চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বাণিজ্যিকভাবে সফল অসাধারণ একটি প্রকল্প: মোস্তাফা জব্বার

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের জন্ম ১৯৪৯ সালের ১২ আগষ্ট। তিনি বাংলাদেশি একজন তথ্য প্রযুক্তিবিদ। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস, বেসিস এর সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি, বিসিএস এর সাবেক সভাপতি। তাকে কম্পিউটারে বাংলা ভাষা যুক্ত করার পথ প্রদর্শক মনে করা হয়। তার প্রতিষ্ঠানের বিজয় বাংলা কি-বোর্ড ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত হয়। যা প্রথম বাংলা কি-বোর্ড এবং ইউনিকোড আসার পূর্ব পর্যন্ত বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি ও সাধারণ বিষয়ের ওপর অনেকগুলো বইয়ের লেখক মোস্তাফা জব্বার।

বিজ্ঞাপন

তার পৈতৃক নিবাস নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুরী থানার কৃষ্ণপুর গ্রামে। ১৯৪৯ সালের ১২ই আগষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানার চর চারতলা গ্রামে নানা বাড়ীতে তার জন্ম। মোস্তাফা জব্বারের বাবা আব্দুল জব্বার তালুকদার পাটের ব্যবসায়ী ও অবস্থা সম্পন্ন কৃষক ছিলেন। দাদা আলিমুদ্দিন মুন্সি ছিলেন বিশাল ভূ সম্পত্তির মালিক- তার উপাধি ছিলো তালুকদার। তার মা রাবেয়া খাতুন সমগ্র জীবন গৃহিনী হিসেবেই জীবন যাপন করেছেন। মোস্তাফা জব্বারের দাদা ও বাবা প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের প্রাইমারি স্কুল থেকে তিনি ১৯৬০ সালে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষা সম্পন্ন করেন। কিন্তু তার নিজ গ্রামে বা তার গ্রামের আশেপাশে এমনকি পঁচিশ কিলোমিটারের মধ্যে কোন হাই স্কুল ছিলো না বলে তিনি হাই স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছিলেন না।

বাবা-মা এবং নিজের কঠোর ইচ্ছাশক্তির কারণে গ্রামের বাড়ীর ২৫ কিলোমিটারের বেশি দূরের তৎকালীন সিলেট জেলার বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিরাট নামক একটি গ্রামের হাই স্কুলে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে হবিগঞ্জ কেন্দ্র থেকে মানবিক শাখায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন। এরপর তিনি মানবিক শাখায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন। সেই বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৭২ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

এই পরীক্ষাটি ১৯৭১ সালে হওয়ার কথা ছিলো। ৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পরীক্ষা হলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে পরে সেটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালের পরীক্ষা ১৯৭৪ সালে সম্পন্ন করে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য চর্চা, সাংবাদিকতা, নাট্য আন্দোলন- এসবের সাথে ব্যাপকভাবে জড়িত ছিলেন। ৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তার লেখা বাংলাদেশের প্রথম গণনাট্য ‘এক নদী রক্ত’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে মঞ্চস্থ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্যতম নেতা ছিলেন।

১৯৭৩ সালে তিনি ছাত্রলীগের পক্ষে নির্বাচন করে সূর্যসেন হলের নাট্য ও প্রমোদ সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার আগে তিনি সাপ্তাহিক জনতা পত্রিকায় লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে মোস্তাফা জব্বার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি মুজিব বাহিনীর খালিয়াজুরি থানার সহ অধিনায়ক ছিলেন। তার বাড়ীর পাশের সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ১৬১ জন রাজাকার যুদ্ধোত্তরকালে তার কাছে আত্মসমর্পণ করে যার মধ্যে ১০৮ জনকে মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করে। ছাত্র থাকাকালেই মোস্তাফা জব্বারের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে।

সেই সময়ে তিনি সাপ্তাহিক গণকণ্ঠ পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজে যোগ দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ পত্রিকাটি দৈনিকে পরিণত হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গণকণ্ঠ পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হতো এবং সেই সময়ে প্রকাশিত পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা পর্যন্ত তিনি তাতে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নির্বাচিত হন। গণকণ্ঠ বন্ধ হয়ে যাবার পর তিনি ট্রাভেল এজেন্সি, মুদ্রণালয়, সংবাদপত্র ইত্যাদি ব্যবসায় যুক্ত হন। ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ- আটাব এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

১৯৮৭ সালের ২৮শে এপ্রিল মেকিন্টোস কম্পিউটারের বোতাম স্পর্শ করার মধ্য দিয়ে কম্পিউটার ব্যবসায় প্রবেশ করেন। সেই বছরের ১৬ মে তিনি কম্পিউটারে কম্পোজ করা বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা আনন্দপত্র প্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি প্রকাশ করেন বিজয় বাংলা কী বোর্ড ও সফটওয়্যার। সেটি প্রথমে মেকিন্টোস কম্পিউটারের জন্য প্রণয়ন করেন। পরে ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ উইন্ডোজ অপারেটিং সিষ্টেমের জন্যও বিজয় বাংলা কী বোর্ড ও সফটওয়্যার প্রকাশ করেন। তিনি দেশের সংবাদপত্র, প্রকাশনা ও মুদ্রণ শিল্পের ডিটিপি বিপ্লবের অগ্রনায়ক। আনন্দ প্রিন্টার্স এবং আনন্দ মুদ্রায়ণের প্রতিষ্ঠাতা।

তার হাতেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল বাংলা নিউজ সার্ভিস আনন্দপত্র বাংলা সংবাদ বা আবাস। তিনি এর চেয়ারম্যান ও সম্পাদক। ইতিপূর্বে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির নির্বাহী পরিষদের সদস্য, কোষাধ্যক্ষ ও সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বেসিস এর প্রতিষ্ঠাতা সহ সভাপতি ও পরিচালক এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। ২০০৮-০৯ সময়কালে তিনি দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০-১১ সালে তিনি তৃতীয় বারের মতো বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ মে-১৩ সময়কালে তিনি এই সমিতির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১লা জুন ২০১৩ থেকে ৩১ মার্চ ২০১৪ পর্যন্ত তিনি আবার চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমানে ২০১৪-১৫-১৬ তিনি বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির উপদেষ্টা। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সসহ বিভিন্ন সংস্থায় যুক্ত আছেন। তিনি ২০১৪-১৫-১৬ সময়কালে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সাংষ্কৃতিক ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। নেত্রকোণা জেলা সমিতির উপদেষ্টা। তিনি নেত্রকোণা যুব সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশে কম্পিউটারের শুল্ক ও ভ্যাট মুক্ত আন্দোলনের অগ্রণী নেতা ও শিক্ষায় কম্পিউটার প্রচলনের একনিষ্ঠ সাধক মোস্তাফা জব্বার এখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক অনেক কমিটির সদস্য। তিনি কপিরাইট বোর্ড এবং বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটির সদস্য। ২০০৭ সালের ২৬ মার্চ তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণা সম্পর্কে প্রথম নিবন্ধ লেখেন এবং তার দ্বারাই ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার লিপিবদ্ধ হয়। এই ধারাবাহিকতায় ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশ সরকার এখন সেই প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণা বাস্তবায়ন করছে।

তিনি কম্পিউটার বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন। দেশের কম্পিউটার বিষয়ক পত্রিকাসমূহে ব্যাপকভাবে লেখালেখিতে ব্যস্ত মোস্তাফা জব্বার নবম ও দশম শ্রেণীর কম্পিউটার বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা বইটির লেখক। তার লেখা “কম্পিউটার ও ইনফরমেশন টেকনোলজি” এবং “একাউন্টিং ইনফরমেশন সিষ্টেম” স্নাতক পর্যায়ের পাঠ্য বই। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের “তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি” বই এর লেখক তিনি। এছাড়াও উচ্চ মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা, প্রাথমিক কম্পিউটার শিক্ষা, মাল্টিমিডিয়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও তার লেখা কম্পিউটারে প্রকাশনা, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, মাইক্রোসফট এক্সেল ও তার সম্পাদিত কম্পিউটার অভিধান ব্যাপক প্রচলিত কম্পিউটার বিষয়ক বই।

তার প্রথম উপন্যাস ‘নক্ষত্রের অঙ্গার’ ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে। সুবর্ণে শেকড় নামে আরেকটি উপন্যাস তিনি লিখছেন। এছাড়াও কম্পিউটার কথকতা, ডিজিটাল বাংলা, একুশ শতকের বাংলা, বাঙ্গালী ও বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং একাত্তর ও আমার যুদ্ধ তার লেখা বইগুলোর অন্যতম। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখা এবং বিজয় বাংলা কীবোর্ড ও সফটওয়্যার আবিষ্কার করার জন্য তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সেরা সফটওয়্যারের পুরষ্কার, পশ্চিমবঙ্গের কমপাস কম্পিউটার মেলার সেরা কমদামী সফটওয়্যারের পুরষ্কার, দৈনিক উত্তরবাংলা পুরষ্কার, পিআইবির সোহেল সামাদ পুরষ্কার, সিটিআইটি আজীবন সম্মাননা ও আইটি এওয়ার্ড, বেসিস আজীবন সম্মাননা পুরষ্কার, বেষ্টওয়ে ভাষা সংস্কৃতি পুরষ্কার, বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদ সম্মাননা, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি ও সিলেট শাখার সম্মাননা বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার আবিষ্কারক উদ্যোক্তার স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়ন সংস্থার নেত্রকোণার গুনীজন সম্মাননা, রাহে ভান্ডার এনোবল এওয়ার্ড ২০১৬ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে এবং এসোসিও ৩০ বছর পূর্তি সম্মাননাসহ ২০টি পুরষ্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও তার রয়েছে অসংখ্য শুভেচ্ছা সম্মাননা।

