চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিদায় নেয়া বছরে শিশু হত্যা-ধর্ষণ বৃদ্ধির প্রতিবেদন প্রকাশ

সদ্য বিদায় নেয়া বছরে দেশের শিশু অধিকার লঙ্ঘনের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৭ সালটি ছিলো দেশে শিশু হত্যা,ধর্ষণ এবং শিশুর আত্মহত্যা বৃদ্ধির বছর। শিশু হত্যা-ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করা হয়েছে। তবে আত্মহত্যা বৃদ্ধির নতুন কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গোপন ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার মতো নতুন অভিশাপ। এই অভিশাপ রুখে দিতে দেশে প্রচলিত পর্নোগ্রাফি আইনের কঠোর বাস্তবায়ন এবং প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে যুগোপযোগি বিধান রাখার আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

আজ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ২০১৭ সালের শিশু অধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব বিষয় উঠে আসে।

১০ টি জাতীয় পত্রিকার ২০১৭ সালের সংবাদ পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদায় নেয়া বছরে মোট ৩ হাজার ৮৪৫ শিশু বিভিন্ন ধরণের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গড়ে প্রতিমাসে ২৮ শিশু হত্যা এবং ৪৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।


প্রতিবেদনের তথ্যচিত্র অনুযায়ী,২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে শিশু হত্যা ও ধর্ষণের সংখ্যা বেশি। ২০১৭ সালে ৩৩৯ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৭৫ শিশুকে নিখোঁজ পরবর্তী সময়ে হত্যা করা হয়, ৫০ শিশুকে হত্যা করে বাবা-মা, ২৬ শিশুকে অপহরণের পর এবং ২২ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,২০১৭ সালে ৫৯৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ৭০ জন শিশু গণধর্ষণ, ৪৪ প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণের মতো ঘটনা রয়েছে। শুধু মেয়ে শিশু নয় ২০১৭ সালে বলাৎকারের শিকার হয়েছে ১৪ ছেলে শিশু।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দাম্পত্য কলহ, যৌতুক, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা-প্রতিশোধের বলি হয়েছে নিরীহ শিশুরা।

শিশু হত্যা-ধর্ষণের মতো বর্বরতম ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেবে বিচার না হওয়ার সংস্কৃতিকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুস সহিদ মাহমুদ।

বিজ্ঞাপন

তার বক্তব্যকে সমর্থন করে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন: আজ আমাদের দেশে যা ঘটছে এমন দেশ আমরা চাইনি, বঙ্গবন্ধু এমন দেশ চাননি। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কি তার দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে? ৪৫ শতাংশ শিশুর জন্য আমরা আজ পর্যন্ত একটি অধিদপ্তর করতে পারিনি। এই প্রতিবেদন থেকে একথায় বলা যেতে পারে শিশু অধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। গত বছর আশঙ্কাজনকভাবে শিশু হত্যা বেড়েছে। ধর্ষণ ধর্ষণের পর হত্যা বেড়েছে। ৬ বছরের, ১১ বছরের মেয়ে শিশু রেহাই পায়নি। আমরা বার বার বলছি একটা বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। সমাজের একশ্রেণীর লোক জানে নির্যাতন করেও সে পাড় পেয়ে যাবে। রাকিব-রাজনের হত্যাকারীদের মতো অন্যান্য শিশু হত্যাকারী,ধর্ষণকারী, নির্যাতনকারীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার করা হলে অপরাধপ্রবণতা নিয়ে চলা ব্যক্তিদের মনে ভীতি তৈরি হবে। এজন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

‘স্টেট অব চাইল্ড রাইটস ইন বাংলাদেশ-২০১৭’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন বলছে, সব ধরণের যৌন নির্যাতনের হিসেবে ২০১৭ সালে ভুক্তভোগী শিশুর সংখ্যা ৮৯৪। ২০১৬ সালে এই ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো ৬৮৬ জন শিশু। অর্থাৎ গতবছর যৌন নির্যাতন-নিপীড়ন ৩০.৩২ শতাংশ বেড়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে শিশুর অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার মতো অপরাধ প্রবণতা।

ইন্টারনেটে ছড়িয়ে যাওয়া ছবি-ভিডিও এবং ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে শিশুরা। এসব কারণ সহ আরও কয়েকটি কারণে ২০১৭ সালে শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।

ইন্টারনেট দুনিয়ার নতুন এই অভিশাপকে শিশু অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে কিভাবে দেখছেন?

চ্যানেল আই অনলাইনের এই প্রশ্নের জবাবে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন: ইন্টারনেটে শিশুর আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ভুক্তভোগীকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই দেশে প্রচলিত শিশু আইনে শিশুদের ছবি দেয়াই নিষেধ। দেশে পর্নোগ্রাফি বিরোধী আইনও আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। আইনের প্রয়োগ যদি সঠিকভাবে হয়, অপরাধীদের সনাক্ত করে যদি শাস্তি নিশ্চিত করা যায় তাহলে এই ধরণের অপরাধ কমে আসবে। প্রয়োজনে চাইল্ড পর্নোগ্রাফি আইনও হতে পারে।

একই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান এমরানুল হক চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: পর্নোগ্রাফি আইন থাকলেও কার্যকর নয়। কার্যকর না হওয়ার পেছনে কারিগরিভাবে পিছিয়ে থাকাটা বড় কারণ। বিশ্বব্যাপী পিডোফাইল (শিশুকামী) বিরোধী জনসচেতনতা গড়ার আন্দোলন চলছে। আমাদের দেশে দুই দিক দিয়েই পর্নোগ্রাফির শিকার শিশুরা। তারা দেখছে আবার তাদের নিয়ে পর্নোগ্রাফি বানিয়ে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এসব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আমরা আইসিটি মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসতে চাই।

১৯৯৭ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে ‘স্টেট অব চাইল্ড রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। তবে ফোরাম নিজেই বলছে এই প্রতিবেদন পুরো দেশের শিশু অধিকার লঙ্ঘনের খণ্ডচিত্র, বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। তাই শিশু অধিকারের মারাত্মক লঙ্ঘনের মুখে লাগাম টানতে সরকার, অভিভাবক, এনজিও এবং গণমাধ্যমের প্রতি ১৩ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে এবারের প্রতিবেদনে।

দেশের ৪৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীই শিশু। তাই শিশুদের কথা বলতে জাতীয় শিশু অধিকার কমিশন গঠন, অবিলম্বে শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর এবং সংসদ অধিবেশনে বছরে দু’টি দিন শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন হতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান।