চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলাদেশ: অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর অস্থিরতার যৌথ সমন্বয়

৪ জুলাই সকালটি শুরু হয়েছে এক লঞ্চ দুর্ঘটনায় খবর দিয়ে। বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টার দিকে কীর্তনখোলার চরবাড়িয়া এলাকায় এক লঞ্চ দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৫ জন মারা গেছে। আহত আরও ১০/১২ জন। বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে ঢাকাগামী সুরভি-৭ লঞ্চের সঙ্গে বরিশালগামী পিএস মাহসুদ স্টিমারের সংগে সংঘর্ষের ঘটনায় এই দুর্ঘটনা। ঈদ আসন্ন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আঁচ করা যায় প্রতিদিন নিশ্চিতভাবে, অব্যাহত ধারায় এসব দুর্ঘটনা খবর আসবে। ছবি ভাসবে স্বজন হারানোদের আহাজারি’র।

এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি, তখন কাজের ফাঁকে ঢুঁ দিয়েছি বিভিন্ন নিউজ সাইটে। ফেসবুকে। পর্যায় ক্রমে খবর আসছে। একটিও ভালো খবর নেই। যা খবর তা হলো, মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে কক্সবাজারে আওয়ামী লীগের ২ নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। দিনাজপুরে সোহরাব আলী ভুট্টু (২৭) নামে এক নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি তার স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে জবাই হত্যা করেছে। বগুড়ার ধুনট উপজেলায় বিয়ে রেজিস্ট্রারকারী (কাজী) ও মসজিদের ইমাম মাওলানা মতিউর রহমান (৪২) কে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।

বিজ্ঞাপন

মানুষ খুন হওয়া যেন এখন স্বাভাবিকতার পর্যায়ে পড়ে। খুন হচ্ছে। খুনের নমুনা আদিম বর্বরতাকে হার মানায়। কুঁপিয়ে খুন অথবা জবাই করে হত্যা। ‘চাপাতি’ নামক এক ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। অথচ ‘চাপাতি’ কী জিনিস,সেটাই কয়েক বছর আগে অনেকের কাছে ছিলো অজানা। এটি স্বচক্ষে দেখেছেন, এমন ছেলে-মেয়ে ঢাকা শহরে কমই ছিলো। হঠাৎ করে এই জিনিসটি’র প্রচলণ কে শুরু করলো? কেন এই অস্ত্রটিকে মানুষ খুনের কাজে ব্যবহার করতে হবে? এমন প্রশ্ন সংগত কারণেই আমাদের চিন্তিত করে। ব্যথিত করে। প্রশ্নের উত্তর যখন খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হয়। একাধারে ভয়ও হয়। আমরা কে কখন এই বস্তুর আঘাতের শিকার হবো, কে জানে?

বিশ্বজিৎ দাস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদের এখনও মনে আছে। ঘটনাটি ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখ। ঐদিন সকাল থেকে রাজধানী ঢাকায় সরকার বিরোধী আন্দোলন চলছিলো। চলছিলো অবরোধ।   সকাল ১০টা’র দিকে বাহাদুর শাহ পার্কের পাশ দিয়ে ছাত্রলীগের একটি মিছিল যাওয়ার সময় বোমা বিস্ফোরণ হলে সবাই যখন পালাচ্ছিল। তখন পলায়নরত বিশ্বজিৎকে মিছিল থেকে ধাওয়া করে তার ওপর হামলা চালানো হয়।

প্রত্ক্ষ্যদর্শী এক রিকশাচালক রিপন রায় হত্যাকাণ্ডের বর্ণনায় বলেন, “বোমার শব্দে এক ব্যক্তি (বিশ্বজিৎ) পার্কসংলগ্ন পেট্রোল পাম্পের দিকে দৌড় দেয়। ওই মিছিল থেকে ধাওয়া করে কয়েকজন তাকে মারতে থাকে। ওই ব্যক্তি মার খেতে খেতে পাশের ভবনে উঠে যায়। লোকগুলো সেখানেও তাকে চাপাতিসহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে মারতে থাকে।

এরপর তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে নিচে নেমে শাঁখারীবাজারের গলির মুখে গিয়ে পড়ে যান। তিনি পানি চাইলে পাশের এক দোকানি পানি খাওয়ান।” এরপর রিপনের রিকশায় মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্বজিৎকে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রকাশ্য-দিবালোকে শত শত মানুষ ও আইনরক্ষা বাহিনীর এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে নৃশংসভাবে ঘটে এই হত্যাকাণ্ড। সম্ভবত, সেখান থেকেই ‘চাপাতি’ নামক বস্তুটির ব্যবহার এবং বিস্তার লাভ শুরু। কিন্তু এই ‘শুরু’-র শেষ কোথায়, সেটা কেউ জানে না। জানি না আমরা।

গত ১ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হয় আরও এক বিভৎস ঘটনা। সেই ঘটনা সম্পর্কে প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা সবাই কম/বেশী জানছি। আমাদের জানায় প্রতি মুহুর্তে যোগ হচ্ছে নতুন তথ্য। এসব তথ্য একটির সাথে অপরটির সাদৃশ্য নেই বললেই চলে। কেউ বলছেন, এটি জঙ্গি তৎপরতা। কেউ বলছেন জেএসবি’র কাণ্ড। কেউ বা বলছেন এটি বিদেশী বা পার্শ্ববর্ত্তী দেশ ভারত ঘটিয়েছে। এই বলা-বলি’র মধ্যেই পার হয়ে গেছে ৩টি দিন। ঘটনার কারণ, এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত। প্রশাসনের বিভিন্ন মহলের তথ্য হরেক রকম। এই দোদুল্যমানতার ফায়দা তুলবে অপরাধীরা। যেমনটি তুলেছে অতীতে।

সম্প্রতি সৌদি আরব সন্ত্রাস দমনে জোট করেছে,তার মধ্যেও বাংলাদেশ আছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী তৎপরতা বেড়েই যাচ্ছে,এর পেছনে যার নাম বেশি শোনা যায় তার নাম সৌদী আরব। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সকলেই ‘সন্ত্রাস দমনে’ ঐক্যবদ্ধ, প্রশ্ন হলো তাহলে সন্ত্রাস করছে কে? সন্ত্রাসী কারা? তাদের পৃষ্ঠপোষক কারা? যে সন্ত্রাস দমনে সকলেই সবরকম আয়োজন করছে সেই সন্ত্রাস ক্রমে আরও বাড়ছে কেন? এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

১ জুলাই এর নৃশংস ঘটনার পর আবারও বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে সন্ত্রাস দমনের কাজ করবার ঘোষণা দিয়েছেন ভারত,যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ। এসব ঘোষণা নতুন নয়। ‘নিরাপত্তা’ বৃদ্ধির নানা কর্মসূচিও গত দেড় দশকে অনেক দেখা গেছে। সন্ত্রাস দমনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিবিধ চুক্তি করেছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এবিষয়ে বাংলাদেশেরও নানা চুক্তি আছে। আছে নানা কর্মসূচি।

সর্বশেষ জানা তথ্য অনুযায়ী,২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সন্ত্রাসবাদ দমনে সামর্থ্য বাড়াতে বাংলাদেশকে প্রশিক্ষণ সহায়তা,তথ্য বিনিময় এবং অস্ত্র ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। বলা হয়,যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এফবিআই,সিআইএ ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে। ভারতের সাথেও ‘সন্ত্রাস দমনে’ বাংলাদেশের আছে জানা অজানা নানা যৌথ ব্যবস্থা। পাকিস্তান বহুবছর থেকে জানপ্রাণ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘সন্ত্রাস দমন’ করে বেড়াচ্ছে, নানাচুক্তি তো আছেই। ফলাফলে পাকিস্তান এখন সন্ত্রাসের লীলাভূমি।

বাংলাদেশ যে অনিশ্চয়তা,আতংক আর অস্থিরতার মধ্যে পড়েছে তার সাথে দেশের ভেতরের ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি সন্ত্রাস দমনের বৈশ্বিক রাজনীতির সম্পর্ক আছে। ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু হয় বিশ্বজুড়ে।

বিজ্ঞাপন

এর আগেই আফগানিস্তানে সেকুলার সরকার উচ্ছেদ করে মুজাহিদীনদের বসিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারপর এনেছে তালেবানকে। ইরাক, লিবিয়া এই মডেলেই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ১০ লক্ষাধিক নারীপুরুষ শিশু নির্মমভাবে নিহত হয়েছে। নির্যাতন এক অবিরাম বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনে ‘জঙ্গী’ ‘সন্ত্রাসী’ বিভিন্ন বাহিনীকে মদদ দেয়া হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে এসব বাহিনীর বিস্তার ঘটেছে।

বাংলাদেশেও এদের বিস্তার ঘটেছে গত দেড় দশকে। এদের দমনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাস দমন’ মডেলে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। সাথে আছে ভারত,পাকিস্তানও। এই মডেলে প্রবেশের অর্থ যে জঙ্গী ও সন্ত্রাসীর বর্ধিত পুনরুৎপাদন এবং সন্ত্রাসের চিরস্থায়ীকরণ তা আমরা অভিজ্ঞতা থেকেই দেখছি। যে বিষাক্ত বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশ চলছিলো তা এক ভয়াবহ পর্বে প্রবেশ করেছে এখন।

“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে”। এটি একটি প্রবাদ বাক্য।

সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া একেকটা ঘটনা, এবং সেটা প্রশাসনের পাত্তা না দেয়ার প্রবণতা পর্যবেক্ষণে প্রবাদ বাক্যটি মনে পড়লো। ৯ দিনের সরকারি ছুটি যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল, তেমনি ১ জুলাই ঘটে যাওয়া ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম।

