চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাহির ও তাপুর কষ্টের কথা আমরা ভুলে যাচ্ছি

প্রিয় মাকে হারিয়ে এসপি বাবুলের দুই নিস্পাপ শিশু মাহির এবং তাপু কেমন আছে তা আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না। যে মা তাদের সারাদিন বুকে আগলে রাখতো, আদর করতো, রাজ্যের আবদার মেটাতো সেই মা আর দুনিয়ায় নেই।

বিজ্ঞাপন

৫ জুন মা মাহমুদা খানম মিতুকে দুর্বৃত্তরা নৃশংসভাবে খুন করে। মা খুন হয় ছেলে মাহিরের সামনেই, চট্টলা শহরের জিইসি মোড়ে। ওইদিন মায়ের হাত ধরে মাহির সকালে স্কুলে যাচ্ছিল। তাপু বাসাতেই ছিল। মাকে হারিয়ে এখনও মাহির স্বাভাবিক হতে পারেনি। মাহিরের চোখ থেকে এখনও জলের ধারা বন্ধ হয়নি। খুনীর নিষ্ঠুরতা মাহিরের ছোট্ট মনটাকে ছিঁড়েফুড়ে দিয়েছে।

মাহির এবং তাপু মাকে হারিয়ে এখন শুধু প্রলাপ করে। ভয় আর আতঙ্কে রাতে তাদের ঘুম আসে না। এই ছোট্ট জীবনে এত ভয় ওরা কোনাদিন পায়নি। দুজনেই তাই বাবার কোলের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে। বাবাকে ছাড়া ওরা কোথাও যেতে চায় না। কিন্তু সেই বাবাকেও নিয়ে চলছে ভীষণরকম টানাহ্যাঁচড়া। 

মাহির আর তাপুকে নিয়ে সমাজ, রাষ্ট্রের কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তাই চোখে পড়ছে না। দুটি শিশুর ভবিষ্যত, নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কথা শুনছি না। মাহির এবং তাপুর কষ্টের কথা, দুঃখের কথা যেনো আমরা ভুলেই যাচ্ছি।

মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রায় একমাসের কাছাকাছি হলেও এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ এবং খুনের নেপথ্যে কে বা কারা তা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি। অনেকগুলো অনুমানের ভিত্তিতেই কথা চালাচালি হচ্ছে। কারো কথাই পরিস্কার নয়। একেক সময় একেক ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে বুঝা যাচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মিতুর স্বামী এসপি বাবুল এক মহাজটিল অবস্থার মধ্যে পতিত।

জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃসময়ের মুখোমুখি তিনি। কিছুই করারও যেনো তার নেই । কারণ খোদ পুলিশ ডিপার্টমেন্টেরই অদৃশ্য নজরদারি আর শাসনের মাঝে আছেন। এই নজরদারি আর শাসন ভাঙার সাধ্য তার নেই। জনগণও বুঝতে পারছে পুলিশী শক্তি অতিক্রম করা কোনো পুলিশের পক্ষেও সম্ভব নয়।

পুলিশি ভাষ্যে এবং গণমাধ্যমে যেসব কথাবার্তা প্রচার হচ্ছে তাতে করে এই খুন ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। আবার রহস্য কোনোমতেই উন্মোচিত হওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে প্রায় একমাস হয়ে গেলেও যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের স্বীকারোক্তি বা অন্যান্য তথ্যাদিতে নিরঙ্কুশ প্রমাণিত হচ্ছে না যে, এই খুনের মূল পরিকল্পনাকারী কে আর কেনইবা মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করা হলো।

বিজ্ঞাপন

মুসা-ইসারাও গায়েব হয়ে গেছে। মিতু খুনের কয়েকদিন পর পরকীয়া প্রেমের যে গল্প বলা হচ্ছিল সেটা জনগণ গ্রহণ করেনি। কেননা আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটি কখনই প্রমাণ করে না যে, পরকীয়া প্রেমের কারণে কোনো স্বামী বা স্ত্রী প্রতিহিংসা মেটাতে এতোটা নিষ্ঠুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।এ ছাড়া ফুটফুটে দুটি সন্তানের দিকে চেয়ে কোনো মা বাবার পক্ষেই এমন কাজ করা সম্ভব বলে মনে হয় না।

তাহলে কেন এই খুন- এটি এখন অনেক বড় প্রশ্ন। আর শুধুমাত্র পরকীয়ার কারণে (যদি হয়েও থাকে, অবশ্য না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ) একজন চৌকষ এসপি ভাড়াটে খুনী দিয়ে তার স্ত্রীকে হত্যা করবে এটি কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। অনেকেরই প্রশ্ন পিতার লেলিয়ে দেওয়া খুনী তারই অবুঝ সন্তানের সামনে তার মাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করবে- এটি কোন উন্মাদের পক্ষেও সম্ভব?

এসপি বাবুলের শ্বশুরও বলেছেন, বাবুল এবং তার মেয়ে মিতু সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়। পরকীয়া সংক্রান্ত ঘটনা ঘটলে পরিবারের মানুষ হিসেবে তিনি সেটা কোনো না কোনোভাবে জানতেন। সময় হলে তিনি মুখ খুলবেন বলে পত্রিকা মারফত বলেছেন।

তবে একটি বিষয় আমরা খেয়াল করছি। মিতুর খুন নিয়ে পুলিশ প্রশাসন যতোটা মাতামাতি করছে ঠিক ততোটাই যেনো বিমাতাসূলভ আচারণ করা হচ্ছে ছোট্ট দুটি শিশুর প্রতি। প্রিয় মা হারানো এই দুটি শিশুর খোদ পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতোটা ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল সেরকম কোনো খবর গণমাধ্যমে চোখে পড়েনি।

কোনো মন্ত্রী, পুলিশের কোনো বড় কর্মকর্তা এ দুটি শিশুকে বুকে তুলে নিয়েছেন বা তাদের উপর যাতে মানসিক চাপ না পড়ে এর জন্যে কোনো দিক নির্দেশনা দিয়েছেন তা এখনও চোখে পড়েনি। শিশু ও নারী কল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীকেও দেখলাম নিয়ে এ দুটি শিশুকে নিয়ে কোনো ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করতে। মায়ের নিষ্ঠুর মৃত্যুর পর শিশু দুটির প্রতি সত্যিই নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণই করা হচ্ছে। গণমাধ্যমে যা আসছে শেষ পর্যন্ত যদি সেটাই এসপি বাবুলের জীবনে ঘটে যায়-তাহলে এই শিশু দুটির ভবিষ্যত কী হবে তা আল্লাহ-ই জানেন।

মা হীন পৃথিবী কোনো শিশুরই ভালো লাগার কথা নয়। মায়ের বুকের ওম শিশুদের সবচেয়ে প্রিয়। নিশ্চিত করেই বলতে পারি দুই শিশু মাহির এবং তাপু মাকে হারিয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে কেবলই চোখের জল ফেলছে।

পুলিশ পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণেতো এই শিশু দুটির প্রতি বড় বেশি সদয় হওয়ার কথা ছিল পুলিশ প্রশাসনের। আমরা সবসময় শিশু অধিকারের কথা বলি, শিশুর নিরাপত্তার কথা বলি। কিন্তু তার ছিঁটেফোটাও চোখে পড়লো না এই দুটি শিশুর বেলায়। এই শিশু দুটির প্রতি যেনো কারো কোনো দায়ও নেই, দয়াও নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)