চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলার ফ্রাঙ্কেনস্টাইনদের বেড়ে ওঠার কাহিনী

গুলশানের হলে আর্টিজান এবং লোক সংস্কৃতির ভূমি কিশোরগঞ্জের ঈদের জামাতে ইসলামিক জঙ্গিদের সন্ত্রাসী হামলা নিয়ে আলোচনার ঝড় চলছে অবিরাম। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা উগ্ররূপ ধারণ করেছে কেন সেটা নিয়েই ভাবছিলাম দলিত মথিত হৃদয় নিয়ে। গত কয়েক দিনের বিনিদ্র রজনীর তাড়নায় লিখাটা লিখলাম এই ভেবে যে, এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় কি তা ভেবে বের করতে না পারলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরত আসতে পারছি না কোনোভাবেই।

বিজ্ঞাপন

সমস্যার কারণগুলো বুঝতে পারছি, কি করতে হবে তাও বুঝতে পারছি কিন্তু কিভাবে তা বুঝতে পারছি না। কারণ সমস্যাটা আমরা দীর্ঘদিন ধরে লালন করেছি সযতনে। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের মস্তিষ্কে মৌলবাদের ক্যান্সার ধরা পড়েছিল প্রায় ৩০/৩৫ বছর আগে। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করেনি বিধায় আজ রাষ্ট্র দেহের সর্বত্র এই ক্যান্সার ছড়িয়ে গেছে।

জাতিগতভাবে আমরা চারপাশের নিত্যদিনের সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবতে উদাসীন, রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতিপরায়ণতা এবং ধর্মান্ধতা যা নিয়ে আমাদের আজ আর কোনো দ্বিমত নেই। আর সেই সাথে ক্রমাগত বহির্বিশ্ব রাজনীতির প্রভাব মাথার উপরতো আছেই। আমাদের সমাজ এবং পরিবার মনে করে ছেলে আমার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, মসজিদে সময় কাটায় দীর্ঘক্ষণ, তাহাজ্জুদও পড়ে, আল্লাহ এর পথে নেমেছে, মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকায় না, মস্ত বড় আলেমের ওয়াজ শুনে অহর্নিশি, আমার ছেলে খারাপ হতেই পারে না।

সন্তান পরহেজগার হলে, আলেম হলে, মসজিদ বানাতে পারলে তার উছিলায় চৌদ্দ গুষ্ঠি একসাথে বেহেশতে যাবে আর যুক্তিবাদী মুক্তমনা নাস্তিক ছেলের জন্ম দিলে চৌদ্দ গুষ্ঠি দোজখে যাবে এই বিশ্বাস খুব প্রকট! আল্লাহপাক সকলকে হেফাজত করবেন এই বিশ্বাসে কোনোদিন মসজিদের হুজুর, ইমাম বা ধর্মীয় লেবাস ধারীদেরকে কখনো অবিশ্বাস করে না আমাদের পরিবার এবং সমাজ। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করলে সেই সমাজের চেহারা কি ভয়ানক হতে পারে তা বাংলাদেশের মানুষ আগে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি তা বলবো না।

ইসলামিক জিহাদি জঙ্গি বিষয়টা অপেক্ষাকৃত নতুন একটি আমদানি দেশে। সমাজের চারপাশে যে নীরব জঙ্গিরা ধর্মচর্চার নামে নিশ্চুপ জীবনের সাথে মিশে থাকতে পারে তা আমরা এখনো অনুধাবন করতে শিখিনি। সেই সাবধান বাণীটা MA, PhD ধারী উচ্চশিক্ষিত বাবা-মাকে বুঝিয়ে বলতে হবে সেটাও আমাদের সকলের ছিল অজানা। তেঁতুল বাদীদের তেঁতুল তত্ত্ব বা hate speech শোনার পরও ছেলে আমার প্রতিবাদ করে না, কত বাধ্যগত সন্তান ভেবে বাবা-মা শান্তিতে ঘুমাতে পারেন বছরের পর বছর! এই ধর্মীয় নেতারা যে বিষবাষ্প ছড়ায় তার কারণে জেন্ডার ভায়োলেন্স বেড়ে যাবার সম্ভবনা থাকে, তা নিয়ে কথা না বলাটাই যে তাদেরকে আস্কারা দেয়া সেটা কি এখনো বুঝিয়ে বলতে হবে?

