চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বইমেলা শেষে যে বইকেনা আর যে বইপড়া

অধিবর্ষ না হলে আজ ২৮ ফেব্রুয়ারিই হতো বইমেলার শেষদিন। প্রকাশক-লেখক-পাঠকদের দুর্ভাগ্য যে মাসে অমর একুশে গ্রন্থমেলা হয় সেই মাসটি মূলতঃ ২৮ দিনের। তবে তাদের সৌভাগ্য যে প্রতি চার বছরে একবার মাসটি ২৯ দিনের হয়। সে হিসাবে এবার প্রকাশকদের জন্য একদিন বেশি বই বিক্রির সুযোগ এসেছে, আর পাঠকদের জন্যও বই কেনার জন্য বাড়তি একটি দিন।

বিজ্ঞাপন

আমার কাছে বই বেচাকেনার প্রথম জায়গা ময়মনসিংহের কবীর লাইব্রেরি, পারুল লাইব্রেরি; একটু বড় হয়ে বিদ্যাময়ী স্কুল ঘেঁষা একটি গলির মাথায় জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীর বিক্রয়কেন্দ্র। ১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শরিফ ভাইয়ের মাধ্যমে প্রথম চিনলাম আসল বইয়ের হাট, সেটা নীলক্ষেত। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বইমেলার সঙ্গে পরিচয়।

এর আগে মেলা মানে বুঝেছি ছোটবেলায় যেটাকে আমরা এক্সিবিশন বলতাম সেখানে নানা পণ্য কেনার সঙ্গে সার্কাস, পুতুলনাচ ইত্যাদি উপভোগ। বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলার নাম আগে জানলেও একটা বইমেলা আসলে ক্যামোন হতে পারে সেটা প্রথম জানলাম ৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

তখন বই কেনার জন্য খুব টাকা থাকতো না, মেলায় তাই ঘোরাফেরা আর বই দেখাটাই আসল বিষয় ছিলো। বই যা কেনার কিনতাম নীলক্ষেত থেকে, অবশ্যই পুরনো বই; কিন্তু মেলায় যেতাম প্রতিদিন বইয়ের সাম্রাজ্যে লেখকদের দেখা আর অল্পবিস্তর আড্ডা দেওয়ার লোভে। প্রথম কয়েক বছর বই কিনতাম মেলার একেবারে শেষের দিন। ওইদিন বাংলা একাডেমির বইয়ে অনেক ছাড় পাওয়া যেতো।

সে হিসাবে ২৬ বছরে বইমেলার চরিত্র যে খুব বদলে গেছে এমন না। মেলার আয়তন বেড়েছে, মানুষ বাড়ার সঙ্গে পাঠকও বেড়েছে নিশ্চয়ই। তবে এখনো হয়তো অনেক যুবকই শুধু বইয়ের গন্ধের জন্য, লেখকদের দেখার জন্য, তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বইমেলায় যায়। তারা কিনতে পারে হয়তো খুব কম, কিন্তু নিশ্চয়ই মনে মনে হিসাব করে কবে থেকে নিজের টাকায় কিনতে পারবে অনেক অনেক বই।

সেই অনেক অনেক তরুণকে এবারও দেখেছি বইমেলায়। অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে যে প্রাণের মেলা বলা হয় সেটা কিন্তু এ কারণেই। এ তরুণদের নিয়ে অনেকে অবশ্য হতাশ। কেউ কেউ অযথাই মনে করেন, এই সময়ে তরুণদের মধ্যে চিন্তার জাগরণ ঘটায় এমন বইয়ের প্রতি আগ্রহ নেই। এটা আসলে এক ধরনের বায়বীয় চিন্তা।
যে তরুণরা গণজাগরণ ঘটাতে পারে তাদের চিন্তার জাগরণেও আগ্রহী হওয়ার কথা। তবে চিন্তার জাগরণ ঘটানো লেখক বা বইয়ের সংখ্যাও অনেক কম। আমাদের বুদ্ধিজীবিদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এখন লেখার চেয়ে টক-শোতে বেশি সময় দেন। সেরকম ঘুম জাগানিয়া লেখক আমরা পাচ্ছি কই!

অনেকে আবার মনে করেন, এখনকার তরুণরা শুধুই ক্যারিয়ারিস্ট। তারা তাদের ভবিষ্যৎ ব্যক্তিগত জীবন গঠন ছাড়া আর কিছু ভাবে না। হয়তো কথাটা কিছুটা সত্য। কিন্তু, পুরোপুরি সত্য না। এই তরুণরাও একটি চিন্তক সমাজের কথাই ভাবে। কিন্তু, সেই ভাবনার দরোজা-জানালা খুলে দেওয়ার মতো সংস্কৃতির চর্চা, রাজনীতি এবং সমাজের গোষ্ঠি সংগঠনগুলো অনেক কমে এসেছে। যাদের পৌঁছানো যাচ্ছে তারা কিন্তু ঠিকই সেভাবে গড়ে উঠছে।

কিন্তু সমস্যার শুরুটা হচ্ছে সেই শিশুবয়স থেকে। আগে যে শিশু সংগঠনগুলো অন্ততঃ শহুরে শিশুদের মানস গড়ে দিতো সেই সংগঠনগুলো কই! বরং উল্টো পঞ্চম শ্রেণীতে কথিত পিইসি পরীক্ষার নামে শিশুদের ছোটবয়স থেকেই কোচিং সেন্টার আর রেজাল্টমুখি করে দেয়া হচ্ছে। তারপরও মনে করি না, চিন্তার জাগরণ ঘটায় এমন বইয়ের প্রতি তরুণদের আগ্রহ নেই।

একবার ফেসবুক ঘুরে আসুন। বাংলাদেশের এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ ফেসবুকে সক্রিয়। এদের বড় অংশই তরুণ। তাদের অনেকে সেলফি জেনারেশন হলেও নানা বিষয়ে বিতর্ক করছে এমন তরুণ অনেক। অনেক মানে অনেক। তারা নিশ্চয়ই চিন্তার জাগরণ ঘটায় এমন বইয়ের অপেক্ষায় থাকে। এরা অনলাইন জেনারেশন হলেও বইয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু এখনো ছাপা বইয়ের যুগেই রয়ে গেছে। আর যদি বইয়ের অনলাইন ভার্সনও হয় তাহলে ক্ষতি কী!

বিজ্ঞাপন

ভার্সন যাই হোক, পাঠকদের নিয়ে আরেকটি অভিযোগ: সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নন-ফিকশন বইয়ের সংখ্যা এবং লেখক কমে যাচ্ছে। এর মানে পাঠক নন-ফিকশন পড়তে আগ্রহী নন।

আসলেই কি তাই! এরকম তথ্য উপাত্ত কি আছে যে নন-ফিকশন বইয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে? আমার কাছে তথ্য-উপাত্ত নেই। কিন্তু চারপাশে যে মানুষদের দেখি তাতে মনে হয় নন-ফিকশন বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদেরটা বলতে পারবো না। নিজের পরিবার এবং চারপাশের মানুষদের দেখে বলতে পারি, আগে মানুষের ঘরে গল্প-উপন্যাস ছাড়া অন্য বই দেখতাম না। এখনতো চারপাশেই দেখি। এর মানে নন-ফিকশন বই মানুষ পড়ছে, মানে প্রকাশও হচ্ছে বেশি। আমাদের দেশে সোশ্যাল মিডিয়া চর্চার যে প্রবণতা দেখি তাতেও মনে হয় আগের চেয়ে বেশি মানুষের নন-ফিকশন বই পড়ার কথা।

তবে এটাতো সকলেরই জানা, আমাদের দেশে পাঠক সংখ্যা অনেক কম। শিক্ষিত জনগোষ্ঠির তুলনায় ফিকশন বইয়ের পাঠকও অনেক কম। পাঠক যে বাড়ছে না এমন নয়, কিন্তু যতো মানুষের বই পড়ার কথা ছিলো, প্রতিজন মানুষের বছরওয়ারি গড়ে যতো বই কেনা উচিত ছিলো; আমরা তার ধারেকাছেও নেই।

ধারেকাছেও যে নেই তার বড় প্রমাণতো এ বইমেলা। বাঙালি মধ্যবিত্তের বড় অংশ বছরে এ একবারই বই কিনে। অনেকে শুধু এ বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ এবং বছরে শুধু এ একবার বই কেনার অভ্যাসের সমালোচনা করেন। কিন্তু শত নেতির মধ্যেও এটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে চাই। যে মানুষটি সারাবছর একটিও বই কিনেন না তিনিও বইমেলায় যান, এক বা একাধিক বই কিনেন। এথন যদি এ বইমেলাটি না থাকতো তাহলে কী হতো? এই মানুষটি হয়তো একটি বইও কিনতেন না, পড়তেনও না। এর মানে হচ্ছে বইমেলা বই কেনা এবং কিছু পড়ার একটা বড় উপলক্ষ।

