চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’

নানা আয়োজনে এগিয়ে চলছে বাংলা বর্ষবরণের প্রস্তুতি

মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু থেকেই মূল আবেদন মানবতার কল্যাণ আর মঙ্গল। সেই আবেদনকে সামনে রেখে এবারের বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য করা হয়েছে বাউল সম্রাট লালন শাহ’র বিখ্যাত সেই বাণী ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।

বিজ্ঞাপন

বর্ষবরণ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান জানালেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ২০তম ব্যাচ এ বছরের আয়োজক। মানুষকে যেন ভালোবাসে, মানুষ মানুষকে বোঝে, মানুষ মিলেমিশে থাকবে সেই প্রত্যাশায় মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বরণ করে নেওয়া হবে ১৪২৫ বাংলা সন।

এরই বর্ষবরণ ঘিরে চারুকলায় সাজ সাজ রব পড়েছে প্রায় এক মাস আগে। মে মাসের ১৫ তারিখ থেকে চলছে প্রস্তুতি।

সোমবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পাচার্য জয়নুল গ্যালারিতে গিয়ে দেখা যায় বিশাল গ্যালারির মেঝেতে ছড়ানো ছিটানো নানা রঙের মুখোশ। কাগজ কেটে তার ওপর রঙ করা মুখোশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লক্ষ্মীপেঁচা, বাঘসহ নানা প্রাণীর অবয়ব। মেঝেতে জায়গা না হওয়ায় কিছু মুখোশ দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখা। বিক্রির জন্য এসব মুখোশ বানিয়েছে অনুষদের শিক্ষার্থীরা। মুখোশ বিক্রি করে যে আয় হবে, তা দিয়েই আয়োজন করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।

শুধু মুখোশ নয়, চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে এখানে। বিক্রি হচ্ছে কাগজের ফুল, পাখি, ছবি আঁকা মাটির সরা। পহেলা বৈশাখের বাকি চারদিন। তাই বলা চলে ঘুম নেই শিল্পকলার শিক্ষার্থী আর শিক্ষকদের। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের রঙের কাজ।

চারুকলায় ঢুকতেই চোখের দৃষ্টি কেড়ে নেয় অস্থায়ী দোকান। হাসিমুখে ক্রেতা দর্শনার্থীদের সরা, পাখি, মাটির ব্যাংক দেখাচ্ছেন চারুকলার ২০তম ব্যাচের ছাত্রী তন্বী।

বিজ্ঞাপন

তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে জানালেন, ‘ছবি আঁকার ওপর নির্ভর করে মাটির সরার দাম নির্ধারণ হয়। প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। ফুল ও পাখি ১০০ থেকে আড়াইশ টাকা। মুখোশের দাম ৮০০ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত। ছাত্রদের আঁকা ছবি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায়। শিক্ষকদের আঁকা ছবি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায়।’

মেলা যত ঘনিয়ে আসছে বিক্রি ততই বাড়ছে বলে জানিয়ে তন্বী বললেন, আমাদের স্টোরে কোনো প্রডাক্ট নেই। সব বিক্রি হয়ে গেছে। ডিসপ্লেতে যা দেখছেন এগুলোই আছে।

রাজারবাগ থেকে আসা ইমরান-বিনা দম্পতি এক হাজার টাকা দিয়ে একটি সরা কিনে। সঙ্গে দুটি মুখোশ। তাদের অভিযোগ, দাম বেশি রাখা হচ্ছে।

দাম বেশি রাখার বিষয়ে তন্বী বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার কোনো স্পন্সর নেই। আমরা চারুকলার শিক্ষার্থীরা নিজেদের হাতে আঁকা ছবি, পাখি, ফুল, সরা, মুখোশ বিক্রি করে প্রতি বছর এই আয়োজন করে থাকি। হাতে আঁকা বলে সময় ও খরচের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।’

‘এটাকে মূল্য হিসেবে না দেখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে। একটি ছবি বা অন্যকিছু কেনার মানে হলো তিনি আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই শোভাযাত্রায় কন্ট্রিবিউট করছেন।’

আল-আমিন হোসেন নামে সুপ্রিম কোর্টের এক তরুণ আইনজীবীকে দেখা যায় তিনটি মাটির সরা কিনতে।

তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বললেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ইউনেস্কো এটাকে বিশ্ব ঐহিত্যের অংশ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই শোভাযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে অপশক্তি। হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। সংস্কৃতি সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত শোভাযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়া। আর তাই তিনটে সরা কিনেছি। যা আমার ঘরের শোভা বৃদ্ধি করবে, আবার শোভাযাত্রাকে উৎসাহিত করবে।’

১৯৮৯ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলা সনের প্রথম দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বর্ষবরণ করতে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।