মোস্তাফা জব্বারশিক্ষানুরাগী মোস্তাফা জব্বার তার নিজ গ্রামে বাবা প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলের সম্প্রসারণ করেছেন, বাবা-মায়ের নামে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং গ্রামের হাজী আলী আকবর পাবলিক ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে কম্পিউটার শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন ও কম্পিউটার স্বাক্ষরতা প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। দেশজুড়ে মাল্টিমিডিয়া প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা ছাড়াও তিনি বিজয় ডিজিটাল স্কুল এবং আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুলের সাহায্যে শিক্ষাব্যবস্থার নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করেছেন। কম্পিউটারকে শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে একুশ শতকের নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা তার জীবনের লক্ষ্য। তিনি এখন প্রধানত কম্পিউটারে বাংলা ভাষার প্রয়োগ এবং শিক্ষামূলক সফটওয়্যার তৈরীতে ব্যস্ত আছেন। কম্পিউটারে বাংলা লেখার বাণিজ্যিক ক্লোজ সোর্স সফটওয়্যার ‘বিজয়’ এর স্বত্বাধিকারী এবং ‘আনন্দ কম্পিউকার্স’ এর প্রধান নির্বাহী মোস্তাফা জব্বার ৪ঠা এপ্রিল ২০১০ তারিখে দৈনিক জনকন্ঠের একটি নিবন্ধে অভ্রর দিকে ইঙ্গিত করে দাবী করেন যে হ্যাকাররা তার ‘বিজয়’ সফটওয়্যারটি চুরি করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

তিনি অভ্র কী বোর্ডকে পাইরেটেড সফটওয়্যার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ইউএনডিপি হ্যাকারদের সহযোগিতা করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইউএনডিপি-র প্ররোচণাতেই জাতীয় তথ্যভাণ্ডর তৈরীর কাজে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে অভ্র কী বোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। মেহেদী হাসান খান জানান যে, ক্লোজড সোর্স প্রোগ্রাম হ্যাক করা সম্ভব নয় বিধায় বিজয়ের সিষ্টেম হ্যাক করা সম্ভব নয়। অপরদিকে, অভ্র’র পক্ষ থেকে মেহদী হাসান খান সকল নালিশ অস্বীকার করেন এবং অভিযোগ করেন যে, জব্বার সাহেব বিভিন্ন পর্যায়ে ও গণমাধ্যমে তাদেরকে চোর বলেন এবং তাদের প্রতিবাদ সেখানে উপেক্ষিত হয়। কম্পিউটারে বাংলা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের জন্য উকিল নোটিশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে আক্রমণের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ করা স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।

তিনি আরো বলেন যে, নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয় পত্র প্রকল্পে বাণিজ্যিক বিজয় এর পরিবর্তে বিনামূল্যের অভ্র ব্যবহার করাতে প্রায় ৫ কোটি টাকা লোকসান হওয়ায় জব্বার সাহেব এমন অভিযোগ করেছেন। অভ্র ৪.৫.১ সফটওয়্যারের সাথে ইউনিবিজয় নামে একটি কীবোর্ড লে আউট সরবরাহ করা হয়। এই ইউনিবজয় কীবোর্ড লে আউট প্যাটেন্টকৃত বিজয় কী বোর্ড লে আউটের নকল দাবী করে মোস্তাফা জব্বার কপিরাইট অফিসে কপিরাইট আইন ভঙ্গের জন্য মেহেদী হাসান খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর ভিত্তিতে কপিরাইট অফিস মেহেদী হাসান খানকে কারণ দর্শাও নোটিশ পাঠায়। পরবর্তিতে মেহেদী হাসান খানের আবেদনের প্রেক্ষিতে এর সময়সীমা ২৩ মে ২০১০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ১৬ জুন ২০১০ তারিখে ঢাকার আগারগাঁও এ অবস্থিত বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল অফিসে অনেক তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মেহদী হাসান খান ও মোস্তাফা জব্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয় এই মর্মে, ২০ আগষ্ট, ২০১০ এর মধ্যে, অভ্র কীবোর্ড সফটওয়্যার থেকে ইউনিবিজয় লে আউট সরিয়ে নেয়া হবে এবং কপিরাইট অফিস থেকে মেহদী হাসান খানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত কপিরাইট লংঘনের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। সেই চুক্তি অনুযায়ী, অভ্রর ৪.৫.৩ সংস্করণ থেকে ইউনিবিজয় কীবোর্ড বাদ দেওয়া হয়।

তিনি অভ্র কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানান। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ তারিখে গুগল প্লে স্টোরে উন্মুক্ত করা হয় বিজয় বাংলা সফটওয়্যারের অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণ। এরপর এই অ্যাপটি নিয়ে তার ফেসবুক দেয়ালে একটি স্ট্যাটাস দেন মোস্তাফা জব্বার। সেই স্ট্যাটাসে এই জাতীয় অ্যাপগুলোর বিরুদ্ধে বিজয় বাংলা কি বোর্ড লে আউট অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে গুগলের পক্ষ থেকে রিদমিক এবং ইউনিবিজয় কীবোর্ডের ডেভেলপারের কাছে পৃথকভাবে ই মেইল নোটিশ পাঠানো হয়।

সেখানে বলা হয়, মোস্তাফা জব্বার অ্যাপ দুটির বিরুদ্ধে কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ জানিয়েছেন গুগলের কাছে। আর এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গুগল যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে অ্যাপ দুটি অপসারণ করেছে। পরে নতুন লে আউট করে প্লে ষ্টোরে আবারও রিদমিক কি বোর্ড প্রকাশ করা হয়। এইভাবে নানা সংগ্রাম এবং ঘাত প্রতিঘাতের মাধ্যমে কম্পিউটারে বাংলা লেখার প্রচলন করেন মোস্তাফা জব্বার। তিনি একজন দূরদর্শী এবং স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ। গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র আর সাংবাদিকতার মাধ্যমে জীবন শুরু করেও স্বীয় মেধা, মনন ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে বারবার অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের এই সময়ের অন্যতম সেরা তথ্য প্রযুক্তিবিদ। আর তাইতো তার স্বীকৃতি পেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী পরিষদে স্থান পেয়ে। ২ ডিসেম্বর ২০১৮ বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোস্তাফা জব্বার। টেকনোক্রাট হিসেবে তাকে দেওয়া হয়েছে ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের পরীক্ষামূলক সম্প্রচার এবং এর সবশেষ অগ্রগতি নিয়ে তিনি একটি বিশেষ সাক্ষাতকার দেন। তার সাক্ষাতকার নিয়েছেন রাজু আলীম

প্রশ্ন: সাফ ফুটবলের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরুর পরে বাণিজ্যিতভাবে যাত্রা শুরু করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট- আপনাদের পরিকল্পনা কী?

মোস্তাফা জব্বার: ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পুরো দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই, আমার এই কর্মকাণ্ডের সাথে যারা যুক্ত ছিলেন সবাইকে অভিনন্দন জানাই। বাংলাদেশ টেলিভিশন যাদের সহায়তায় আমরা এই সম্প্রচার করতে পেরেছি তাদেরকে অভিনন্দন জানাই। সবচেয়ে বেশি অভিনন্দন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার নির্দেশে একেবারে বস্তুতপক্ষে প্রায় অসম্ভব সেই কাজটি আমরা সম্পন্ন করেছি। অনেকেই জানেন না যে, বাংলাদেশের এই স্যাটেলাইটটি অর্জন করার পেছনে একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং এই ইতিহাসের শুরু ১৯৭৩ সালে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্টারন্যাশনাল টেলিকম ইউনিয়নের সদস্য পদ গ্রহণ করেন। বেসিক্যালি সেই সময় আমাদের এই রকম যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, সেই সময় চাঁদা দিয়ে সদস্য নেবে এটা কল্পনার ভেতরেও ছিল না। বঙ্গবন্ধু সেই দুঃসাহসি কাজটি করেন। তার চাইতে জরুরী যে কাজটি করেন ১৯৭৫ সালের ১৪ ই জুন তিনি বেতবুনিয়ায় একটি ভূ- উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করেন যা স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড ষ্টেশন হিনেবে পরিচিত। এটি করার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত করার কাজ করেন এবং বস্তুত তা ওই আকাংখাটি প্রকাশিত হয় যে, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট সম্প্রচারের যুগে প্রবেশ করতে পারে। এরপরে বঙ্গবন্ধু হত্যার দীর্ঘ দিন একুশ বছর এ নিয়ে কেউ আলোচনা করেনি কথাবার্তা বলেননি এবং বাংলাদেশ স্যাটেলাইট দিয়ে কী করবে এমন অ্যাটিচিউড কাজ করেছে।

গরীবের ঘোড়া রোগ এই সব বাংলাদেশের মত দেশের তো দরকার হতে পারে না। ১৯৯৬ সালে যখন আজকের প্রধানমন্ত্রী সরকার গঠন করেন প্রথমবারের মত তখন ১৯৯৭ সালে তিনি একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন যে, বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট দরকার। তার গঠন করা একটি টাষ্কফোর্স ছিল তাকে আমরা জেআরসি কমিটি নামে চিনি। সেই জেআরসি কমিটির মেম্বারও আমি ছিলাম। আমরা ওই কমিটি থেকে অনুভব করি যে, আমাদের আসলে যদি তথ্য প্রযুক্তিতে সামনে যেতে হয় তাহলে অবশ্যই আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট লাগবে। কারণ, তখন স্যাটেলাইট ছাড়া বেসিক্যালি ইন্টারনেট অসম্ভব ছিল। আমরা ইন্টারনেটের যুগে যদি থাকতে চাই তাহলে সেটা দরকারি হবে এবং যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ভি স্যাট স্থাপন করে তারপরে বিদেশী স্যাটেলাইট ভাড়া করে চলার প্রশ্ন আছে। ১৯৯৭ সালে তিনি একটি প্রকল্প গ্রহণ করেন। সেই প্রকল্পের জন্যে জাপানী সহায়তা নিশ্চিত হয় এবং এটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর্যায়ে যখন যায় তখন ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তিত হয়। অবভিয়াসলি অন্য সকল ক্ষেত্রে যা ঘটেছে এখানেও তাই ঘটেছে নতুন সরকার জামায়াত বিএনপি সরকার এসে এই প্রকল্পটি একেবারে ফাইল বন্দী করে রেখে দেয়। ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এটাকে আবার উন্মোচন করেন এবং আমার কাছে যেটি বিষ্ময়কর মনে হয়েছে যেটি তিনি কেবলমাত্র একটি নিজস্ব স্যাটেলাইটের কথা চিন্তা করেছেন তাই শুধু না, তিনি এই স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সর্বশেষ যে ধারা আছে সেটিকে গ্রহণ করেছেন।

আমরা যে স্যাটেলাইটটি তৈরী করেছি এটি কিন্তু পৃথিবীর স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সর্বশেষ ধারা। এমনকি আমরা যে রকেটটি দিয়ে উৎক্ষেপন করেছি সেটিও রকেটের ক্ষেত্রে সবশেষ ধারা এবং এটি প্রথম আমাদের স্যাটেলাইটকে আকাশে উৎক্ষেপন করেছে। এই রকেটের একটি বৈশিষ্ট্য হলো অন্য রকেটগুলো উৎক্ষেপন করে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। কিন্তু আমাদেরটি ফিরে এসেছে।

প্রশ্ন: ফ্যালকন নাইনের কথা বলছেন?

মোস্তাফা জব্বার: হ্যাঁ, এবং সেটি আবার রি-ইউজঅ্যাবল রকেট হিসেবে কাজ করেছে। এই দিক দিয়ে আমরা যেটি বুঝি তা হলো- আমাদের অসাধ্য সাধন জাতীয় গর্বে পরিণত হয়েছে। আমরা পৃথিবীর ৫৭তম দেশ এই স্যাটেলাইটের অধিকারী এবং এটির প্রয়োজনীয়তার জায়গাটি কিন্তু আসলে ওই যে ’৯৭ সালে আমরা যেটি দেখেছিলাম, তা এখন আরও বেড়েছে। কারণ আমরা এরই মধ্যে এমন অবস্থার মধ্যে পৌছেছি যে, এই যুগটাই ইন্টারনেটের আর যখন প্রাকটিক্যালি যখন কোন প্রাইভেট চ্যানেল ছিল না তখনকার অবস্থার তুলনায় আজকে বস্তুত একটি বিশাল স্যাটেলাইট মিডিয়া যুগ তৈরী হয়ে গেছে এবং আমাদের এই স্যাটেলাইট মিডিয়াগুলো তাদের প্রত্যেকটি কোন না কোন বিদেশী স্যাটেলাইট ভাড়া করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করে এবং তার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এটার রিস্ক যে জায়গায় আছে তা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা দেওয়া নয়। আমি আমার জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমকে যদি অন্যের উপরে নির্ভরশীল রাখি তাহলে এমন কোন সময় আসতে পারে যখন এটি আমার বিপক্ষে ব্যবহৃত হতে পারে এবং সেই কারণেই আমার নিজস্ব স্যাটেলাইট দিয়ে আমি আমার জাতীয় গণমাধ্যমেকে ব্যবহার করবো সেটাই আসলে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এবং এটি যেহেতু আমাদের সম্প্রচার মাধ্যম কেন্দ্রীক স্যাটেলাইট সেই কারণে আমরা এই যে পরীক্ষামূলকভাবে এই যে আমরা সাফ ফুটবল দেখাতে পারলাম তা আমাদের জন্যে একটি গর্বিত অর্জন। পুরো জাতি এটি নিয়ে গর্ব করতে পারে যে, আমরা এই রকম একটি জায়গায় গিয়েছি যেটি আমি শুরুতে উল্লেখ করতে চাই আমরা ভাগ্যবান যে, এখনো পর্যন্ত স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন থেকে জনগণকে এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এই সম্প্রচার করা পর্যন্ত কোন ত্রুটি পাইনি আমরা। কোথাও আমাদের কোন ত্রুটি বা মেরামতের দরকার পড়েনি।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: তার মানে আমরা সফল উৎক্ষেপণ এবং সফলভাবে সিগন্যাল পাওয়ার পরে সফলভাবে সম্প্রচারও শুরু হলো?

মোস্তাফা জব্বার: করেছি এবং যখন শুরু করেছি এবং তখন থেকে আমরা সিগন্যাল পাওয়া শুরু করেছি। আমি আরেকটি জাতীয় গর্বের কথা বলি। সেটি হচ্ছে যে, আমরা কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞান চর্চা করি না। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এই ব্যবস্থাও নাই। আমি প্রথম যখন এই সজীব ওয়াজেদ ভু-উপগ্রহ কেন্দ্রে যাই তখন আমার মনের মধ্যে এই প্রশ্নটা ছিল- স্যাটেলাইট তো বিদেশ থেকে বানিয়ে নিয়ে আসলাম? বিদেশ থেকে এটি উৎক্ষেপনও করে দিলাম? আমার এটি নিয়ন্ত্রণ করবে কে? আমার ধারণা ছিল আমাদেরকে বিদেশী ভাড়া করে নিয়ে এসে দীর্ঘ দিন তাদেরকে রাখতে হবে, তারা এটা নিয়ন্ত্রণ করবে। তখন আমরা যেতে পারবো।

প্রশ্ন: এই প্রশ্নটা অনেকেরই আছে?

মোস্তাফা জব্বার: কিন্তু আপনি শুনলে খুশি হবেন-আমরা আমাদের ৩০ জন ছেলেমেয়েকে নিয়েছি এবং ফরাসি তিন ভদ্রলোক তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এখানে। এদের মধ্যে মহাকাশ নিয়ে লেখাপড়া করেছে এই রকম কেউ নাই। ইঞ্জিনিয়ারিং বা অন্যান্য ডিসিপ্লিন থেকে তারা এসেছে। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন ওই ফরাসি ভদ্রলোক যারা ট্রেইনার তাদেরকে জিঙ্গেস করেছিলাম যে, তোমরা তো এদেরকে দিয়ে কাজ করাচ্ছো কিন্তু তোমরা চলে গেলে কী হবে?

তারা বলল- আমরা তিন বছর থাকবো, তোমার এতো ভয়ের কিছু নাই। তবে তোমার জন্যে জানার বিষয় এটা- তোমার এই ছেলেমেয়েরা আমাদেরকে ছাড়া এখন কাজ করতে পারে। এটি আমাদের জাতিগতভাবে গর্ব করার বিষয় যে, আমাদের ছেলেমেয়েরা কী পরিমাণ মেধাবী! কয়েক মাসের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এটি নিয়ন্ত্রণ করা ক্ষমতা রাখে এবং এর মধ্য থেকে দেখেছি বহুজন বিদেশে চাকরির অফার পেয়েছে, স্কলারশীপের অফার পেয়েছে।

তার মানে ছেলেমেয়েগুলোকে একটু যদি আমরা সহায়তা করি তাহলে কিন্তু তারা বড় কিছু করতে পারে। আমরা যখন এটি উৎক্ষেপণ করি প্রধানমন্ত্রী তখন আমাদের বিমান বাহিনীর প্রধানকে বলেন, এখন প্রস্তুতি নেন আমরা স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি আমরা মানুষ পাঠাবো মহাকাশে। এইরকম স্বপ্ন দেখা একজন মানুষ তিনি। সেই মানুষটির জন্য কিন্তু আমরা এই সফলতার জায়গায় আসতে পেরেছি।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু কতোটা সুদূরপ্রসারী ছিলেন তা আমরা আপনার এই কথার ভেতর দিয়ে জানতে পারলাম।

মোস্তাফা জব্বার: বেসিক্যালি এইটুকু স্মরণ করিয়ে দেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মত প্রযুক্তি ১৯৭৩-৭৫ সালের মধ্যে আমাদের মত একটি কৃষি প্রধান দরিদ্র দেশ তার মাথায়ই আসার কথা না। কিন্তু তিনি এইরকমভাবে বহুক্ষেত্রে আপনি দেখবেন বঙ্গবন্ধু শুরু করে দিয়ে গেছেন আমরা এখন সেই কাজগুলো সম্পন্ন করছি।

প্রশ্ন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই কথাটি অনেক বলেন-বেশিরভাগ কাজই বঙ্গবন্ধু শুরু করে দিয়ে গেছেন আমরা তার পরের কাজটিই করছি মাত্র।

মোস্তাফা জব্বার: আমি অসাধারণ প্রসঙ্গ টেনে নিতে চাই। বঙ্গবন্ধু ওই সময়ে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। মানে কী পরিমাণ দূরদর্শী হলে একটি মানুষ খাবার যোগাড় করতে পারার যখন সাধ্য থাকে না তখন তিনি শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছেন এটি চিন্তার বাইরে ছিল। এটি আমি একটু বলতে চাই। ওইদিন শিল্পকলার অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম ডাকটিকেট উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতির ওখানে। খোঁজ নিয়ে দেখলাম- শিল্পকলা একাডেমীর সূচনা কে করেছেন? তিনি বঙ্গবন্ধু। এই হচ্ছে সেই মহামানব।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে এক ধরনের সমালোচনা শোনা যায়। এতো খরচ করে এই স্যাটেলাইট বানালাম তা বাণিজ্যিকভাবে কতোটা সফল হবে?

মোস্তাফা জব্বার: আমি একেবারে অফিসিয়াল হিসাব দেই। প্রথমত এটি বাংলাদেশের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা আমরা এই প্রকল্পের যে অনুমিত ব্যয় ছিল সেখান থেকে ২ শত কোটি টাকা সাশ্রয় করেছি। দ্বিতীয়ত হলো- যেই সময়ে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা তার আগেই প্রকল্প শেষ করেছি। আমরা হিসেব করে দেখেছি যে, যে অর্থ রাষ্ট্র থেকে ব্যয় করেছি সেই অর্থ রাষ্ট্রকে ফেরত দেওয়ার জন্যে সর্বোচ্চ আমার ৭ বছর সময় লাগতে পারে। শুধু যেটুকু আমাদের জন্যে ব্যবহার করবো শুধু সেই টুকুর জন্যে অর্থ্যাৎ আমাদের এখনকার যে ক্যাপাসিটি আছে সেই ক্যাপাসিটির কেবল অর্ধেকটা আমাদের দেশের প্রয়োজনে কেবল ব্যবহার করতে পারছি। ওই টুকু থেকে আমার ৭ বছরে ক্যাপিটাল রিটার্ন আসার বিষয় আছে। আমার ক্যাপাসিটি আরও অর্ধেক থেকে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: পনের বছরের আমাদের লাইফ টাইম যেটা?

মোস্তাফা জব্বার: ওই লাইফ টাইমের মধ্যেও। না, ওইটা ১ বছর তো পরে পাচ্ছেন। আমার এখন যে ক্যাপাসিটি আছে তার অর্ধেক ইউজ করছি বাকী অর্ধেকটা কিন্তু আমি বিদেশে বাজারজাত করতে পারছি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারছি এবং সেখান থেকে যে আয় তা যদি ধরি তাহলে কিন্তু আমার ৭ বছরে অর্ধেক হয়ে যাবে। ফলে যারা মনে করছেন যে আমরা গরিবের ঘোড়া রোগের মধ্যে রয়ে গেছি তাদের অন্তত বাণিজ্যিক হিসাবটা বোঝা দরকার যে, এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল অসাধারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ফলে কারও এই দ্বিধা যেনো না থাকে যে, আমরা এখানে টাকা ঢেলে দিয়েছি সেখান থেকে ফেরত আসার কোন কারণ নেই।

একদিক থেকে এটাও সত্য যে, সরকার কেবলমাত্র বাণিজ্য করার জন্যে কোন কাজ করে না। আমরা কিন্তু এখানে এটি কেবল দেশের উপকারের জন্যে করিনি এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল করার জন্যেও করেছি এবং এটি বিশেষ করে আমাদের যে সম্প্রচার মিডিয়া স্যাটেলাইট নির্ভর তারা অনুভব করতে পারবে যে, এটি আসলে তাদের জন্যে কি পরিমাণ সহায়তা করেছে। এটি যেদিন আমরা প্রথম সম্প্রচার শুরু করি সেদিন প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমার দেখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে তার আগের দিন আমরা যখন টেষ্ট করি সেটি তিনি গণভবনে বসে দেখছিলেন এবং তিনি আমাকে বলছিলেন এতো সুন্দর ছবি এতো স্বচ্ছ ছবি এতো চমৎকার- তার মানে হচ্ছে বেসিক্যালি তার গুণগত মানের দিক থেকেও আমরা উন্নত যে কোন স্যাটেলাইট যা দেয় তার চাইতে একটি ভাল অবস্থানের দিকে পৌছেছি।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে স্থাপিত। এই অবস্থানে থেকে বাংলাদেশে যারা সম্প্রচার করেন তাদের জন্যে খুব বেশি নাকি সুবিধার হবে না?

