চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক চাল

‘ভারতবাসীরা খরগোশের মতো বাচ্চা দেয়’- কথাটি বলেছিলেন ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের জনক তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। তিনি ভারতবাসীকে প্রচন্ড ঘৃণা করতেন, আর এও মনে করতেন এরা পরিপূর্ণ খাবার পেলে প্রতি বছরই বাচ্চা উৎপাদন করবে। তাই তাদের খাদ্যের অভাবে মারা উচিত এবং তাহলেই ভারতবর্ষে জনসংখ্যার ভারসাম্য আসবে। স্থানীয় চোর, ক্ষমতা লোভী ও দুর্বৃত্তদের সঙ্গে একত্রিত করে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ রাজের ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্রপাত হয়। অর্থাৎ বাংলা থেকেই ব্রিটিশ রাজের যাত্রা শুরু হয়। আর হঠাৎ করেই পঞ্চাশের মন্বন্তর ব্রিটিশদের আবার নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

অবিভক্ত বাংলায় ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ছিল ব্রিটিশ শাসকদের পরিকল্পিত! এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে সেই সময়কার কেবিনেট পেপারে। গত ২৮ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ভবন নবান্নে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৭ অবিভক্ত বাংলার শেষ ১০ বছরের গোপন কেবিনেট ফাইল প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেই ফাইলগুলোর কোনোটিতেই তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের স্বাক্ষর নেই। ফাইলে কেবিনেট মেমোর কোনো অস্তিত্ব নেই।  এমনকি ইতিহাসের পাতায় ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার কথা উল্লেখ থাকলেও সেই সময়কার সরকারের কেবিনেট তথ্যে দুর্ভিক্ষ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব নেই।

বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত ‘বখতগঞ্জের’ মতো খাদ্যশস্যের স্বয়ংসম্পূর্ণ এলাকা থেকে কোনো রকম খাদ্যসামগ্রী যাতে কলকাতাসহ গোটা বাংলায় পৌঁছতে না পারে তার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল সেই সময়ের কেবিনেটে। এর আগে গবেষক মধুশ্রী মুখার্জি তার ৮ বছর গবেষণার বই চার্চিল’স সিক্রেট ওয়ারে দেখিয়েছেন, ব্রিটেনের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সরকারের বেশ কিছু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদক্ষেপের কারণে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে অখণ্ড বাংলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মর্মান্তিকভাবে মারা গেছে। 

ভারতবর্ষে যখন ‘ভারত ছাড়ো’ বা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠছে তখন এ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মধুশ্রী মুখার্জির বইতে প্রথম দুর্ভিক্ষের বিষয়ে ব্রিটিশ রাজের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়েছিল। কয়েক জাহাজ খাদ্যশস্য পাঠানোর মাধ্যমে চার্চিল অনায়াসে ভয়াবহ এ দুর্ভিক্ষ প্রতিহত করতে পারতেন তা সেই বইটিতে প্রমাণ করা হয়েছে। বাংলার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য খাদ্যশস্য পাঠানোর জন্য ভারতের দুই ভাইসরয়, চার্চিলের ভারত বিষয়ক সচিব এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত চার্চিলকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু, চার্চিল তাদের সে আহবান বা অনুরোধে সাড়া দেননি। সে সময় এখান থেকে খাদ্যশস্য ব্রিটেনে রপ্তানি করা হতো কিংবা খাদ্যশস্যের বদলে চাষীদেরকে নীল বা পাট চাষে বাধ্য করা হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। ১৯৪২ সালে জাপান তৎকালীন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) দখল করে নেয়ার পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। এর ফলে বার্মা থেকে ভারতে চাল আসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন খাদ্যের দাম বাড়লেও কয়েকটি দেশ থেকে খাদ্য আনা হয়। ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগো বলেছিলেন, খাদ্য আমদানি করা হয়েছে- শুধু এ খবরটি কোনোভাবে ভারতে পৌঁছালেই তার জের ধরে খাদ্যশস্যের দাম কমে আসতো। খাদ্যের অভাবে ত্রিশ লাখ মানুষ মারা যেতো না। 

বিজ্ঞাপন

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু সে সময় বার্মা থেকে দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার জনগণের জন্য চাল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু, সে খবর ভারতের কোনো পত্রিকায় প্রকাশ করতে দেয়নি ব্রিটিশ সেন্সর কর্তৃপক্ষ। সে সময় কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ভারতে খাদ্য পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু, তাও হয়নি। কারণ ভারত মহাসাগর দিয়ে যে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে ব্রিটেনে খাদ্য আমদানির কাজে। অথচ, ব্রিটেনে তখন দরকারের চেয়ে অনেক বেশি খাবার মজুদ ছিল। 

