চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বৈরী সময়ের ঘূর্ণিতায়, প্রদীপ জ্বলে আলোর আশায়

সাম্প্রতিক সময়ের দুটি ঘটনা বেশ সাড়া ফেলেছে। দেশের গণ্ডি ছাপিয়ে এই অপ্রীতিকর ঘটনা দুটি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। প্রতিবাদের ঝড় উঠে। অপরাধীদের গ্রেফতার এবং শাস্তির দাবি ওঠে। এই ঘটনা দুটি হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জে গত ১৩ মে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত লাঞ্ছনা এবং ৫ জুন চট্রগ্রামে পুলিশ স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যা। এই দুটি ঘটনার সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন। আমরা আশায় থেকেছি। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবেন। আমাদের আন্দোলন সফল হবে। পূরণ হবে দাবি।

বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩০টি আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। সেই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলো ৮ কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮ জন। এর মধ্যে নতুন ভোটার হয়েছিলেন ৬০ লাখ ৫৮ হাজার ৪২ জন। তরুণ প্রজন্মের একটি বিরাট অংশের ভোটে জয় লাভ করে আওয়ামী সরকার। এই প্রজন্ম প্রযুক্তির সাথে পরিচিত। এরা ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক নির্ণয়ে সচেতন। এরা ইতিহাস বিশ্লেষণ করে। পড়াশুনা করে। আধুনিকভাবে কোনো সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করে। আশাও করে তেমনটি। তাদের আশার ফলশ্রুতিতে দেশকে একটি ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ১০ম সংসদ নির্বাচন। বিএনপির অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ পুনরায় নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। যদিও এই নির্বাচন নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। নির্বাচনের আগে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি প্রধান দুই দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মাঝে সংলাপের উদ্যোগ নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৩টি আসনে জয় লাভ করে এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে আবির্ভূত হয়। রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে ওয়াকার্স পাটি ৪টি আসন এবং জাসদ ২টি আসন লাভ করে। ত্বরিকত ফেডরেশন ১টি এবং বিএনএফ ১টি আসন লাভ করে। একই বছর ১২ জানুয়ারি শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ২৯ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠন করেন। 

গত ১০ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) প্রায় ৫৯১ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করেছে। গত ৬ জুন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন। যদিও বেসরকারী হিসেবে এই সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি। ২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর তথ্যবিবরণী থেকে জানা যায়, গত ৮ বছরে দেশে ২০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২৭৪ ও নির্যাতিত হয়েছেন ৮৩২ জন সাংবাদিক। বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ ১৮টি হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। প্রকৃত আসামীরাও গ্রেফতার হয়নি এখনও। জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) থেকে প্রকাশিত ‘প্রতিরোধ ও শাস্তি: সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মোকাবিলা ও সমাধানের সন্ধান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সাংবাদিক খুনের সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ১৯৯২ থেকে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি খুন ও মৃত্যুর শিকার হওয়া ২০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইউনুস, অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ, অধ্যাপক ড. শফিউল ইসলাম হত্যার পর, এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। গত ২৩ এপ্রিল নিজ বাসার অদূরে গলা কেটে হত্যা করা হয় তাকে। প্রায় একই কায়দায় খুনের শিকার হয়েছেন উল্লেখিত ৪ শিক্ষক। প্রত্যেককেই তাদের বাড়ির আশপাশে খুন করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডগুলো পরিকল্পিত হলেও প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হয়নি একটিরও। মামলার দীর্ঘসূত্রীতায় আসামিরা ফাঁক-ফোকর দিয়ে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তাদের সহকর্মীরা।