মোস্তাফা জব্বার: আমাদের যদি সুবিধার না হতো তাহলে বাংলাদেশ টেলিভিশনকে দিয়ে পরীক্ষামূলক সম্প্রচারটা এতো সহজে করতে পারতাম না। আপনি খুব অবাক হবেন আমরা মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে এই রকম চিন্তা ভাবনা করে দেখি যে, সাফ গেমস হচ্ছে এবং এটাকে আমরা পরীক্ষামূলক কাজে লাগাতে পারি কিনা? আমাদের কিছু যন্ত্রপাতি দরকার ছিল- সি ব্র্যান্ডের চেয়ে ইনসেট সি ব্র্যান্ডের যন্ত্রপাতিগুলো লাগবে। আমরা এই যন্ত্রপাতিগুলো এনে স্থাপন করে আমাদের যারা স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ার তাদেরকে দিয়ে স্থাপন করে আমরা এমনকি যেদিন সম্প্রচার হয়েছে তার আগের দিন স্থাপন করে আমরা সফল হয়েছি।

আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমাদের এখানে কোন চ্যানেলকে কোন এই ধরণের ১১৯ ব্র্যান্ডে থাকার কারণে যে জটিলতার কথা বলা হয়েছে এইরকম কোনটাই আসলে সত্য নয়। হ্যাঁ, আমরা যেহেতু একটি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছি সেই কারণে পুরনো প্রযুক্তির চাইতে একটু আপগ্রেড করার প্রশ্ন দেখা দেবে। এটি প্রযুক্তি ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক জিনিস। আপনি যখনি নতুন কিছু করতে যান আপডেটেড কিছু করতে হলে নতুন কিছু অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এই সমালোচনার কোন মানেই নেই যে, এটি বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো ব্যবহার করতে পারবে না।

প্রশ্ন: তার মানে আপনারা আশাবাদী বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো আমাদের এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করবে?

মোস্তাফা জব্বার: আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো কেবলমাত্র যে বাংলাদেশের অথবা দেশপ্রেমের জন্যে ব্যবহার করবে সেটি নয়। তার কারণটা হলো আমরা প্রযুক্তি গত দিক থেকে সুপিরিয়র এবং আমরা এটাকে এমনভাবে করবো যাতে তার বাণিজ্যিক দিক থেকে সফলতা দেখা দেয়, তার আর্থিক সাশ্রয় হয় প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে তিনি যেনো আপডেট হতে পারেন। আমরা এমন করছি না যে, ঠিক আছে ভাই- জোর করে তার উপরে আমরা এটা চাপিয়ে দিচ্ছি।

প্রশ্ন : যোগাযোগ তো নিশ্চয়ই হচ্ছে?

মোস্তাফা জব্বার: আমরা ইনফ্যাক্ট ইতিমধ্যেই সবার সাথে আনঅফিসিয়ালি কথাবার্তা বলেছি এবং শুধু তাই নয় বহু সরকারি প্রতিষ্ঠানে কথা বলেছি নৌ মন্ত্রণালয়ের সাথে চুক্তি সাক্ষর করেছি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কথাবার্তা হয়েছে আমাদের কাছে যেটা মনে হয়েছে যে, আমাদের দেশীয় যে ক্যাপাসিটি আছে- এই ক্যাপাসিটিটা আমরা যেদিন চালু করবো তার কাছাকাছি সময়ের ভেতরে আমরা পূরণ করতে পারবো। আমরা শুধু মাত্র এই জায়গাটাতে দিচ্ছি যে, আমি একটা স্যাটেলাইট চ্যানেলকে এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে দেবো তার যে আপডেট করার বিষয় আছে এটি নিয়ে আলোচনা করবো এবং এটি সম্মিলিতভাবে আমরা এই মাসের মধ্যে কথাবার্তা বলে চূড়ান্ত করে ফেলবো। আমরা কিন্তু এখনো স্যাটেলাইট থালাস থেকে বুঝে পাইনি তার মানে অফিসিয়ালি এখানো এটি আমাদের কাছে হ্যান্ডওভার করা হয়নি। আমরা থালাসের কাছে থাকা স্যাটেলাইট দিয়েই কিন্তু পরীক্ষামূলক সম্প্রচার করেছি।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের জন্যে কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাই এটি সারা দুনিয়াতে মার্কেটিং করবে- সেই জায়গায় আমরা কতোদূর এগিয়েছি?

মোস্তাফা জব্বার: ইন্দোনেশিয়া কাজাখস্থান পর্যন্ত বিরাট একটি ভূ-খণ্ড আমাদের এই স্যাটেলাইটের আওতায় আছে এবং এর চাহিদা আছে ব্যাপক এবং সেই কারণেই আমাদের যে অবস্থান এবং শুনলে খুশি হবেন যে, বস্তুত পক্ষে বাংলাদেশ এখন কূটনৈতিক দিক দিয়ে এতোটা সফলতার জায়গায় এসেছে যে, এই রিজিয়নে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা রোল প্লে করে এবং বাংলাদেশের উপরে মানুষের আস্থার পরিমাণটা বেড়েছে। ফলে আমরা বাংলাদেশের সুনামটা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি আমাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাকে ব্যবহার করতে পারছি। আমাদের যতোটা ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং করা দরকার সেটিও আমরা করতে পারবো। ইতিমধ্যে তার জন্যে দায়িত্ব দিয়ে আমরা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করেছি। তাই আমার কাছে মনে হয় যে, এটা যা হওয়া উচিত সেইভাবেই কাজটি হচ্ছে।