কলা খুলে রাখলে কেউ খায় না তাকে ঢেকে রাখতে হবে আমাদের নারীদেরকে নিয়ে এই ভাষায় আজও আমাদের সমাজ কথা বলে! নারীর শরীরে বারো হাত কাপড় পড়াবার পর আরো এক্সট্রা পাঁচ হাত কাপড় দিয়ে ঢাকতে হবে মাথা এবং নাসারন্ধ্র শুধুমাত্র চোখ দুটো খোলা রেখে। বড় আলেম/পীর সাহেব হাজার হাজার পুরুষের সামনে ওয়াজ করে বলেছেন, এটা অমান্য করা তো কবিরা গুনাহ! আমার দাদী আর মাকেও তো দেখেছি শালীনভাবে পরিপাটি করে শাড়ি পড়তে কিন্তু এক্সট্রা কাপড় দিয়ে মাথা বন্ধ করে রাখতে তো দেখিনি, কেউ বলেওনি তাদের!

কিন্তু আজ শুনেছি বাংলাদেশে আমার বোনেরা এবং বন্ধুরা বাংলার ঐতিহ্য শাড়ি পড়তে চায় না কারণ আরব্য রজনীর ফ্যাশন বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেখানে। আর কেউ কেউ মনে করে শাড়ি অশ্লীল পোশাক। আমার মা আজও বেঁচে আছেন কিন্তু ধর্মীয় ফ্যাশন তাই প্রশ্ন করতে ভয় পান, যত গরমই লাগুক মেনে নিতে বলেন এই অতিরিক্ত কাপড়ের বোঝা শরীরে এই ভেবে যে নেকি বেশি হবে, মরতে হবে একদিন, বেহেশত হাতছাড়া হবার ভয় বড় ভয়। বিধর্মীদের বা বেনামাজির হাতের রান্না খাওয়া যাবে না যা পরিবার এবং সমাজ উভয়েই শেখাচ্ছে, ঘৃণা ছড়াচ্ছে এবং যথারীতি এই শিক্ষাটি সমাজের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করছে তা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলছে না।

শুনেছি বরগুনা জেলার আমড়াতলা উপজেলায় নারীদের জন্য আলাদা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে স্থানীয় পীরের নির্দেশে। কেমন করে বলি এইসকল প্রতিদিনকার রেসিস্ট প্র্যাক্টিসে, hate speech গুলো মেনে নিতে নিতেই একদিন মায়ের সেই কথার বাধ্য খোকন সোনা দৈত্য আকারে রাক্ষস এর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়ে জগতের সকল ইহুদি, খৃষ্টান, হিন্দু, মডারেট মুসলিমদের (ইসলামিক দৈত্যদের চোখে খারাপ মুসলিম কারণ তারা ভাবে জিহাদি জঙ্গি দৈত্যরাই শুধু সাচ্চা মুসলিম) তলোয়ার দিয়ে জবাই করে, কতল করে শাহাদাত বরণ করে বেহেশতে যাবার স্বপ্ন দেখে। ধর্মের নামে সব বজ্জাতি ঐ বাংলায় চলেছে এবং চলবেই কারণ আমরা জেগে জেগে ঘুমাতে ভালোবাসি আজও।

যেদেশে পিকে, জালালের গল্প, মাটির ময়না, রানওয়ের মতো ফিল্ম দেখেও মানুষ জেগে উঠে না, লালসালু বোঝে না, ধর্মান্ধতা নিয়ে যারা প্রতিবাদ করে তাদেরকে গলা কেটে মেরে ফেলে, সমাজ ছাড়া করে, মৌলবাদের অর্থনীতি আমাদের স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করছে, এটা আমরা সবাই জানি কিন্তু কলুষিত রাষ্ট্র যন্ত্র তা থেকে বখরা পায় বলে নিশ্চুপ, সেই জাতির কথা নতুন করে বয়ান করার কিছু নাই, শুধুই মূল্যবান সময় নষ্ট।

এই মৌলবাদের ষড়যন্ত্রের শুরুর সময় থেকেই আমাদের লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিকরা চেঁচিয়ে যাচ্ছিলেন, আমরা ভ্রুক্ষেপ করিনি। আমার পরিবারকে হিট করেনি আমি ভালো আছি ভেবে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম আমরা এতো দিন। আজ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে, জেগে উঠার চেষ্টা করছি তখন বুঝতে পারলাম বড্ড দেরি হয়ে গেছে, কেমোথেরাপি কাজ করছে না। মৃত্যুর জন্য, বাংলাদশকে হারাবার জন্য সবাই প্রস্তুত হও। দেখতে পাই এখনো অনেক মানুষের হুশ আসে নাই, তারা ঐ ভাবেই মরবে আমাদেরও মারবে বুঝতে পারি বেশ।

বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ এবং উচ্চশিক্ষার সিলেবাসগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়াও অত্যন্ত জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমদানি বাংলাদেশে যখন শুরু হলো তখন থেকেই এম বি এ, কম্পিউটার সায়েন্স আর মেডিকেলে পড়ার হিড়িক ছিল ছেলে-মেয়েদের মধ্যে। সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হবার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো হাতে গোনা দুই একটি ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অফার পর্যন্ত করা হয় না।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দর্শন, ইতিহাস, নাট্যতত্ত্ব, চারুকলা এবং বাংলা সাহিত্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আছে ঠিকই কিন্তু সবচেয়ে নিগৃহীত এবং পরিবার উৎসাহ যোগায় না পড়বার জন্য, চাকরি পাবে না বলে। জ্ঞানের জগতে, শিক্ষা ব্যবস্থাতে বৈষম্য ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। কর্পোরেট শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্মীয় মৌলবাদী শিক্ষাবিদ আর তাদের কুচক্রী বলয় ছাত্রদের হাতে আজ আর কবি নজরুলের সাম্যবাদী, মানুষ, বিদ্রোহী, জাতের নামে বজ্জাতি, নারী কবিতা তুলে দেয় না। লালসালু, লালনের দর্শন, সিমোন দা বুভোয়ার এর দর্শন, সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া, বার্টান্ড রাসেল, মার্ক্স, এঙ্গেলস, সক্রেটিস, আহমেদ ছফা, সর্দার ফজলুল করিম, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথের মানব ও প্রকৃতি প্রেমের সাথে পরিচয় ঘটাচ্ছে না।

সাধারণ ইতিহাস, দর্শন, নৃ-বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, রিলিজিয়ন স্ট্যাডিজ, ওমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্ট্যাডিজ, সোশ্যাল জাস্টিস স্ট্যাডিজ, রিলিজিয়ন অ্যান্ড কালচার এবং সাহিত্যের মতন গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান থেকে বঞ্চিত আমাদের গোটা সমাজ এবং শিক্ষার্থীরা। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে, বাংলাদেশে বসে পাশ্চাত্যের অদেখা সংস্কৃতি আর ইতিহাস পড়ে তাদের চারপাশ এর বাংলা সংস্কৃতির মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করতে পারছে না। মাদ্রাসায় পড়ুয়া আরবি মিডিয়াম এ পড়া ছাত্রটিরও একি সমস্যা, ইসলামের যে ইতিহাস জানছে আরবের সংস্কৃতি যা জানছে পড়ছে তার সাথে তার নিজস্ব যাপিত জীবনের কোনো সম্পর্ক নাই। এটা আর এক বিশাল সমস্যা যা আলাদা করে বিশদভাবে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণদের জীবনে নাই পর্যাপ্ত খেলা-ধূলার মাঠ, সুস্থ বিনোদন চর্চার মাধ্যম এবং প্রতিদিনকার জীবনে দেখা মেলে না কোনো মেন্টর বা রোল মডেলের সাথে।

বিজ্ঞাপন

চিন্তার খাদ্য নেই আমাদের নাটক, সিনেমাতে, মননশীলতার পরিবর্তন ঘটানোর সাহিত্য, সংগীত, নাটক কিছুই নাই যে জাতির, আছে শুধু ফেসবুক এ দৈনন্দিন জীবনের বিলাসিতা প্রদর্শন এবং দেখানোপনা আর ক্যাপিটালিজম এর বলি বিকৃত সেক্সি ‘হট’ ইন্টারনেট এর নারীদেহ। ফেসবুক এ প্রচুর গঠনমূলক আলোচনা হচ্ছে, জ্ঞান অর্জনের জন্য ইন্টারনেট এ রয়েছে আকাশসম সুযোগ, কিন্তু তারা তা বেছে নিচ্ছে না। সেখানে জঙ্গি বাবাদের ওঁৎ পেতে বসে থাকাটা আর তাদের ফাঁদে পড়াটা খুব সহজ।

অঢেল কালো টাকার অধিকারী এবং ঘুষখোর বাবা-মায়ের সন্তানেরা জীবনে পায়নি এমন কিছুই নেই, শুধুমাত্র ভালো প্যারেন্টিং এর ছায়ায় বেড়ে উঠবার সুযোগ বঞ্চিত হওয়া ছাড়া! চাইবার আগেই দামী নামকরা স্কুলে ভর্তি হতে পারা, গরমের ছুটিতে বা ঈদের ছুটিতে লাস-ভেগাস বেড়াতে যাওয়া, জীবনে কি চায় তারা নিজেও জানে না। কষ্ট না করেই চাকরি পেয়ে যাওয়া, আরামআয়েশ, ভোগ পায়ে অনায়াসে লুটোপুটি খায় কোনোরকমে অর্জন না করেই! নানাধরণের নাম না জানা মাদক, ইয়াবা সব পরখ করে দেখবার পর ইহজগতে অরুচি ধরবার পর তারপর তারা ধরেছে পরকালের অগণিত হুর আর বেহেশত অর্জনের জীবন। হয়তো বেহেশত তাদের গন্তব্য নয়, তারা হয়তো অস্ত্র, ক্ষমতা পাবার নেশায় মত্ত হয়েছে, পাশাপাশি জিহাদ করে শাহাদাত বরণ করবে এটা তাদের পথভ্রষ্ট জীবনে নতুন একধরণের গন্তব্য এনে দিয়েছে, নতুন এক আনন্দ দিচ্ছে তাদের চিত্তে।

র্ম শিখছে এবং চর্চা করছে যে ভাষায় তার অর্থ জানেনা, ব্যাখ্যাগুলো বোঝে না কারণ যারা পড়াচ্ছে তারাইতো জানেনা, এমনকি বাবা-মায়েরাও। ধর্ম প্রচারকরাও এতো বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে চারিদিকে যা সকলের মানসিক স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করছে। এতো মানসিক চাপের মধ্যে নিয়মিত স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং নেওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষক এর সাথে ছাত্রদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নেই যে পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত মানসিক জটিলতাগুলো নিয়ে কথা বলবার। বাংলায় কোরআন পড়লে অর্থ বদলে যাবে এবং সওয়াব কম হবে বলে নির্বোধের মতন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে না বুঝে তোতা পাখির মতন বিদেশি একটি ভাষায় এই ধর্মের চর্চা চলছে অবিরাম।

ধর্মীয় ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে জিইয়ে রাখার জন্য পরিবার আর সমাজের ভূমিকা ক্রিটিক্যালি দেখবার সুযোগ এবং শিক্ষা কোনোটাই সমগ্র জাতির নেই। ক্রিটিক্যাল থিংকিং এর সুযোগ না দিলে অন্তর বিকশিত হবে না, সৃজনশীলতা ব্যাহত হবে যা ঐ ধর্মান্ধ কট্টর মূর্খ সমাজ স্বীকার করে না। আন্তর্জাতিক ইহুদি, ইসরাইলি, ইরাকি, আমেরিকান ইত্যাদি শত্রুরা ইসলামের বারোটা বাজাচ্ছে, তাই আমাদের সন্তানেরা বিপথে চলে গেছে এই কথা বলে নিজেদের অসচেতনতাকে আর ঢেকে রাখতে পারবে না। আমরা আমাদের ঘর থেকে জঙ্গি জিহাদি সৈনিক তৈরি হবার সুযোগ করে দিয়েছি সেই দায় আমাদের স্বীকার করে নিতেই হবে। আবার একদল মানুষকে এটাও বলতে শুনি, বাহ তারা শাহাদত বরণ করেছে ইসলামিক শাসন কায়েমের জন্য! এতো জটিল বিভ্রান্তি আশপাশে, কি ভয়াবহ দুর্দিন আমাদের বাবা-মায়েদের জন্য সন্তান প্রতিপালন নিয়ে।

এই বিভ্রান্তির আর দোষারোপের খেলা বন্ধ করতে হবে, এখনো যদি আমরা বাঁচতে চাই বাকিটা পথ। এক মুসলিমদের মধ্যে এত মতের অমিল আর কোন্দল থাকলে বহিঃশত্রুরাতো সুযোগ নেবেই! আহমদীয়া, শিয়া, সুন্নি, সালাফি, ওয়াহাবী, ভারত বর্ষের ইসলাম, পারস্য ইসলাম, আরব্য দেশের বর্বরোচিত ইসলামিক চর্চা, ইউরোপ আমেরিকার ইসলাম, আফ্রিকার ইসলাম, সবশেষে সিরিয়ার সন্ত্রাসী ISIS ইসলাম এত্ত সকল ভিন্ন সংস্কৃতির ইসলামকে আমরা বুঝতে পারছি না কারণ আমাদের দেশের মানুষরা নানা সংস্কৃতির মানুষ, ভাষা, পোশাক, রীতি-নীতি দেখে অভ্যস্থ নয়। ক্রস-কালচারাল পরিবেশে মেশার অভিজ্ঞতার অভাবে শুধুমাত্র ইন্টারনেট এ ডিজিটাল ক্রস-কালচারাল/ মাল্টি কালচারাল ইসলামিক জীবন দেখে তরুণরা গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছে।

হীরক রাজার দেশে রাজা বলতো ‘যত বেশি জানবে তত কম মানবে’ সেই ভাবনা থেকে আমাদের অসৎ রাষ্ট্রযন্ত্র আজও বেরিয়ে আসতে পারেনি। আজও জনগণকে সঠিক শিক্ষা দেবার পথটি নষ্ট করে রেখেছে নানা উপায়ে। আত্মজাগৃতি ঘটানোর পথগুলোতে বিভ্রান্তি ছড়ানো। আলোকিত মানুষদের কাজগুলো সম্পর্কে না জানলে নিজেকে আলোকিত করা যায় না। মানুষের আত্মার ভেতরে ধর্মের বসবাস না হলে, অন্তরকে বিকশিত করার উপায়গুলোকে ধ্বংস করে দিলে যা হয়, বাংলাদেশে আজ তাই হচ্ছে।

আমরা যদি আমাদের অন্তরাত্মাকে না চিনি এবং সম্মান করতে না শিখি তাহলে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা গড়ে তুলতে পারব না। বিদেশে আসবার পর থেকে দেখছি চার্চগুলোতে নামাজ, পূজা এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান উদযাপন করবার সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশে কোনো মসজিদে কি পূজা বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোনো আচার অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আজ পর্যন্ত? ধর্মীয় গোড়ামির চর্চা আমাদের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে বহুকাল ধরে, আমি বিস্মিত নই আজকের বাংলাদেশকে দেখে।

