চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাংলাদেশের কোনো নেতিবাচক চিত্র আমার কাছে নাই: বিপ্লব

সরকারি অনুদানে সত্য ঘটনা অবলম্বনে জাহিদুর রহমান বিপ্লব নির্মাণ করতে চলেছেন ‘ওমর ফারুকের মা’

স্থির চিত্রের যাদুকর তিনি। ফটোগ্রাফি তার পেশা। সব ধরনের ফটোগ্রাফিতে হাত পাকিয়েছেন। ফটোগ্রাফির জগতে তাকে এক নামে সবাই চেনেন। জানেন। নাম তার জাহিদুর রহমান বিপ্লব। তবে এবার স্থির চিত্র থেকে চলচ্চিত্রের দিকে পা ফেলছেন তিনি। এরইমধ্যে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বিভাগে ‘ওমর ফারুকের মা’ নামের একটি ছবির জন্য ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে সরকারি অনুদানও পেয়েছেন। সত্য ঘটনা অবলম্বনে ছবির কাহিনি। লোকেশন পিরোজপুরে। শিগগির শুরু করবেন ছবির কাজ। এখন চলছে প্রি-প্রোডাকশন। তার আগে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন বিপ্লব। যেখানে উঠে এসেছে তার ফটোগ্রাফি ভাবনাকে কীভাবে চলচ্চিত্রে কাজে লাগাবেন সেই প্রসঙ্গ। এছাড়াও তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে বোঝাপড়া নিয়েও কথা বলেছেন:

মডেল ফটোগ্রাফিতে আপনার নাম ডাক বেশি। শোবিজ অঙ্গনের সাথে থাকতে থাকতেই কি সিনেমায় নামার ইচ্ছে হলো?
প্রথমে বলে নেই, আমি মডেলিং ফটোগ্রাফি, ফ্যাশন, গ্ল্যামার সব ধরনের ফটোগ্রাফিই আমি করি। কিন্তু আমার আইডেন্টিটিটা কখনো মডেল ফটোগ্রাফার হিসেবে ফুটিয়ে তুলতে চাই না। মানে নিজেকে এরকম জায়গায় নিতে চাই না। আগেও চাইনি, সামনেও চাইবো না।

বিজ্ঞাপন

মডেল ফটোগ্রাফি বা গ্ল্যামার ফটোগ্রাফির জগতে এমন কোনো নেতিবাচক ইমেজ আছে যে কারণে আপনি এই পরিচয় বহন করতে চাইছেন না? নাকি অন্য কিছু?
না এরকম কিছু না। কোনো ব্যাড ইমেজ বা গুড ইমেজের জন্য না। ফটোগ্রাফি আমার ফুলটাইম প্রফেশন। আমার কিছু কর্পোরেট ক্লাইন্ট আছে। আমি ফটোগ্রাফি বেইজ ডকুমেন্টারি করি, অডিও ভিজ্যুয়াল করি। আমি এক্সিবিউশনের জন্য নেচার ফটোগ্রাফি করি, লাইফস্টাইল করি। ফ্যাশন, গ্ল্যামার বা মডেল ফটোগ্রাফি করি সাধারণত বিজ্ঞাপনের জন্য, ম্যাগাজিনের জন্য। কিন্তু বিষয়টা এরকম না যে আমি শুধু মডেল ফটোগ্রাফিটাই করি। এজন্য শুধুমাত্র এই পরিচয়টা আমি নিতে চাইছি না।

এক্সিবিউশনের কথা বলছিলেন। এ পর্যন্ত কোথায় কোথায় এক্সিবিউশন হয়েছে আপনার ছবির?
এ পর্যন্ত আমার এক্সিবিউশনের সংখ্যা ১৪টি। গ্রুপ ও সলো মিলিয়ে বলছি কিন্তু। এরমধ্যে আমার নেচার ফটোগ্রাফি, মানে যার মধ্যে আমাদের লাইফস্টাইল, আমাদের ল্যান্ডস্কেপ, আমাদের ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি রয়েছে। এই ধরনের ফটোগ্রাফির কালেকশান আমার কাছে এক লাখের উপরে। ঢাকায় বিভিন্ন এক্সিবিউশনে রাখা হয়। এরমধ্যে আমার সলো এক্সিবিউশন হয়েছে মোট তিনটি।

কিন্তু এবারতো স্থিরচিত্র থেকে অস্থিরচিত্রে (চলচ্চিত্র) যাত্রা করছেন। চলচ্চিত্রের পথ কেমন মনে হচ্ছে? আর এই পথেই বা কেন?
গেল সাত-আট বছর ধরে সিনেমার প্রতি ভেতরে ভেতরে আমি পেশনেট। ফিল্ম মেকিংয়ের জায়গায় আসবো এটা গত কয়েক বছরে আমার মধ্যে তৈরি হয়। হ্যাঁ, এটা সত্য যে ফটোগ্রাফি করতে করতেই চলচ্চিত্রের প্রতি ঝুঁকেছি। ছবি তুলতে তুলতে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো নেগেটিভ চিত্র আমার কাছে নাই। স্থিরচিত্রেতো আমি দেখিয়েছি সেটা, চলচ্চিত্রে সেটা দেখাতে পারলে সেটা আরো বেটার। সেই ভাবনা থেকেই মূলত চলচ্চিত্রের প্রতি আরো পেশনেট হই। কারণ চলচ্চিত্র এখন একটি বড় প্লাটফর্ম।

মানে বাংলাদেশকে ইতিবাচক ভাবে তুলে ধরতেই স্থিরচিত্র থেকে চলচ্চিত্রের দিকে পা বাড়ালেন। তাইতো?
হ্যাঁ। এই সত্যতো আছেই। কেননা, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যারা বিখ্যাত ফটোগ্রাফার রয়েছেন তাদের ছবি যদি গুগল করেন তাহলে দেখবেন যে ছবিগুলো তাদের পরিচয় বহন করছে বা যে ছবিগুলোর জন্য তারা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সেই ছবিগুলোর বেশির ভাগই ঢালাওভাবে নেগেটিভলি বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে। মানে আমি বলতে চাইছি, যারা এই মুহূর্তে দেশের বাইরে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফারের প্রতিনিধিত্ব করছেন তাদের বেশির ভাগ ছবি শুদ্ধ, সত্য বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে বলে আমার জানা নাই। নেগেটিভ বাংলাদেশকেই বেশি প্রতিনিধিত্ব করতে দেখি।

নেগেটিভ বাংলাদেশ বলতে কী বুঝাতে চাইছেন? দারিদ্র‌্যতা, সংগ্রাম মানে সেম্পেথিকে পুঁজি করছেন তারা, এরকম বলতে চাইছেন?
সেলেব্রেটি ফটোগ্রাফারদের নাম দিয়ে বা তাদের কাজ দিয়ে যদি কেউ গুগল করেন তাহলে দেখবেন বেশির ভাগ ছবিই ছেড়া ফাটা দৈনতা হত-দরিদ্র জেলে রিক্সাওয়ালা রেলগাড়ি গ্রামের টিপিক্যাল চিত্র। লাইফস্টাইল ফটোগ্রাফি বলতে কি শুধু সাধারণ মানুষের দারিদ্রটাই মুখ্য! আমি এগুলোকে বাংলাদেশের নেগেটিভ চিত্রই বলি। বাংলাদেশে এখন আঠারো বা বিশ কুটি মানুষ, এখন তাদের সবাইতো আর রিক্সাওয়ালা বা ঠেলাওয়ালা না।

পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশে দারিদ্র‌্যতা আছে। কম আর বেশি। প্রত্যেকটা দেশের ভালগার বিষয় আছে। কই আমরাতো অন্য দেশের দারিদ্র‌্যতা দেখি না। আপনি যদি অন্য দেশের ফটোগ্রাফি নিয়ে গুগলে সার্চ দেন তাহলে সেই দেশের সৌন্দর্য আর ইতিবাচক রূপটাই দেখবেন। কিন্তু বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে শুধু ব্যতিক্রম। বাংলাদেশ লিখে গুগলে কেউ সার্চ দিলে নেতিবাচক রূপটাই আগে আসে। আর এটা হয়েছে আমাদের ফটোগ্রাফারদের বদৌলতেই।

