চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাজেট ২০১৯-২০২০: দলিত ও সমতলের আদিবাসীরা রয়ে গেল দৃষ্টির আড়ালেই!

গত ১৩ জুন মহান সংসদে আগামী অর্থ বছরের অর্থাৎ ২০১৯-২০২০ সালের জন্য জাতীয় বাজেট পেশ করা হল। ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার এ বিশাল বাজেটের অনেকগুলো দিক রয়েছে। ফলে এর খুঁটিনাটি বলতে গেলে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে। মোটাদাগে কয়েকটি বিষয় শুরুতেই উল্লেখ করা দরকার। যেমন-প্রাক্কলিত ব্যায়ের বিপরীতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা, তার মানে ঘাটতি বাজেট দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। বলাবাহুল্য, যা গত বাজেটের চেয়ে বেশি। আর ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যথাক্রমে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং ২৭ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করা। আর বাকী টাকাটা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করার কথা বলা হয়েছে।

প্রাক্কলন এবং টাকা সংগ্রহের দিকটি থেকে এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক ব্যয়ের দিকে। তাতে দেখা যাচ্ছে-বাজেটের একটি বিরাট অংশ অর্থাৎ ১৯.৩ শতাংশ ব্যয় হবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন-ভাতা বাবদ, ৮.৭ শতাংশ যাবে পেনশন বাবদ। আর দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ বাবদ যাবে ১৮.৩ শতাংশ টাকা।

জাতীয় বাজেটে আয়ের খাত এবং দরিদ্র মানুষের হিস্যা
৩ লাখ ৮১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সেটা কোথা থেকে আসে? সেটা আসবে বরাবরের মতোই অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। আর অভ্যন্তরীণ উৎস মানে হলো ব্যক্তি আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর যা টাকার অংকে ২ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। আয় ও মুনাফা কর থেকে যে অর্থ জাতীয় রাজস্ববোর্ড সংগ্রহ করে সেখানে উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের অবদান বেশি হলেও কিন্তু মূল্য সংযোজন কর-এ গরীব মানুষের অবদান কম নয়। বিশেষ করে এবার বাজেটে মূল্য সংযোজন করের আওতা ও পরিমান যেভাবে বাড়ানো হয়েছে তাতে নিম্ন আয়ের এবং দরিদ্র মানুষ খুব বেকায়দায় পড়ে যাবে।

প্রস্তাবিত প্রাক্কলন এবং দলিত ও আদিবাসীদের প্রাপ্তি
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে যদি অর্থমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হয় দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য কোন খাতে কি বরাদ্দ রাখলেন? দলিত ও আদিবাসের নামে কোনও একটি খাত দেখিয়ে দেয়া তার জন্য দুরূহ হবে। তার মানে সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ঐসকল মানুষের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই! তবে হ্যাঁ, সাদাচোখে যদি দেখা যায় তাহলে দরিদ্র মানুষ আর দশজনের মতো যোগাযোগ অবকাঠামো, বাজার-ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, কৃষিতে দেয়া ভর্তুকি ইত্যাদি থেকে সেবা নিতে পারবে। কিন্তু এর বাইরে আর কী পায় তারা? তাদের দেয়া কর সরকারের হাত দিয়ে যে ১৪টি খাতে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, জনপ্রশাসন, জনশৃঙ্খলা, প্রাতিরক্ষা, ভর্তুকি, প্রণোদনা, সুদ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ ইত্যাদি) খরচ হচ্ছে সেখানে ঐ মানুষগুলোর প্রাপ্তির হিস্যা কতো?

শুধু তাই নয়, দরিদ্র হওয়ার কারণে যে অবস্থার মধ্য দিয়ে তারা সেবা পায় সেটাকে কী পাওয়া বলা যায়? ন্যায্য সেসকল পাওনা পেতেও অনেক বঞ্চনা পাড়ি দিতে হয়। মূল্য সংযোজন কর ছাড়াও কৃষি উৎপাদন, কায়িক শ্রম ও উদ্ধাবনী অবদান রাখার পরও তারা কী পাচ্ছে? বিশেষ করে দলিত এবং সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী যারা নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বৈষম্যের মধ্যে দিনাতিপাত করে তাদের জন্য কী অঙ্গীকার থাকলো এই বাজেটে? আজকের বাস্তবতায় তার নির্মোহ বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। 

