চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলা একাডেমির সামনে লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিবাদী অবস্থান

বাংলা একাডেমির গেটে লেখক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এক সারিতে দাঁড়িয়ে। দু’জনের হাতে প্ল্যাকার্ড, ধিক্কার জানিয়ে তাতে লেখা হয়েছে ছি! ছি!। এই সারি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ, পাশেই বড় একটি পুলিশ ভ্যান দাঁড়ানো। তবুও বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধের প্রতিবাদে সরব হয়ে বক্তারা বলেন, অবিলম্বে বাংলা একাডেমিকে এরকম হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে। ২ মেয়াদে মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার পরও ৩য় মেয়াদে আবার চেয়ার দখলে রাখা শামসুজ্জামান খানকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।

পাশাপাশি শ্রাবণ নিষিদ্ধের বৈঠকে আদৌ সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন কিনা বা বৈঠকে এব্যাপারে তাঁর কী ভূমিকা ছিলো তার ব্যাখ্যা দাবী করেছেন তারা।

পুলিশি বাধার পরও প্রতিবাদ কর্মসূচির শুরুতেই বক্তারা বলে, আমাদের লজ্জা লাগছে বাংলা একাডেমি সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালকের হঠকারীতার প্রতিবাদ জানাতে হচ্ছে। বাঙালির মুক্তচিন্তা এবং প্রাণের মেলাকে উন্মুক্ত না করে বিশেষ গোষ্ঠীর ‘দালালি’, ‘ফরিয়া’ গিরিতে ব্যস্ত। অথচ বাংলা একাডেমি দেশের সবার। দেশের মানুষের লড়াই -সংগ্রামের ফল। তাই এখানে আমলাদের মতো আচরণ করে বর্তমান মহাপরিচালক এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে শ্রাবণকে বইমেলায় নিষিদ্ধ করতে পারেন না। কোন ক্ষমতাবলে তিনি বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং এতে করে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীরই মনরক্ষা করা হচ্ছে কিনা তা নিয়েও সংশয় জাগা স্বাভাবিক। মুক্তমতের ওপর আঘাতে রাজপথে-অনলাইনে-গণমাধ্যমে সোচ্চার রবীন আহসান। এতে ক্ষুব্ধ হয়েই শ্রাবণ প্রকাশনীকে বইমেলায় ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অমর একুশে গ্রন্থ মেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে বিকাল সাড়ে ৩ টায় বাংলা একাডেমির সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে  লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীসহ নানা শ্রেণীপেশার মানুষ।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার বন্ধ করার ষড়যন্ত্র রুখতে এবং একাডেমি থেকে কূপমণ্ডুক-সুবিধাবাদীদের অপসারণের দাবিতে লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী ও নাগরিকবৃন্দের ব্যানারে এ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়।

কর্মসূচিতে অংশ নেয়া বিশিষ্টজনেরা বাংলা একাডেমির এ ধরণের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানান।

ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন,’ বাংলা একাডেমি মহাপরিচালকেরকোনো প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করার নির্বাহী ক্ষমতা নেই। গায়ের জোর বেশিদিন চলবে না। তাকে তার দখল করে রাখা বাংলা একাডেমির গেটে দাঁড়িয়ে সতর্ক করা হচ্ছে। রবীন আহসান রাজপথে- গণমাধ্যমে প্রতিবাদ করায় তার প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করাটা হাস্যকর। মহাপরিচালক কি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পার্থক্যও বোঝেন না? ৩য় মেয়াদে তিনি কিভাবে মহাপরিচালক থাকেন তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়’।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক বলেন,’হুমায়ুন আজাদ অনেক আগেই বলেছিলেন বাংলা একাডেমিতে মূলা খাওয়া ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এখন এখানে কাঁঠাল পাতা খাওয়াদের ভীড় বাড়ছে। মুক্তচিন্তার জায়গাগুলো কৌশলে সংকুচিত করতে করতে বিলুপ্ত করা হচ্ছে। বাংলা একাডেমি কোনো ধর্মান্ধ-আমলার কলমের খোচায় জন্মায়নি তাই এখানে মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা মেনে নেবো না’।

সাবেক ছাত্রনেতা ও লেখক খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন,’ সামরিক সরকারগুলো যখন মুক্তপ্রাঙ্গন বাংলা একাডেমিতে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে তখন আমরা প্রতিবাদ করেছি। অথচ আজ বেশ উঁচু গলায় গণতন্ত্রের কথাবলা সরকারের সময়েও একটি পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম হতে দেখছি। রাষ্ট্রের এই অবস্থান আসলে জঙ্গি-ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেই পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে’।

শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবিন আহসান বলেন: সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি মহা অন্যায়। আমরা আজকে মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছি। এরপরও যদি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে তাহলে পরে আরো কঠোর কর্মসূচি পালন করব।

কর্মসূচির সমন্বয়ক বাকী বিল্লাহ বলেন: ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে শ্রাবণ প্রকাশনীকে দু’বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলা একাডেমির অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ করার আইনি এখতিয়ার বাংলা একাডেমির নেই।

সাবেক ছাত্র নেতা ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন: শ্রাবণ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত যে বৈঠকে নেওয়া হয়েছিল সেখানে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। শ্রাবণ প্রকাশনী নিষিদ্ধের প্রেক্ষিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ব্যাখা দাবী করার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন,’ একুশ মানে মাথা নত না করা। অথচ এখন বাংলা একাডেমির প্রশাসকরা মাথা নত করতে বলছে। রাজপথে-গণমাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় রবীন আহসানের প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে বইমেলা থেকে। সমালোচনা করা যাবে না, এটা কোন বাংলাদেশ?’

কর্মসূচিতে বক্তারা অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান। তারা বলেন: বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের মেয়াদ দুই বছর তাপপরেও তিনি তিন বছর যাবৎ মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশনী বন্ধের এখতিয়ার তার নেই। তিনি যা করেছেন তা এখতিয়ার বর্হিভূত।

বক্তারা আরও বলেন: মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও জনগণের বাংলা একাডেমি এখন আমলা তান্ত্রিক বাংলা একাডেমিতে পরিণত হয়েছে।

কর্মসূচীতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির,  গবেষক ও কথা সাহিত্যিক দীপংকর গৌতম, লেখক রেজা ঘটক, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী সৈয়দা সুলতানা অ্যানি,অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ু্,  প্রমুখ।

ছবি: তানভির আশিক

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail