, নেশা-টেশার জন্য আমি বিন্দুমাত্র লজ্জিত নই। জীবনেও চুরি, ছিনতাই করিনি। শুধু আনন্দের জন্য নেশা করেছি। হিন্দুর ছেলে, ঐতিহ্য যাবে কোথায়? ঋগ্বেদে সোমরসের কম প্রশংসা আছে? ষষ্ঠ মণ্ডলের ৪৭ নম্বর সূক্ত: ‘এই সোম পীত হইয়া আমার বাক্যের স্ফূর্তি বিধান করিতেছে।’ পরে মহাকাব্যের যুগেও মাধ্বী, মৈরেয়, অরিষ্ট, আসব কত মদ! মেয়েরাও বঞ্চিত ছিলেন না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে অভিমন্যুর শবদেহ আঁকড়ে পড়ে আছেন স্ত্রী উত্তরা। সখেদে গান্ধারী বললেন, “মাধ্বীকের মত্ততায় মূর্ছিত হয়েও যে উত্তরা স্বামীকে আলিঙ্গন করতে লজ্জা পেত, হায়, সে আজ সকলের সামনে পতির অঙ্গ পরিমার্জনা করছে।” মেয়েরা মদ খেলে তাদের ‘সচ্চরিত্র’ বলে কি না গোছের প্রশ্ন মন্ত্রী-সান্ত্রিদের মাথায় আসত না। অবশ্য মন্ত্রীদের আর দোষ কী! সিনেমার প্রচারে নেশা নিয়ে বলতে গেলে আজকাল ছেলেমেয়েরা ও সব চলবে না, নেশা করা অনুচিত ইত্যাদি ফতোয়া দেয়। অন্যের কথা শুনতে চায় না, ভাবে তাদের মতামতই সব! সাধে নেশাতুররা বলে, আ নেশন গেটস দ্য লিডার ইট ডিজার্ভস! প্রাণে বড় আনন্দ হল সে দিন, যখন শুনলাম, খাস আমেরিকার দু’দুটো রাজ্যে ‘আনন্দের জন্যে মারিজুয়ানা’ সেবনের আইন তৈরি হচ্ছে। আবার, তার ক’দিন পরেই খবর, উরুগুয়েতে সীমিত পরিমাণে মারিজুয়ানা কেনা যাবে, এমনকি চাষ করাও যাবে। আমেরিকা, উত্তর দক্ষিণ মিলে আমাদের সনাতন ঐতিহ্য ধরে ফেলল, আর আমরাই কেবল ঘুমিয়ে থাকলাম!

সত্যি বলতে কী, মারিজুয়ানাই বলুন আর যা-ই বলুন, আমাদের গঞ্জিকা হলেন সাক্ষাৎ অমৃতের সন্তান! অমৃত নিয়ে সুর আর অসুরে কাড়াকাড়ি। অবশেষে দেবতাদের কাছে অমৃত এলো। শিব নিজের অঙ্গনিঃসৃত এক লতায় শোধন করে নিলেন অমৃত। অথর্ববেদ বলেছে, সেই পুণ্য উদ্ভিদই গাঁজাগাছ। মদ এবং গাঁজা দুই পক্ষকেই আমরা কুর্নিশ জানিয়েছি। উনিশ শতকে সাহেবরাই প্রথম ‘আমরা-ওরা’ তৈরি করল। বলা হল, বেশি গাঁজা খেলে লোকে পাগল হয়ে যায়, কিন্তু মদ উন্নততর নেশা।

শুধু কি আর মদ-গাঁজা-ভাং-‘বাবা’র নেশা? বলে রাখা ভালো যে, ক্ষমতার নেশা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর! সে প্রসঙ্গ তুললে নেশার আমেজটা কেটে যাবে। তার চেয়ে বরং প্রেমের নেশার কথা হোক। এটা অনেকটা হেরোইন কিংবা ‘বাবা’-র মতো। শুরুতে এসএমএস, মিষ্টি কথা, বন্ধুদের এড়িয়ে আলাদা ভাবে দেখা করা, রেস্তোরাঁয় কিংবা মলে, যা অনেক সময় ও শ্রমসাপেক্ষ। হেরোইন কিংবা ‘বাবা’ খাওয়ার প্রথম ধাপও সে রকম। সিগারেটের প্যাকেটের রাংতার ওপর সুগার রেখে তলায় আগুনটা এমন সন্তর্পণে ধরতে হয় যাতে রাংতা পুড়ে না যায়। কিন্তু গরম হয়ে যাবে, সুগার থেকে বাদামি ধোঁয়া উঠবে, বাঁকানো পাইপ দিয়ে টানতে হবে। তার পর শরীর শুকিয়ে যায়, তারাভরা রঙিন আকাশটা ভারী পাথরের মতো বুকে আছড়ে পড়তে চায়। কোনও অচেনা মেয়ের প্রেমে পড়লে ওই ভাবেই লাল-সবুজ আকাশ দেখতে হয়, বুকে পাথর চেপে বসে।
আর সাহিত্যের নেশা? যেন বাংলা মদ। সোডা বা ডাবের জল মিশিয়ে মেরে দাও। তার পর, ওই তো! মানিক-সুনীল-হুমায়ুন সবাই যেখানে একাকার। ঢাকা শহরে এখন গলিতে গলিতে বার। সবগুলোতে উপচে পড়া ভিড়! সবাই উদার-মহৎ এবং বক্তা। রাজা-উজির মারতে কারও কোনো সমস্যা হয় না!

আমাদের নেশার জগতে ‘সুখের ঘরে দুঃখের আগুন’ জ্বালাতে প্রথম আসে ভারতীয় ফেনসিডিল। এরপর প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার থেকে আসে ইয়াবা। যুব সমাজ আদর করে যার নাম দিয়েছে ‘বাবা’! এই ‘বাবা’ই শেষ পর্যন্ত আমাদের খেল! সরকার নেশাগ্রস্তের মতো ‘বাবা’ তথা মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করল! এক নেশাখোরের মন্তব্য: যে জিনিস আগে সস্তায় এবং সহজে মিলত, তা হঠাতই এখন চড়ামূল্যে এবং কষ্ট করে কিনতে হচ্ছে! এই যদি হয় পরিস্থিতি, তাহলে শুধু ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে’ কিছুটা ভূমিকা পালন ছাড়া লাভটা কি হচ্ছে?
মাদকের নেশা ছাড়াতে ‘যেভাবে’ ‘যাদের দিয়ে’ ‘যমালয়ে পাঠানো’-র ব্রত চলছে, অতঃপর তাদের মধ্যে যদি ‘খুনের নেশা’ চেপে যায়, তাহলে সেটা সারানো যাবে কীভাবে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail