চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মূল্য শুধু আওয়ামী লীগ নয়, পুরো জাতিকেই গুণতে হতে পারে

বিজ্ঞাপন

দেশে ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্ক এবারই যে প্রথম এমন নয়। নিকট অতীতের কথা স্মরণ করলে আমরা দেখতে পাই, ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বিমান বন্দরের সামনে লালনের ভাস্কর্য স্থাপনকে কেন্দ্র করেও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বিক্ষোভে নেমেছিল। তাদের দাবির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করায় সেই ভাস্কর্য আর থাকেনি। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের সামনে ন্যায়বিচারের প্রতীক যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে তার বিরুদ্ধেও হেফাজতে ইসলামসহ কিছু উগ্র ধর্মীয় সংগঠনের অবস্থানের কারণে সরকার আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মঙ্গলবার গণভবনে ভারত সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের পর হেফাজতে ইসলামের মূল নেতৃত্বসহ অন্যদের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন: ‘আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। বলা হচ্ছে এটা নাকি গ্রিক মূর্তি। আমাদের এখানে গ্রিক মূর্তি আসবে কেন? আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা এখানে থাকা উচিৎ না। গ্রিকদের পোশাক ছিল এক রকম। এখানে আবার দেখি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। এটাও হাস্যকর হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হয়, তিনি হয়তো শুধু ভাস্কর্যটির নান্দনিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এটাও কেউ কেউ মনে করতে পারেন, শুধু নান্দনিকতা নিয়ে আপত্তি থাকার কারণেই প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু, বাস্তবতা হচ্ছে– যাদের সামনে তিনি এমন কথা বলেছেন তারা নান্দনিকতার প্রশ্নে ওই ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তি জানাননি, যেকোন ভাস্কর্যকেই তারা মূর্তি মনে করেন এবং ঢাকা বা দেশের কোথাও এমন মূর্তি থাকলে তারা শুধু প্রতিবাদই জানান না, সরকার ফেলে দেওয়ার হুমকিও দেন। আর এটাতো সেই হেফাজত যারা ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার লক্ষ্যে ওই বছরের ৫ মে ঢাকা শহরে চরম অরাজকতা সৃষ্টি করে ৫০ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তখন তারা সফল হতে পারেননি। পরে অবশ্য তারা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চুপ ছিলেন। সম্প্রতি আবার তারা সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য ইস্যুতে নড়াচড়া শুরু করেন। তবে, এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে শুধু নতুন ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে বলেই তারা আবার আন্দোলনমুখি হয়েছেন। যেকোন ভাস্কর্যকেই হেফাজত মূর্তি মনে করে তারা সবসময়ই ভাস্কর্যবিরোধী এবং ২০১৩ সালেই তারা যে ১৩ দফা দাবি জানিয়েছিলেন তার সাত নম্বর দাবি ছিল: মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা। তখনও সুপ্রিম কোর্টের সামনে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়নি তাই ওই ১৩ দফা দাবিতে এ ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু, যেখানেই হোক তারা যে ভাস্কর্যবিরোধী সেটা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরদিনই ভাস্কর্যের নামে থাকা দেশের সব মূর্তি অপসারণের দাবি জানিয়ে স্পষ্ট করেছেন। সে লক্ষ্যে তারা এগিয়ে যাবার কথাও জানিয়েছেন। সরকার হয়তো নিকট ভবিষ্যতে নতুন কোন আন্দোলন সম্ভাবনা অংকুরেই নষ্ট করতে কিংবা আগামী বছরের নির্বাচনকে সামনে রেখে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে আপোষের মনোভাব দেখাচ্ছে। কিন্তু, দেশের সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এর পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। হেফাজত এখন যদি ১৩ দফার একটি দফা (ভাস্কর্য অপসারণ) সরকারকে দিয়ে বাস্তবায়ন করিয়ে নিতে পারে তাহলে ভবিষ্যতে বাকি যে ১২ দফা সেজন্যও সরকারকে আরো বেশি চাপে ফেলতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তখন যদি সরাসরি এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন আরেকটি শাপলা চত্বর এবং আরেকটি ৫ মে’র মতো ঘটনার দিকে এগিয়ে যেতে পারে হেফাজত, কারণ তাদের মূল লক্ষ একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র। সরকারকে তাই এখনই বুঝতে হবে যে তারা মৌলবাদী উগ্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আপোষে যাবে কিনা। না হলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হতে পারে চরমভাবে। সেই মূল্য যে শুধু আওয়ামী লীগকেই দিতে হবে এমন নয়, পুরো জাতিকেই চরম মূল্য গুণতে হতে পারে।