আচ্ছা। আপনার চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার দিকে ফিরে আসি…
হ্যাঁ। কেন আমি চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে ঝুঁকলাম এটা বলি…। আসলে আমি ভেবে দেখেছি, চলচ্চিত্রও আমাদের লাইফস্টাইলকে ক্যারি করে না। আমাদের লাইফস্টাইল আমাদের চলচ্চিত্রে আসে না। বাংলাদেশেরতো একটা নিজস্বতা আছে, কিন্তু সেটা আমাদের চলচ্চিত্রে মিসিং। সর্বশেষ বাংলাদেশের যে কয়টা ভালো ছবি নির্মাণ হয়েছে, ব্যবসা করেছে এগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব চলচ্চিত্রগুলো করছে না। যে চরিত্রগুলো সিনেমায় আমরা দেখি এগুলো কি আমাদের সমাজে এক্সিস্ট করে? না, করে না। এসব কারণেই আমার মনে এক ধরনের ক্ষোভ, যন্ত্রণা আছে দেশ কেন্দ্রিক। আর এ কারণেই বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে এমন একটা চলচ্চিত্র আমিই করবো এরকম ভাবতে থাকলাম, কারণ আমি জানি চলচ্চিত্র খুব বড় প্লাটফর্ম। সেই ভাবনা থেকেই ছোট পরিসরে ‘ওমর ফারুকের মা’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির স্ক্রিপ্ট জমা দিয়েছিলাম অনুদানের জন্য। চলচ্চিত্রটির মূল গল্প নাট্যকার মাসুম রেজার।

আপনি বার বার বলছেন দেশকে পজিটিভলি রিপ্রেজেন্ট করার কথা। কিন্তু স্থিরচিত্র দিয়েওতো দেশকে ইতিবাচক ভাবে বিশ্বে তুলে ধরা সম্ভব?
সেটা সম্ভব। একটি স্থিরচিত্রও কখনো কখনো হাজারটা কথা বলার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কখনো কখনো ফিজিক্যালি কথা বলার প্রয়োজন হয়। আমি যা বিশ্বাস করি, যা লালন করি বা আমার ভেতরে যে ক্ষোভ, যন্ত্রণা, ক্রাইসিস রয়েছে তা দেখানোর জন্য আমি চলচ্চিত্রকেই বড় প্লাটফর্ম হিসেবে দেখছি।

আমার কাছে মনে হয়েছে একটা ছবি(ফটোগ্রাফ) দিয়ে আমি যতোটা না বেশি মানুষের কাছে যেতে পারবো তারচেয়ে ঢের বেশি মানুষের কাছে আমি চলচ্চিত্রে মাধ্যমে পৌঁছাতে পারবো। ইটস অ্যা বিগ প্লাটফর্ম।

আপনার চলচ্চিত্রে মধ্য দিয়ে কী ধরনের গল্প দেখাতে চাইছেন?
পিরোজপুর মুক্তি যুদ্ধের একটা খণ্ড চিত্র। একজন মা ও তার শহীদ সন্তানের গল্প দেখাবো। যে মা তার শহীদ সন্তানের জন্য গত ৪৭/৪৮ বছর ধরে অপেক্ষা করছে। তিনি বিশ্বাস করে বসে আছেন যে, তার ছেলে যুদ্ধ থেকে ফিরে আসবে। এটা একদম সত্য ঘটনা। ওমর ফারুক নামের এক ছেলে, ১৯৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একদিন ঘর থেকে বের হয়ে যায় সে। তার মা তাকে খেয়ে যেতে বলেছিলো। কিন্তু মা’কে সে বলেছিলো ফিরে এসে খাবে। কিন্তু তার আর খাওয়া হয় না। ওই রাতেই সে মারা যায়। তার মারা যাওয়াটাও খুব প্যাথেটিক। যেদিন সে ধরা পড়ে সেদিন তার কাছে পাক বাহিনী স্বাধীন বাংলাদেশের সাতটা পতাকা পায়। একটা পতাকা তার মাথায় হাতুরি পেটা করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। তাকে মেরে সেদিনই কীর্তন খোলা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়। কিন্তু তার মা বিশ্বাস করেন তার ছেলে ফিরবে। যুদ্ধের সময় থেকে সেই মা একইভাবে ছেলের পথ চেয়ে থাকে। এরকম একটা গল্পকে উপজিব্য করে তৈরি হয়েছে আমার স্ক্রিপ্ট।

শহীদ ওমর ফারুকের মা কি এখনো জীবীত আছেন? তার সাথে কি আপনার দেখা হয়েছে?
হ্যাঁ। তিনি এখনো পিরোজপুরে আছেন। তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কিছুটা অস্বাভিক অবস্থায় আছেন। রেসপন্ডিং না। তারপর আমি তার সাথে কথা বলেছি, ফুটেজ নিয়েছি।

আপনার ও আপনার চলচ্চিত্রের জন্য শুভ কামনা…
আপনাকে ও চ্যানেল আই অনলাইনকে ধন্যবাদ।