স্বামীজীর আহ্বান ছিল- ‘ওঠ, জাগো, নিজে জেগে অপরকে জাগাও’ আমি তার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলবো আমি নিজেকে জাগাতে পারবো কিন্তু অন্যকে জাগাবার চেষ্টা করবো না। কারণ এই জাগরণ নিজেদের বা সময়ের প্রয়োজনে ভেতর থেকে না এলে অপরকে জাগানো যাবে না। তাই সময় দিতে হবে আত্মউপলব্ধি থেকে জেগে উঠবার জন্য। মাদ্রাসার গরিব ঘরের ইসলামিক জঙ্গি আর ধনীর ঘরের নিব্রাসদেরকে একটু একটু করে জঙ্গি করে তুলেছে আমাদের পরিবার, চারপাশ/কমিউনিটি, বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যর্থ রাষ্ট্রযন্ত্র, কলুষিত রাজনৈতিক চর্চা, আমাদের পচে যাওয়া সমাজব্যবস্থা এবং আরবি ভাষার দুর্বোধ্য আরব্য সংস্কৃতির ধর্ম।

‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ সেটাই শিখে বড় হয়েছিলাম। সবার উপরে ধর্ম সত্য মানুষ সেখানে নাই এই বিষয়টিও বাংলার সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য নতুন তথ্য। আজ আমাদের বাঙালির আত্মপরিচয়ের সন্ধান করতেই হবে এই ঘুটঘুটে কালো অমানিশা কাটাতে হলে। বাঙালিয়ানার সাংস্কৃতিক শেকড়ের খোঁজে বের হলেই জানতে পারবো ভারতবর্ষের সুপ্রাচীন ইতিহাস এবং সেই সাথে পরিষ্কার হয়ে যাবে ইসলামিক ঔপনিবেশিকতার ইতিহাস আর আজ আমাদের ধর্ম নিয়ে মারামারি করবার কারণগুলো। ‘বাংলা আমার মায়ের ভাষা’ পরবর্তী প্রজন্মকে না শিখিয়ে যদি শেখানো হয় ‘বাংলা আমার আম্মুর ভাষা’ তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যায় ইসলামিক নীরব জঙ্গিদের ভূমিকা এবং তাদের কৌশলগুলো।

আমরা পর মত অ-সহিষ্ণু জাতি, আগে মুসলমান তারপর বাঙালি সব শেষে ‘মানুষ’ তাই এত্ত সমস্যা। এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই। এই সমস্যাটি আজ আর শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয়। সারাবিশ্বের মুসলিমরা আজ ভুগছে, তাদেরকেই পথ খুঁজে বের করতে হবে কিভাবে অন্য জাতির প্রতি ঘৃণা, ক্রোধ প্রকাশ না করে ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখা যায়।

স্কিজোফ্রেনিক ধর্মীয় নেতাদের তার ধর্মান্ধ এবং বিভ্রান্তিকর মতবাদ প্রচার বন্ধ করতে হবে তাদেরই স্বার্থ টিকিয়ে রাখবার জন্য এবং সরকারকেও নিজেদের গদি বাঁচাবার জন্য। আশপাশের গঠনমূলক সমালোচনা থেকে লুকিয়ে থাকা শিক্ষাটা নিতেও শিখতে হবে। 

সম্প্রতি  ইন্টারনেট এ  খুঁজে পাওয়া একটি উক্তি দিয়ে শেষ করবো ধর্মান্ধ পথভ্রষ্ট ইসলামিক দৈত্যদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবার ক্ষীণ প্রত্যাশায় এবং মুক্তির আলো খুঁজে পাবার আশায়।

“Islamize your soul Muslim not your country,
put a hijab over your ego not your head;
cover your good deeds in a burqa not your faces.” Tarek Fatah.

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)