থেমে নেই শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শহরে অন্তত ৫ শতাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এক পরিসংখানে জানা যায়, গত ৫ বছরে ৬৫ জন শিক্ষক বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন। এগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ২০১০ সালের ১১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষককে প্রহারের ঘটনা। ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আড়াই শতাধিক শিক্ষকের অবস্থান ধর্মঘটের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। হামলায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ২৫ জন শিক্ষক আহত হন। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ শিক্ষককে প্রহার করা হয়। ২০১৪ সালের ২৩ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষককে পেটানোর পর ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতাকে বহিষ্কার করে কর্তৃপক্ষ। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক গোলাম মঈনুদ্দীনকে মারধরের অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কৃত এই ছাত্র ছিলেন মামুন খান। এছাড়া ২০১৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুরে কলেজ শিক্ষককে পেটায় ২ ছাত্রলীগ নেতা। আসন বিন্যাসকে কেন্দ্র করে প্রভাষককে মারধর করেছে ছাত্রলীগের ২ নেতা। শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার শিক্ষক আবদুল্লা হীল হাসান প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক।

বিজ্ঞাপন

গত ৩ বছরে ১০ জন ব্লগার খুন হওয়ার মামলার একটিরও বিচার কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে একমাত্র আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলায় ৫ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মামলাটি বিচারের প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে। বগুড়ায় জিয়া উদ্দিন জাকারিয়া বাবু হত্যার ঘটনায় ৩ শিবির কর্মী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ব্লগার নীলাদ্রি চট্রোপাধ্যায়, লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপনসহ ৭ ব্লগার হত্যা মামলার তদন্তে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে। সর্বশেষ গত ৬ এপ্রিল রাতে রাজধানীতে খুন হয়েছেন অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিমউদ্দিন সামাদ। গত বছরের ৩১ অক্টোবর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীতে ঢুকে প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপনকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে লালমাটিয়ায় ড. অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশনী সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল, ব্লগার রণদীপম বসু ও তারেক রহিমকে কুপিয়ে জখম করে। এই ২টি ঘটনায় শাহবাগ ও মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা দু’টি মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ঘটনার তদন্তে পুলিশ ও র‌্যাব শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ যাচাই করেও কোনো ঘাতককে শনাক্ত করতে পারেনি।

এমন একটি পরিস্থিতি-তে গত ৮ জুন প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করেছেন। আমাদের বহু আশার সম্মেলনটি পরিণত হয় চরম হতাশায়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তৎপর’। ঘটে যাওয়া এসব ঘটনাকে তিনি ‘পরিকল্পিত গুপ্তহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঘটনায় জামায়াত-বিএনপি’র সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, আমি হেড অব দ্য গভর্নমেন্ট। আমার কাছে তথ্য আছে বলেই নিশ্চয়ই আমি কথাগুলো বলেছি। সব তথ্য সবসময় প্রকাশ করা যায় না।’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী: আপনি সব তথ্য জানেন না। আপনি কী জানেন নিহতদের পরিবার-এর ব্যথা-বেদনার কথা? আপনি কী জানেন, একটি পরিবারের নির্ভরশীল ব্যক্তির অবর্তমানে পরিবারটি’র দশা কতোটা বেহাল হয়? আপনি কী অনুভব করতে পারেন অপমানের জ্বালা কতোটা সাংঘাতিক? আপনি কী জানেন, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্র সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্থ? আপনি কী কখনও অনুভব করতে পারবেন, যানজটে আটকে থাকা মানুষের অসহনীয় কষ্টের কথা? আপনি কী জানেন আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত কতোটা আংতকের? বেঁচে থাকায় আমাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই। মানুষের মৌলিক চাহিদা ভূলুন্ঠিত?

দেশে একটির পর একটি অপরাধ ঘটছে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে দুর্বৃত্তরা একযোগে হামলা চালায় রামুর ঐতিহ্যবাহী ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধপল্লীতে। সেই ঘটনার সুরাহা হয়নি আজও। যার ধারাবাহিকতার অপরাধ এবং সহিংসতা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে অস্থিরতা।

আমরা দেখেছি ৫ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হতে। আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হতে। তার ৫ খুনির ফাঁসি কার্যকর হতে। এসব ঘটনা আমাদের আশা বাড়িয়েছে। আমরা আশা রাখতে চাই। রাজনীতির ব্লেমগেম নয়। আমরা চাই সকল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক। যে কোনো ধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান আমাদের। আমাদের যেন ধৈর্য্যচ্যুতি না ঘটে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)