চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাতির দেশে কয়েক দিন

সাফারি ওয়ার্ল্ড থেকে ফিরতে ফিরতে পরের দিনের বেড়ানোর পরিকল্পনা করা হলো। ও হ্যা বলাই হয়নি যে, সুকুম্ভিত এলাকা থেকে গাড়িতে সাফারি ওয়ার্ল্ড যেতে প্রায় এক ঘন্টা সময় লাগে। অবশ্যই সেটা হাইওয়ে ব্যবহার করে। যাবার সময় আমরা খেয়াল করলাম হাইওয়েগুলোতে যেতে গাড়িগুলোকে টোল দিতে হয়। যতদূর মনে পরে যাবার পথে জেনি তিনবার টোল দিয়েছে। জেনির কাছ থেকেই জানলাম, সদ্য নির্মিত একটি হাইওয়েতে যেতে ৫শ বাথ দিতে হয়। এই টোলের কারণে স্থানীয় অনেক বাসিন্দা নিজস্ব গাড়ি থাকা সত্বেও ওই হাইওয়ে ব্যবহার করতে পারেন না। এ নিয়ে জেনিকে কিছুটা বিরক্তও মনে হলো। আমাদের ঢাকা শহরের কথাও ভাবলাম। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে টোল চালু করায় আমরা ক্ষুব্ধ ছিলাম।কিন্তু ব্যাংককের বাসিন্দারাই এখন ব্যাংককে আগের তুলনায় ব্যয়বহুল জীবন যাপন করছেন। বিনামূল্যে সেখানে কিছুই মেলে না।

বিজ্ঞাপন

যাহোক ফেরার পথে ব্যাংককের যানজটের দেখাও পেলাম। সাফারি ওয়ার্ল্ড থেকে ফেরার জন্য জেনির তাড়া দেয়ার কারণ বুঝলাম যানজটে পড়ার পর। অফিস, স্কুল, কলেজ ছুটির সময় ব্যাংককে গাড়ির লম্বা লাইন লেগে যায় এবং সেটা স্থায়ী হয় সন্ধ্যা ৭টা/৮টা পর্যন্ত।যানজটে পড়লেও গাড়িগুলো প্যাঁ পু করে অতিরিক্ত হর্ন বাজায় না। এক লেন থেকে আরেক লেনে যেতে কাউকে গুঁতা দেয় না। সিগন্যাল ছাড়ার জন্য অস্থির না হয়ে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে। আর হ্যা ব্যাংককে রিকশার মতো বাহন নাই। রিকশার চেয়ে একটু বেশি গতিসম্পন্ন টুকটুক আছে। আমরা যেটাকে ইজি বাইক হিসেবে দেখি। কিছু হিউম্যান হলারও আছে। কম গতির এসব গাড়ির জন্য আলাদা লেন আছে। আর আছে ট্যাক্সি, বাস, প্রাইভেট কার।ট্যুরিস্টরা কম খরচের জন্য অল্প দূরত্বের পথ যেতে টুকটুক ব্যবহার করেন।

সময় বাঁচাতে হোটেলের কাছে একটা সিগন্যালে আমরা নেমে গেলাম। জেনির সময়ও বাঁচলো তাতে।রাস্তার পাশের মানি এক্সচেঞ্জে ডলার ভাঙ্গিয়ে আমরা ‘সেভেন ইলেভেন’ থেকে ডিনারের জন্য বেকারি আইটেম কিনলাম। এই সেভেন ইলেভেন নামের মুদি দোকানগুলো ব্যাংককের প্রায় প্রতিটি গলিতে আছে।আরো দু একটা ব্র্যান্ডের মুদি দোকানও চোখে পড়েছে।