তবে মেলায় যেহেতু উৎসব-উৎসব একটা আমেজ থাকে তাই বছরের প্রতিটি দিন না হোক অন্ততঃ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে উৎসব আমেজে বই কেনাবেচার একটা ব্যবস্থা হলে সেটা সব পক্ষের জন্যই আনন্দের একটা বিষয় হবে। বছরজুড়ে এরকম বই কেনাবেচার ব্যবস্থা চাইলেই সম্ভব। দিল্লীতেতো দেখেছি প্রতি রোববার বইয়ের হাট বসে। হাজারো মানুষ সেখানে বই কিনতে যান। চাইলে এখানেও সেটা সম্ভব হবে।

যদি উন্মুক্ত একটি জায়গা করা যায় যেখানে সারাবছর প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে শুক্র-শনিবার বইয়ের হাট বসে তাহলে অবশ্যই কিছু মানুষ যাবেন, কিছু নতুন পাঠক গড়ে উঠবে এবং সেক্ষেত্রে শুধু বইমেলাকেন্দ্রিক না হয়ে সারাবছরই কিছু না কিছু বইও প্রকাশ হতে থাকবে। সাপ্তাহিক এ বইয়ের হাটটিকে জনপ্রিয় করতে মার্কেটিংটা অবশ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

তবে নতুন পাঠক গড়ে তুলতে, জ্ঞানভিত্তিক যে সমাজের কথা আমরা বলি সেজন্য বইয়ের জগতে শিশুদের আরো বেশি করে নিয়ে আসার বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিতে হবে। সেটা যেনো আবার ডোরেমনের বাংলা ভার্সন না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখাও খুব জরুরি।

নিজের একটা অভিজ্ঞতা বলি। আমার কন্যা যে বিদ্যালয়টিতে পড়ে সেখানে প্রতিবছর দুইদিন বইমেলার নামে বইয়ের হাট বসে। আমি মেয়েকে নিয়ে বই কিনতে যাই। কিন্তু, সেখানে যে বইগুলো থাকে সেগেুলো শিশুর মানস গড়ে তোলার জন্য খুব অগুরুত্বপূর্ণ। এরকমতো হতে পারে যে ঢাকার, সারাদেশের সবগুলো স্কুলে বছরে একদিন বা দুইদিন বইমেলা হবে। সেখানে এমন বই থাকবে যেগুলো শিশু-কিশোরদের জন্য আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায়তো কিডস এন্ড মম মার্কা শো-রুম আছে। তাহলে শুধু কিডদের জন্য সাপ্তাহিক বইমেলাও হতে পারে। একদিনেই সেটা জমে যাবে এমন না, কিন্তু ধারাবাহিকতা রাখতে পারলে অবশ্যই হবে।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, যে ছেলেমেয়েরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচিতে অংশ নেয় তাদের বড় একটা অংশ ভালো পাঠক হিসেবে গড়ে উঠে। ভালো পাঠক ফিকশন এবং নন-ফিকশন দুটোই পড়বে। কিন্তু, স্কুল পর্য়ায়ে পরীক্ষার রেজাল্ট এবং কোচিং নির্ভর যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠছে তাতে ছেলেমেয়েরা খুব বেশি পড়ার আগ্রহ হয়তো পায় না। এটায় পরিবর্তন আনতে হবে। আবার এটাও ঠিক এক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কতোটা করতে পারে! এজন্য মহল্লাভিত্তিক সামাজিক সংগঠনগুলো গড়ে তোলা খুব জরুরি। আমরা ছোটবেলায় কচিকাঁচার মেলা বা খেলাঘর বা চাঁদের হাট বা মুকুল ফৌজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। এছাড়াও প্রতিটি মহল্লাতেই ক্লাব-সংগঠন ছিলো। সেখানে পাঠাগার ছিলো, সংস্কৃতির চর্চা ছিলো। সেগুলো আজ কই!

সরকার যদি মনে করে তারা সত্যিসত্যিই একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায় তাহলে বাজেট বরাদ্দ করে হলেও এরকম সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। মহল্লার নেতা হবে ভালো ছেলেমেয়েরা। মাস্তান রাজনীতিকরা মহল্লার নেতা থাকলে এরকম সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব না। তাহলে ভালো একটা প্রজন্মও গড়ে তোলাও সম্ভব হবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)