চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বেশি কিছু আশা করা ভুল!

ঈদের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। ওদিকে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট। আমাদের দেশের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের এখন সুখের অন্ত নেই। সারাদিন ধরে কেবল ক্রিকেট চর্চা। কী হলে কী হতো, আর কী হতে পারতো, কেন এমন হলো, এভাবে কেন, ওভাবে নয় কেন-এই চর্চা চলবে আগামী একটা মাস। এমনিতেই আমাদের দেশের মানুষ একটু বেশিই ক্রিকেট পাগল। এর সঙ্গে বাণিজ্যিক বুদ্ধি, দেশপ্রেমের আরোপিত প্রলেপ, গণমাধ্যমের উস্কানি, আর কিছু সাফল্য ক্রিকেটকেই ক্রমশ ‘ধর্ম’ বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। আমরা হুজুগপ্রিয় বাঙালিরা মাতোয়ারা হওয়ার মতো একটা হুজুগ খুঁজি। ক্রিকেট আমাদের সকলের সেই আশা পূরণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে আমাদের উন্মাদনার শেষ নেই। বিশ্বকাপ শুরুর এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমাদের গণমাধ্যমগুলো বিশ্বকাপকেই মূল শিরোনাম বানিয়ে খবর পরিবেশন শুরু করেছে। এটা হয়তো মাসব্যাপীই চলবে। কিন্তু যেখানে ক্রিকেটের জন্ম, এবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট যে দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেই ইংল্যাণ্ডেই ক্রিকেট নিয়ে তেমন একটা মাতামাতি নেই। সেখানকার গণমাধ্যমগুলোও ক্রিকেট নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত নয়। বিশ্বকাপের খবর তারা ছাপছে ছোট করে, অবহেলা ভরে। আর আমাদের দেশে গণমাধ্যমগুলো পারলে সব খবর বাদ দিয়ে কেবল ক্রিকেটেরই খবরই প্রকাশ করে!
বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে ঘিরে আমাদের এই হুজুগ গত এক যুগ ধরে শুরু হয়েছে। আগে ক্রিকেট থাকলেও সাফল্য ছিল না। আর ছিল না ক্রিকেট দেখার এমন সহজ সুযোগ। এখন টিভি-মোবাইল-ইন্টারনেট সুলভ হওয়ায় ঘরে ঘরে, এমনকি হাতে হাতেই খেলা উপভোগের সুযোগ পাওয়া যায়। আর ক্রিকেট দেখার, ক্রিকেট নিয়ে মাতোয়ারা হওয়ার গণমাধ্যমের নিরন্তর উস্কানি তো আছেই।
বিশ্বকাপ ক্রিকেটকে ঘিরে সারা দেশে যে হুজুগ ও উন্মাদনার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে আগামী এক মাস যে অন্য কোনো সমস্যা যে আর সামনে আসার সুযোগ পাবে না-তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এটা অবশ্য একদিক থেকে ভালো। কেননা এই একমাস অন্তত আমরা দুর্নীতি, ঈদে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ, খাদ্যে ভেজাল, কৃষকের ধানের দাম না পাওয়া, নারী নির্যাতন ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ পাব না। এটা সরকারের জন্যও স্বস্তির। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভীষণ উপকারী। অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত এই দরিদ্র দেশের মানুষেরা যদি ক্রিকেট হুজুগে মত্ত হয়ে কিছু দিন প্রাত্যহিক সমস্যা ও সংকট থেকে মুক্ত থাকে, সেটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো।