যাত্রীর অপেক্ষা

ফ্লোটিং মার্কেট: সফরের তৃতীয় দিন আমাদের প্রথম গন্তব্য দামনোয়েন এলাকার ফ্লোটিং মার্কেট।সুকুম্ভিত থেকে দেড় ঘন্টার জার্নি।হাইওয়ে দিয়ে আমরা ছুটে চলেছি থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ফ্লোটিং মার্কেটের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে ভাবছি ফ্লোটিং মার্কেট মানে এটা অবশ্যই নদী বা সমুদ্রের পানির উপর হবে।ভাবনা একবারে ভুল নয়। পরে জেনেছি এই মার্কেট ম্যা ক্লোং নদী থেকে আসা খালের পানির উপর ভাসমান মার্কেট।

ব্যাংকক থেকে বের হওয়ার পর লক্ষ্য করলাম। আমরা যেন কোন উপশহরে ঢুকে পড়েছি। ছিমছাম কোলাহলহীন জনপদ। রাস্তার দুপাশের কিছু দূরত্ব পর পর টং ঘর চোখে পড়ে যেখানে চা, কফি, কোমল পানীয় পাওয়া যায়। সকাল/দুপুরে সংক্ষিপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও আছে এসব টং ঘরে। এক কথায় পর্যটকদের আরাম এবং নিরাপদ চলাচলের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা আছে।

পথে যেতে যেতে চোখে পড়লো মাইলের পর মাইল লবণের ক্ষেত। প্রতিটি লবণ বিলের সামনে ছোট/বড় প্যাকেট-বস্তায় লবণ সাজানো আছে।এখান থেকে সমুদ্র কাছেই আছে।তবে এসব এলাকায় লবণ এবং নারিকেল বাগান ছাড়া অন্য চাষবাস তেমন হয় না। তাই জমির দাম অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশ কম।

কেবল ভাসমান বাজার না, এখানে পর্যটকদের জন্য দেখার অনেক কিছু আছে। পুরো একটা দিন এখানে কাটিয়ে দেয়া সম্ভব। আছে টাইগার ক্যাম্প, কোকোনাট সুগার ফার্ম। আছে শ্বেত হস্তী দর্শনের ব্যবস্থা। নৌকায় ঘোরাঘুরি, প্রাচীন জনপদ (গ্রাম) দর্শন এবং হাতির পিঠে চড়ে ভ্রমণের সুযোগও আছে। তবে ধরে নিতে হবে প্রতিটি দর্শনই মিলবে দর্শনীর বিনিময়ে।
বেলা এগারটা নাগাদ আমরা ভাসমান বাজারের পাশে এসে পৌঁছালাম। গাইডের সহায়তায় একটি নৌকাযোগে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা করলাম। খালের পানি যথেষ্ট ঘোলা। তবে দুর্গন্ধ নেই। এই বাজার এতো নামডাকওয়ালা যে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রচুর। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ব্যাংককবাসীও এখানে বেড়াতে আসেন। দর্শনার্থী বেশি হওয়ায় খালে নৌকার জট লেগে যায়। তবে সংঘর্ষ হয় না। কারণ নৌকার মাঝিরা নিজেরা যেমন চলতে চান তেমনি অন্যদেরও চলার সুযোগ করে দেন।

খালের দুপাশে সারি সারি দোকান। পসরা নিয়ে বসে আছেন স্থানীয় দোকানীরা। বেশিরভাগ দোকানীই নানা বয়সের নারী। দোকানে নৌকা ভেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ঐতিহ্যমতো নমস্কার করে ক্রেতাকে আমন্ত্রণ জানান। দোকানগুলোতে ট্রাডিশনাল শোপিস, কাপড় এবং তৈজসপত্র বেশি চোখে পড়ে। তবে এখানে জিনিস কিনতে দামের বিষয়ে সাবধান। দরদাম করে তবে কিনতে হবে। মুলামুলির জন্য ঢাকার নিউ মার্কেট, চন্দ্রিমা মার্কেট বা বঙ্গবাজারের কথা মাথায় রাখা যেতে পারে। স্থায়ী দোকানের পাশাপাশি রয়েছে নৌকাযোগে দোকান। নৌকাগুলোতে সাধারণত খাবার দাবারই বেশি। নৌকাগুলো তাজা ফল, চিকেন বারবিকিউ এবং সিফুড ফেরি করে বিক্রি করে। থাইল্যান্ডে মানুষ খেতেখেতে ঘুরতে এবং ঘুরতে ফিরতে খেতে পছন্দ করেন। রাস্তায় যাতায়াতের পথে চোখ রাখলেই দেখা যায় বেশিরভাগ মানুষের হাতে ছোট ছোট পলিথিনের ব্যাগ চোখে পড়ে। সেইসব পলিথিনে অল্পস্বল্প খাবার। কারো হাতে জুস বা কোল্ড কফি। থাইল্যান্ডের আবহাওয়া বেশিরভাগ সময় উষ্ণ হওয়ায় থাই নাগরিকরা ঠাণ্ডা খেতে পছন্দ করেন।