দরিদ্র বান্ধব কর্মসূচি এবং মানবিক মর্যাদা
উল্লিখিত ১৪টি খাতের পরিচালন এবং উন্নয়ন ব্যয় যোগান দেয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষের কনট্রিবিউশন দু’হাত বাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে অথচ দেবার বেলায় কী? বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাস এবং স্পিরিট যদি বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে দরিদ্র মানুষের জন্য-ঐ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এর বাইরে কৃষিতে দেয়া কিছু ছিঁটেফোটা ভর্তুকি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তথা দান-খয়রাতের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাতে দেখা যাচ্ছে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে কিছু বরাদ্দ বাড়িয়ে দরিদ্র মানুষের প্রতি তার দায় শেষ করতে চাচ্ছে। ধনীক গোষ্ঠী এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ধ্বজাধারী সরকারগুলো সামাজিক নিরাপত্তার মতো একটি কর্মসূচি নিয়ে দারিদ্র দুর করার যে প্রপ্রাগান্ডা চালায় অনেকটাই ফাঁপা এবং অবাস্তব। হ্যাঁ, খাইয়ে-পরিয়ে দরিদ্র মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেটা হয়তো ঠিক আছে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল কী হচ্ছে এটা কেউ বলছে না। দিনের পর দিন এই ধরণের কর্মসূচি দরিদ্র জনগণকে তুষ্ট করার জন্য ব্যবহার করে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্পর্কে যেটুকু জানা গেছে তাতে বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, দুগ্ধদানকারী দুস্থ মায়ের জন্য ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ নারীর ভাতা ইত্যাদির আওতা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ভাতার পরিমান বাড়ানো হয়নি। কিন্তু ঐসকল কর্মসূচিতে দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা করে কিছু বলা নাই। তাদের বিষয়ে শুধু এক জায়গায় বলা হয়েছে তাও পরোক্ষভাবে তাহলো-বেদে ও অগ্রসর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গত বছরের চেয়ে ২০ হাজার বাড়িয়ে ৮৪ হাজার করা হয়েছে, কিন্তু তারা কতো ভাতা পাবে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। এছাড়া, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা পড়বে, সেখানে দলিত এবং সমতলের আদিবাসীদের কোন বিবেচনায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে তারও কোনও দিক-নির্দেশনা বাজেট বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।

একজন বয়স্ক মানুষ দরিদ্র হবার কারণে যদি কিছু টাকা পায় তাতে তার কী লাভটা হচ্ছে? সে যেনতেন ভাবে বেঁচে থাকছে এটা সত্য কিন্তু তার এই বাঁচার মধ্যে কি কোনও গৌবর আছে? এই বাঁচায় কি তার মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? নিশ্চয়ই হচ্ছে না বরং হাজার লোকের সামনে দরিদ্র মানুষকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অবমাননাকর। মানবাধিকারের মূল সুর এবং বাংলাদেশের সংবিধানে ব্যক্তির যে মর্যাদা দেয়া হয়েছে তার স্পিরিটের সাথে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মনস্তত্ত্ব সম্পূর্ণ দ্বান্দ্বিক। তাই এটি কোনোভাবেই দারিদ্র মুক্ত একটি মর্যাদাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কোনও কার্যকর কৌশল হতে পারে না।

দলিত ও সমতলের আদিবাসীরা কেন বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে?
ঘোষিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ঐটুকু বরাদ্দ (বেদে ও অনগ্রসরদের জন্য বরাদ্দ) বাদ দিলে আর কোথাও কোনো সুষ্পষ্ট বরাদ্দ নেই। কিন্তু কেনো নেই? এখানে কী ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরই সব দায়িত্ব? সরকার পরিচালনাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায় এখানে পুরোটা না। এর দায় আরও অনেককে নিতে হবে। যেমন-যারা দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের উন্নয়নে কাজ করছে সেসকল বেসরকারি সংগঠন/নেটওয়ার্ক/অধিকারমঞ্চ প্রভৃতিকে। যারা একটি পিছিয়ে জনগোষ্ঠী হিসেবে দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের সমস্যাগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করে কোনও সমন্বিত দাবি জাতীয়ভাবে উত্থাপন করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, তাদের পক্ষ থেকে একটি ক্রেডিবল অবস্থান নিয়ে নীতি-নির্ধারণী পক্ষসমূহের সামনে হাজির হতে পারেনি। ভুক্তভোগী এসকল মানুষের প্রকৃত চাহিদা, জীবিকায়ন চ্যালেঞ্জ এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য করণীয় বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি এবং তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে গণমাধ্যমসমূহ জোড়ালো ভূমিকায় না থাকাও তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। 

আগামী দিনের অগ্রাধিকার
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় এসেছে সেটাকে অবশ্যই উন্নয়ন বলতে হবে। শুধু তাই নয় দক্ষিণ-এশিয়ার অনেক দেশের থেকে বাংলাদেশ নানা সূচকে ভালো অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে এখন সময় এসেছে উন্নয়ন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিকল্পনা করার। যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তি সম্পূর্ণ দলিত ও আদিবাসী বান্ধব কর্মসূচি নিয়ে আমূল বদলে দেবে এতটা আশা করা ঠিক হবে না কিন্তু একটি মানবিক মর্যাদাপূর্ণ উন্নয়ন ধারা শুরু করার কোনও বিকল্প নেই। বিশেষ করে-সাংবিধানিক অঙ্গীকার, টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে হবে সব মানুষের সমান উন্নয়ন ও মর্যাদার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

আর সেই ধারার উন্নয়ন শুরু করার জন্য দরকারি দুটো দিক হলো-দলিত ও আদিবাসীকেন্দ্রিক সুনির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় নীতি-কাঠামো তৈরি করা। শুধু বাজেটে বরাদ্দ দিলেই হবে না, যদি বাস্তবায়নকারী এবং রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান না থাকে তাহলে কিছুই অর্জন করা সম্ভব হবে না। খুব সঙ্গত কারণে বেসরকারি সংগঠন, দলিত ও আদিবাসীদের সংগঠন এবং মিডিয়াকে সাথে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নীতি-কাঠামোর ধারণা এবং আর্থিক বরাদ্দের ব্যবহারিক দিক সরকারের সামনে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)