অনেকে অবশ্য নেতিবাচক অনেক বিষয়কে সামনে আনার চেষ্টা করেন। তাদের মতে, এই ক্রিকেট উন্মাদনার কারণে দেশের কোটি মানুষের কত শত শ্রমঘণ্টা পানির মতো ভেসে যাবে, তরুণ-যুবকদের স্বাস্থ্য, পড়াশোনার ক্ষতি হবে, প্রতিপক্ষ দল সম্পর্কে নেতিবাচক ও বিদ্বেষমূলক মনোভাব তৈরি হবে, যা আখেরে সামাজিক হিংসাকেই বিকশিত করবে-এসব বিষয়ও ভেবে দেখা উচিত। কারও কারও এমন উদ্বেগও রয়েছে যে, আমাদের দেশের অনেক মানুষের কাছে ক্রিকেট খেলা এখন ‘খেলা’ নয়, ‘জীবন-মরণের’ বিষয়। এটা আর শুধুই আনন্দ, মজা বা ‘বিনোদন’ নেই। এটা পরিণত হয়েছে, যে কোনো মূল্যে বিজয়ী হওয়ার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষায়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যেমন নির্বাচনে জয় ছাড়া অন্য কোনো কিছু ভাবতে পারে না, আমাদের ক্রিকেট সমর্থকদের অনেকেই জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না। এটা অত্যন্ত ক্ষতিকর ও সর্বনাশা এক মনোভাব। জয়ের ব্যাপারে উচ্চাশা থাকলে মানুষ পরাজয়কে মেনে নিতে পারে না। তখন পরাজয়ের স্বাদ পেলে সে নিজে যেমন ধ্বংসাত্মক কিছু করতে পারে, ঠিক তেমনিভাবে আরেকজনের বড় কোনো ক্ষতিও করতে পারে। এমন জয়ের আশা করা যায় কি না-সেটাও সবার ভেবে দেখা উচিত।

বিজ্ঞাপন

এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। কিন্তু যে উন্মাদনা ও উন্মত্ততা আমাদের দেশে দেখা যায় তা পৃথিবীতে আর কোনো দেশে দেখা যায় কি না সন্দেহ। এই বিংশ শতাব্দীর শেষেও পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে, যেগুলোর নাম খেলাধুলার সঙ্গে কখনো শোনা যায়নি; বরং পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই সম্ভবত এ বৈশিষ্ট্য নিয়েই চলে। অথচ তারাও তাদের শিশু-কিশোরদের শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে সজাগ। খেলাধুলাকে জীবন-মরণের বিষয় না বানিয়েও তারা শুধু বিংশ শতাব্দীতে জীবিতই থাকেনি, উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিক থেকে তারা আমাদের চেয়েও অগ্রগামী। পৃথিবীর এক বৃহৎ রাষ্ট্র চীনের কথাই ধরা যাক, শরীর চর্চা ও দেহ সুরক্ষার কলা-কৌশলের প্রতি যতটা গুরুত্ব এদের মধ্যে পাওয়া যায় অন্য অনেক দেশেই তার ছিটেফোঁটাও নেই। কিন্তু এটাকেও তারা শুধু ব্যায়াম ও শরীর চর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে, একে এমন ব্যাপক উন্মাদনার অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলেনি। যা আবাল-বৃদ্ধের মন-মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে রাখবে এবং তাদেরকে মৌলিক দায়িত্ব-কর্তব্য পালনের ব্যাপারে উদাসীন করে তুলবে। হ্যাঁ, একথা ঠিক যে ক্রিকেট বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেবার একটি মাধ্যম। যারা ক্রিকেট বোঝে, ক্রিকেট সম্পর্কে খোঁজখবর রাখে তারা এখন বাংলাদেশের নাম জানে, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নাম জানে এবং তাদের সম্মান করে। আমাদের অল্পদিনের ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক বড় কিংবদন্তী খেলোয়ারের জন্ম হয়নি। তারপরও আমরা বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ও লড়াকু তরুণকে নিয়ে এগিয়ে চলেছি ভবিষ্যতের দিকে।

মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ, সৌম্য, লিটন, রুবেল, মিরাজরা আমাদের ক্রিকেটের মূল ভরসা হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে কয়েকজন যদি জ্বলে ওঠে, তাহলে যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয় সম্ভব। আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের জয় এক জন বা দুজনের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না। আজ পুরো দল একসূত্রে গাঁথা। প্রত্যেকেই দলের প্রয়োজনীয় ও নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। পুরো দলটাই আজ একতাবদ্ধ। এই একতাবদ্ধ দলের কাছে তাই অনেকেই একটু বেশিই প্রত্যাশা করে বসেন।

এই প্রত্যাশা বড় কোনো প্রতিযোগিতায় গিয়ে একেবারেই মাত্র ছাড়িয়ে যায়। এবারের বিশ্বকাপ ঘিরেও অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন, চ্যাম্পিয়ন হচ্ছি কিনা। সেমিফাইনালে যাচ্ছি তো? যেন, ট্রফি পাওয়া কিংবা সেমিফাইনালে যাওয়াটা খুবই সাধারণ, নাহলে সেটা হবে অঘটন। এ ক্ষেত্রে বাস্তবতাটা প্রত্যেকেরই মনে রাখা দরকার। একদিনের ক্রিকেটে আইসিসি র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বর ইংল্যান্ড। গত তিন বছর ধরে দারুণ খেলছে ওদের টিম। বাটলার, বেয়ারস্টো, জেসন রয়, মর্গান, জো রুট—এরা প্রত্যেকেই বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান। এর মধ্যে প্রথম তিনজন চূড়ান্ত ফর্মে রয়েছেন। বোলিং বিভাগও শক্তিশালী। অস্ট্রেলিয়া যদিও র‌্যাংকিংয়ে ৫ নম্বরে, গত কয়েক মাসে দারুণ ভালো ফর্মে রয়েছে। স্মিথ ও ওয়ার্নারকে ছাড়াই ৩–২ হারিয়েছে ভারতকে, পাকিস্তানকে হারিয়েছে ৫–০। দুজনই ফিরেছেন দলে। আইপিএল–এ ডেভিড ওয়ার্নার কম ম্যাচ খেলেও সর্বোচ্চ রান করেছেন, ৬৮৯, অন্যদের চেয়ে প্রচুর এগিয়ে। প্রথম দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে চমৎকার হাফ সেঞ্চুরি করেছেন স্মিথ। একটা ইনিংসে সেঞ্চুরির কাছাকাছি। তারপর, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ–জেতানো ১১৬, ১০২ বলে। অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ, উসমান খাজাও রান পাচ্ছেন ধারাবাহিকভাবেই। দলে তিনজন দুরন্ত ফাস্ট বোলার—স্টার্ক, কামিন্স, রিচার্ডসন। দুজন ভাল অলরাউন্ডার— ম্যাক্সওয়েল ও স্টয়নিস। নাথন লায়ন অগ্রগণ্য অফ স্পিনার, জাম্পাও ভালো লেগস্পিনার। চারবারের বিশ্বজয়ী দল আবার সফল হতে পারে। 

দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ডও শেষ চারে উঠতে পারে। গেইল ও রাসেল তো আছেনই, নতুন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সর্বার্থে ভালো টিম। রশিদ–নবিদের আফগানিস্তান যে–কোনও ম্যাচের ফল উল্টে দিতে পারে। আর তারকা ঠাসা কোহলির ভারত তো আছে দারুণ ফর্মে। ভারত-বাংলাদেশের প্রস্তুতি ম্যাচেই উভয় দলের শক্তির পার্থক্য বোঝা গেছে। তারা এবারও ফেবারিট। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে বেশি উচ্চাশা কিংবা বেশি উচ্ছ্বাস না দেখানোটাই ভালো। টিম যদি ভালো কিছু করে, তবে আমরা অবশ্যই খুশি হব। কিন্তু আগেভাগেই নিশ্চিত জয়ের ছবি এঁকে ও প্রত্যাশা ছড়িয়ে যেন নিজের ওপর বেশি চাপ না নিই, দলকেও চাপে না ফেলি। দলের সবচেয়ে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য শুভকামনা রাখব। তবে পরাজয়ের জন্যও প্রস্তুত থাকব। বেশি আশা ভালো নয়। বেশি কিছু আশা করা ভুল!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)