ভাসমান বাজার

বিজ্ঞাপন

ভাসমান বাজার ঘুরতে প্রায় আধাঘন্টা সময় লাগলো। টুকিটাকি কেনাকাটা আর খাওয়া-দাওয়া শেষে ফেরার পালা। রোদ তখন চরম চড়া। খালি চোখে তাকানো দায়। ওখানে এখন বর্ষার শুরু হলেও আমরা বৃষ্টি পাইনি। যেটুকু পেয়েছি তাও রাতে। আমাদের বৃষ্টিভাগ্য ভালো বলতে হয়।
ভাসমান বাজার থেকে ফিরতি যাত্রার ১০ মিনিট পর আমরা আবার থামলাম। এবার হাতিযোগে বেড়ানোর পালা। তবে তার ব্যয়ও কম না। প্রতিজন ৬শ বাথ। ফিদেলকে একা ছাড়া যাবে না। তাই সঙ্গী হলাম আমি। হাতির খাবার ছোট এক ঝুড়ি কলার দামও একশ বাথ। আমরা খাবার কিনলাম না। কারণ ভাসমান বাজার থেকে আমরা একছড়ি কলা কিনেছিলাম।হস্তীর পিঠে তো চাপলাম কিন্তু অস্বস্তি তো যায় না! প্রথম কারণ আমি নিজের ভার হাতির উপর চাপিয়েছি। দ্বিতীয় কারণ হাতি যদি হঠাৎ ক্ষেপে যায়! মা-পুতের কী হবে তখন! ভয়কে সঙ্গী করে চলছি আর অপেক্ষায় আছি কখন এই যাত্রা শেষ হবে?

হাতির পিঠে ভ্রমণ

হাতিযোগে ভ্রমণ শেষ। আবারও পথচলা শুরু। এই ফাঁকে বলে নিই সারাদিন পথে পথে কাটালেও প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেবার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নাই। পথের বাঁকে বাঁকেই তার সুব্যবস্থা আছে।

স্বর্ণ মন্দির

স্বর্ণ মন্দির: এবার আমাদের গন্তব্য ব্যাংককের স্বর্ণ মন্দির। দুপুরের সময়টা আমাদের রাস্তায় কাটলো। টুকটাক খাওয়াদাওয়া করতে থাকায় ক্ষুধা ছিলো না কারোই। তাই লাঞ্চ বিরতি না নিয়ে স্বর্ণ মন্দিরের পথে রওনা করলাম।সঙ্গে রয়েছে জ্যামের ভয়। জ্যাম শুরু হওয়ার আগেই আমরা মন্দির দেখা শেষ করতে চাই।