আমরা আত্ম-বিশ্লেষণের চেয়ে সমালোচনা এবং পরনিন্দা করতে বেশী স্বাছন্দবোধ করি। এটাই আমাদের সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমাদের ঐক্যের চেয়ে জিঘাংসা বেশী। কাজের চেয়ে বাজে কথা বেশী। আমাদের শত্রু কারা? কি চায় তারা? এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরী। আক্রমণের আগে,নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেয়া জরুরী। সবচেয়ে জরুরী পারস্পারিক সমালোচনা’র ঊর্ধ্বে আত্ম-বিশ্লেষণ।

যে কোন ঘটনা বা দুঘর্টনায় আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করি। আমাদের মন্ত্রীদের প্রতি আস্থা এবং অবিশ্বাসের জায়গাটা সদৃঢ় করেছেন তারা। তাদের বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড। মন্ত্রী পরিষদের পরিবর্তন আবশ্যক। সেটা যতো দ্রুত সম্ভব। আমরা বিশ্বাস করি,আমাদের মাঝে অনেক যোগ্য এবং মেধাবী মানুষ আছেন। যাদের সম্মান করা হয়নি। প্রবঞ্চনার অভিমানে তারা নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। দেশের স্বার্থে,আমাদের স্বার্থে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। ক্ষমা চাইতে হবে।

ইতিহাস কথা বলে। ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে। চাপাতি’র প্রথম আঘাতটি যদি আমরা প্রতিরোধ করতে পারতাম,তাহলে এটির প্রতিকার করা কঠিন হতো না। ‘বিছিন্ন ঘটনা’র মতো আলতু-ফালতু কথা বলে, প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসীদের আড়াল করতে দেখেছি আমরা। জ্ঞাত বা অজ্ঞাতভাবে সন্ত্রাস কর্মকাণ্ডের সুযোগ করে দিতে দেয়া হয়েছে। এর খেসারত আজকের বাংলাদেশ।

একেকটা ঘটনা ঘটে। ২/৪ দিন ফেসবুক উত্তাপ থাকে। ক্রমশ তাপ কমতে থাকে। সপ্তাহ ঘোরার আগেই আমরা ঘটনা ভুলে যাই। দীর্ঘদিনের চেনা এই রীতির পরিবর্তন এনেছিলো শাহবাগ-এর গণজারণ মঞ্চ। বহু প্রতিবদ্ধকতাও এটিকে হারাতে পারেনি। ফলাফলে জাতির কলংক মোচন হয়েছে অনেকাংশে। রাজাকারদের ফাঁসি’র প্রকৃয়ায় গতি বাড়িয়েছে। ৫ রাজাকারের ফাঁসিও হয়েছে। সুতরাং এটি প্রতীয়মান যে, আমরা পারি। আমরা প্রতিবাদ করতে পারি। আমরা জয় ছিনিয়ে আনতে পারি।

২০১৬ সালের ১ জুলাই যে ঘটনাটি ঘটেছে,সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। এই সাংঘাতিক ঘটনার ম্যাসেজ বুঝতে অক্ষম অসাধারণ বিজ্ঞ ব্যক্তিরা। আমরা সাধারণ। সাধারণ বলেই এই ম্যাসেজ আমরা কিছুটা আঁচ করতে পারি। যদিও এর ভয়াবহতা ভাবতে পারছি না। সেটা সম্ভবও না। তবে এটুকু বলা যায়, ভয়াবহ সংকটে পুরো জাতি। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে আমরা। এমন একটা অবস্থায়ও আমরা দেখছি কিছু মানুষের ভেলকীবাজি। রসিকতা এবং তামাশা। এই ঘটনার তাপমাত্রা ফেসবুকে কমতে শুরু করেছে।

কিন্তু তাপ সমান্তরালে বাড়ছে। যে তাপে আমাদের ভস্মীভূত হওয়ার আশংকা শতভাগ। এমন একটা বৈরী পরিস্থিতি-তে প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা। জরুরী সৌহার্দ্য বজায় রাখা। সৌজন্যতা মেনে চলা। এখানে ধরে নিতে হবে, আমরা সবাই টার্গেটে। কেউ আলাদা নয়। কেউ ‘বিছিন্ন’ নয়।

যোগ্য নেতৃত্ব এবং সঠিক দিক নির্দেশনা পেলে আমরা পারবো। আমাদের পারতেই হবে। বুকে সাহস আর মনে বিশ্বাস আমাদের অস্ত্র। আমাদের অহংকার। অস্থিত্ব রক্ষায় এই দুটোকে সহায় করে আমরা লড়বো। আমরা হারবো না। আমরা আবার প্রতি সকালে বলবো গুড মনিং বা সুপ্রভাত কিংবা শুভ সকাল। যে প্রিয় শব্দ গুলো’র ধীরে ধীরে প্রয়োগ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে বা গেছে সেটিকে প্রসারিত করার দায়িত্ব আমাদের!

(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)