চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাদকের বিরুদ্ধে মামলায়-মাঠে কতটুকু পেরে উঠছে নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তর?

মাদকের বিস্তৃতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন-৬

দেশে মাদক মহামারীর বিরুদ্ধে রীতিমত ঘোষণা দিয়ে ‘যুদ্ধ’ শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অথচ কাগজে-কলমে মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে। কিন্তু অধিদপ্তরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দায়ের করা মামলাগুলোর স্থবিরতা।

বিজ্ঞাপন

চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে মাদকের বিরুদ্ধে আইনী এবং মাঠে লড়াইয়ের সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন ডিএনসি’র মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ।

তিনি জানান দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে মোট ১১ হাজার ৬১২টি।

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মাদক নিয়ন্ত্রণে এসব তৎপরতা নেহায়েত কম নয় মন্তব্য করে ডিএনসি’র মহাপরিচালক বলেন: ২০১৭ সালে ১১ হাজারের উপরে হওয়া এসব মামলায় আমরা সাড়ে ১২ হাজারের বেশি আসামীকে গ্রেফতার করেছি।  ডিএনসি সহ সব আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার গ্রেফতার করা আসামীর সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি।

চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ৩ হাজার ২৮৯টি মামলা হয়েছে জানিয়ে প্রতিবন্ধকতাগুলো স্বীকার করে ডিএনসি মহাপরিচালক বলেন: বিচার ব্যবস্থায় ধীর গতির যে অভিযোগ আছে এটি নিয়ে আমি কোন মন্তব্য করবো না। তবে এটি বলবো যে আমাদের বেশ কিছু মামলা ঝুঁলে আছে। জনবলের অভাবে আমরা হয়তো সময় মতো সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করতে পারছি না।

ডিএনসি’র মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি ২৮ বছরের পুরোনো। এই আইনে এখন সর্বগ্রাসী ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়।

বিজ্ঞাপন

তাই ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮’ আসছে জানিয়ে তিনি বলেন: প্রচলিত আইনের তফসিলে বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিলো না।  যাদের মাদকের গডফাদার বা মাস্টার-মাইন্ড বলা হয় তাদেরকে আইনের আওতার আনা যাচ্ছিলো না।

তাই আইন সংশোধন করে, যারা মাদকের ব্যবসা করে এবং মাদক তৈরি করে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য আইনানুগ বিধান নিয়ে নতুন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন আসছে।  নতুন এই আইনে ইয়াবাকে প্রথম শ্রেণীর মাদক বা ‘ক’‘ শ্রেণীর মাদক হিসেবে তফসিলভুক্ত করা হচ্ছে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছর কারাদণ্ড বদলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে।  এবছরের মধ্যেই নতুন আইনটি পাস হবে বলে আমরা আশা করি।

এই পরিস্থিতিতেই আগ্রাসী মাদকের বিরুদ্ধে অনেকটা ঢাল-তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দারের মতো দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।

সীমিত জনবলসহ ডিএনসি’র কয়েকটি সীমাবদ্ধতা চ্যানেল আই অনলাইনের সামনে তুলে ধরে অধিদপ্তরের অপারেশন্স এবং গোয়েন্দা শাখার পরিচালক সৈয়দ তৌফিক আহমেদ বলেন: সংঘবদ্ধ মাদকচক্রের বিরুদ্ধে ডিএনসি-কে বিনা অস্ত্রে অভিযানে যেতে হয়।  আমাদের রিভলবার-পিস্তলের মতো ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবহারেরও বিধি নেই। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে অভিযান তারা বেশিরভাগ সময়ই সশস্ত্র থাকে। গত ২ বছরে আমরা মাদক উদ্ধারের সময় ১৪ টি অস্ত্র উদ্ধার করেছি। 

এই অবস্থায় অভিযান চালাতে পুলিশের সহায়তা চাইলে তাদের সাড়া পেতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। পুরো বাংলাদেশে ডিএনসি’র পরিবহনের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।  মোটরসাইকেল সহ সব মিলিয়ে আমাদের যানবাহন সংখ্যা মাত্র ৫১ টি। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মাদক মোকাবেলার জন্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সদস্যদেরকে অস্ত্র দেয়া উচিৎ।

তবে এসব প্রতিবন্ধকতা কাটাতে ডিএনসি’র আহ্বানে সরকার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন: আমাদের জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কোরিয়ার অর্থায়নে আমাদের গাড়ির দেয়া হচ্ছে, ২ টি ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হচ্ছে এবং আমাদের হাতে অস্ত্র দেয়াটাও এখন সময়ের দাবি।

উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে এক্সাইজ অ্যান্ড ট্যাক্সেশন ডিপার্টমেন্ট পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নারকোটিকস অ্যান্ড লিকার পরিদপ্তর গঠন করা হয়।  মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ১৯৮৯ সালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি করে করা হয়।  ১৯৯০ সালের ২ জানুয়ারি ওই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে অধিদপ্তর গঠন করা হয়।বর্তমানে ডিএনসিতে মঞ্জুরিকৃত পদসংখ্যা ১ হাজার ৭০৬। এই জনবলের বড় অংশ মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে কর্মরত। জেলাগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য জনবল মঞ্জুরি আছে মাত্র ছয়জন। অধিকাংশ জেলার দায়িত্বে একজন সহকারী পরিচালক তবে কয়েকটি জেলায় উপপরিচালক দায়িত্ব পালন করছেন।

সর্বশেষ গত বছর অক্টোবর মাসে নতুন ১ হাজার ১০৭টি পদ সৃষ্টি, যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও লজিস্টিক বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়।