প্রায় ৫ হাজার কেজির বেশি স্বর্ণ দিয়ে তৈরি এই মন্দিরের বুদ্ধমূর্তি। যা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় স্বর্ণমূর্তি। বেশ বড় পরিসরে স্থাপিত মন্দিরের সঙ্গে রয়েছে সরকারি স্কুল এবং কলেজ। মন্দির দর্শনে প্রতিজনের দর্শনী লাগবে ৪০ বাথ। মন্দিরের প্রবেশ পথে নোটিশ- জুতা খুলে প্রবেশ করতে হবে। পোশাক হতে হবে যথাযথ। অর্থাৎ প্যান্ট বা স্কার্টের লেনথ হাঁটুর নীচ পর্যন্ত হতে হবে। যারা স্বল্পবসনা হয়ে আসছেন তাদের জন্য স্থানীয় থামি ভাড়া দেয়া হয়। ভাড়া কত সেটা অবশ্য খোঁজ নেয়া হয়নি! কঠিন চিবরদানের ব্যবস্থাও আছে এখানে। ভক্তরা এখান থেকে কটিন চিবর (ভিক্ষুদের পোশাক)এবং ফুল কিনে দান করছেন। সঙ্গে প্রার্থণা তো চলছেই। বুদ্ধের সামনে যাওয়ার সময় আরো জানলাম টুপি পড়ে সেখানে প্রবেশ করা যাবে না।
থাই রাজা কখনো কখনো এখানে প্রার্থনার জন্য আসেন। সেসময় দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ থাকে।
ইন্দ্রা ও স্কাই টাওয়ার: মন্দির দর্শন শেষে আমাদের লক্ষ্য ইন্দ্রা এলাকা। শপিং এর জন্য বিখ্যাত এই এলাকা। ভারতীয়দের প্রাধান্য এখানে। অনেকে ফ্লাস্কে করে চা ফেরি করে বেড়ান। হিন্দী ভাষায় চা অফার করেন। ইংরেজিতে কিছু জিজ্ঞেস করলে পাল্টা জিজ্ঞেস করে, আপনারা হিন্দী বুঝেন না! কম দামী শপিং এর জায়গা হলেও বেশিরভাগ দোকানে ফিক্সড প্রাইস। এমনকি ফুটপাথের দোকানেও।

আমরা যখন ইন্দ্রায় ঘোরাঘুরি করছি তখন সন্ধ্যা। শপিংয়ে একটু তাড়াও সেকারণেই। কারণ সব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। শপিংয়ের বাজেটও খুব কম ছিলো অবশ্য। কারণ যেসব পণ্য কিনছি বা পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর বেশিরভাগ ঢাকাতেও পাওয়া যায়। নিজেদের টাকা অন্য দেশে কেনাকাটা করে খরচ করায় আমার আগ্রহ কম। কেবল চকলেট কিনতে কোন দ্বিধা নাই।

স্কাই টাওয়ার

শপিং শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমরা ঢুকলাম স্কাই টাওয়ারে। এটি ব্যাংককের সবচেয়ে উঁচু ভবন। ৮৮ তলা এ ভবনে ব্যাংকক শহরের প্যানারমিক ভিউ দেখার সুব্যবস্থা আছে। সেজন্য খরচ করতে হবে জনপ্রতি ৪শ বাথ। সন্ধ্যা বা রাতেই দেখতে বেশি সুন্দর। ৮৮ তলায় উঠতে সময় লাগে দেড় মিনিটের মতো। খালি চোখে ৮৮ তলা থেকে মনে হয় ব্যাংকক ঢাকার তুলনায় চারগুণ বড় শহর। সর্পিল ফ্লাইওভার বা হাইওয়েগুলো চোখ আটকে রাখে।

স্কাই টাওয়ার থেকে ব্যাংকক শহর

স্কাই টাওয়ারের ১৮ তলা থেকে ৮৭ তলা পর্যন্ত হোটেল এবং এই হোটেলের রেস্টুরেন্ট। মোট চারটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে এই হোটেলের। টপ ফ্লোরে আছে রাতের ব্যাংকক দেখতে দেখতে বুফে ডিনারের ব্যবস্থা। আগে থেকে সেখানে বুকিং দিতে হয়।এ ডিনারের বিশেষত্ব বিখ্যাত স্যামন মাছ। ডিনারসহ আমাদের তিন জনের সেখানে খরচ লেগেছে ১ হাজার ২শ বাথ।