চার্চিলের প্রিয় উপদেষ্টা পদার্থবিদ লর্ড চেরওয়েল অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের তত্ত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। ভারতের দুর্ভিক্ষকে তিনি প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে মনে করতেন। খাদ্য পাঠানো হলে ভারতবাসী সন্তান উৎপাদনে আরো আগ্রহী হবে আর এতে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে বলে তিনি মনে করতেন। যদিও পরে চার্চিলের ভারত বিষয়ক সচিব লিও অ্যামেরি চার্চিলের মনোভাবের সঙ্গে হিটলারের মনোভাবের মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। আসলে চার্চিল ও সেই সময়ের বৃটিশ শাসকেরা বাংলার মানুষের জীবন বাঁচানোর সামান্য প্রয়োজন বোধ করেননি। কিছুদিন আগে লন্ডনের দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেই সময়ের দুর্ভিক্ষকে ‘হলোকাস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিল, এই মারাত্মক দুর্ভিক্ষ প্রকৃতির কারণে হয়নি বরং এ ধরণের দুর্ভিক্ষ হয়েছে চার্চিল ও সেই সময়ের হিটলারদের কারণে।

১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় প্রতিমণ চাল ৬ টাকার কমে বিক্রি হয়েছিল। সেই চালের দাম ১৯৪৩ এর মার্চে গিয়ে দাঁড়ায় প্রতিমণ ১৫ টাকা। আর ১৭ মে তা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩১ টাকায়। চাল সঙ্কট এতটায় বিস্তার লাভ করেছিল যে, কোনো কোনো জেলায় তা প্রতিমণ ১০০ টাকার উপরে বিক্রি হয়েছিল। উনিশ’শ ত্রিশের দশকের শেষ দিকে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ চাষি পরিবারপিছু দুই একরের কম পরিমাণ জমির মালিক ছিল। অন্যরা শ্রমিক শ্রেণির ছিল। 

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, ‘১৯৪৩ সালে বাংলায় তেমন বড় রকমের খাদ্যশস্যের ঘাটতি ছিল না। কিন্তু এরপরও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কারণ, যে মূল্যে তাদের জিনিসপত্র ও শ্রম বিক্রি করেছে তার চেয়ে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল’। আর সেই সময়ের দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিটি বলেছিল, খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি ছিল শুধুমাত্র শতকরা ছয় ভাগের মতো। খাদ্যদ্রব্যাদির মূল্য কৃষিকার্যে নিয়োজিত মজুর ও প্রান্তিক চাষিসহ অধিকতর গরিব শ্রেণির জনগণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল। অর্থাৎ মৌলিক যুক্তি একই রকমের।

১৯৪৩ সালে মে ও জুন মাসে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে দুর্ভিক্ষ প্রবল আকার ধারণ করে এবং জুলাই মাস নাগাদ অধিকাংশ এলাকা দুর্ভিক্ষ কবলিত হয় এবং মৃত্যুর হার প্রায় সব জেলায় স্বাভাবিকের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। অক্টোবর মাসে উপকূলীয় জেলাসমূহে ৩২০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। যার ফলে ক্ষেতের আমন ধানের বিপুল ক্ষতি হয়। ডিসেম্বর মাসে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে। ঐ একই মাসে কিছু আমন ধান তোলা হলে ও ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে সরবরাহ পৌঁছলে চালের মূল্য বেশ কিছুটা নিচে নেমে আসে এবং দুর্ভিক্ষের প্রকোপ কমে যায়। কিন্তু ১৯৪৪ সালের পুরো সময়ব্যাপী মৃত্যুর হার উচ্চই থেকে যায়। এর কারণ ছিল কলেরা, বসন্ত-রোগ ও ম্যালেরিয়া মহামারির প্রার্দুভাব। ১৯৪৫ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখন দুর্ভিক্ষ আরো প্রসারিত হতে থাকে, প্রায় গোটা পঞ্চাশের দশক ধরে। 

যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চিরশত্রু ইরান আর কিউবাতে তাদের দূতাবাস নতুন করে খুলে দিয়েছে। সেখানে মাস দুয়েক আগে ভারতের এক মন্ত্রী যুক্তরাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতার সময় বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের কার্যাকলাপের জন্য তাদের ক্ষমা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত’। কয়েকমাস আগে বাংলাদেশ থেকে ব্রিটিশ দূতাবাস সরিয়ে দিল্লিতে নেওয়া হয়েছে। অথচ প্রতি বছর বাংলাদেশের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ ভিসা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশে ব্রিটিশ দূতাবাসে যেতো। এখন ভিসার জন্য সবাইকে যেতে হচ্ছে নয়া দিল্লিতে। নূন্যতম কূটনৈতিক ধার তারা ধারেনি। সম্ভবতঃ তারা চায় না বাংলাদেশীরা ব্রিটেনে অবস্থান করুক। কারণ চার্চিলদের ব্রিটিশ রক্ত যে তারা বয়ে বেড়াচ্ছে।