চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ফেসবুকে পরিচয়, তারপর ভেঙ্গে তছনছ সংসার

দুই সন্তানের জননী মুনা (ছদ্মনাম)। বয়স ৪০। স্বামী-সন্তানদের নিয়ে সুখেই কাটছিল সংসার। একদিন সেই সুখের সংসার ভেঙে তছনছ করে দেয় ফেসবুকে পরিচয় হওয়া এক যুবক।

বিজ্ঞাপন

শুধু মুনা নয়, চ্যানেল আই অনলাইনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন অনেকগুলো ঘটনা। তবে তাদের সবারই পরিণতি মুনার মতোই। সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে অাছেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ এ যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বেছে নিয়েছেন আত্মহননের পথ।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতিতে এক শ্রেণির বিকৃত রুচির মানুষ মেতে উঠেছে বিকৃত উল্লাসে। তাদের টার্গেট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে অল্প জানা নারীরা। যারা সাইবার জগতের এসব নোংরামো সম্পর্কে পরিচিত নন। প্রতিদিনই সেইসব নারীরা তাদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে জীবন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কথা শুনে আগ্রহী হন মুনা। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ফেসবুকে একটি আইডি খোলেন তিনি। তারপর পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই যুক্ত হতে থাকেন সেখানে। তাদেরই একজন শাহরিয়ার। ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে শাহরিয়ার ও মুনার মধ্যে বাড়তে থাকে যোগাযোগ। শাহরিয়ার ও মুনা একই বিভাগের বাসিন্দা হওয়ায় মুনা শাহরিয়ারকে তার  বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানায়। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে, কারণে অকারণে শাহরিয়ারের যাতায়াত বাড়তে থাকে মুনাদের বাড়িতে।

এভাবে যাতায়াতের এক পর্যায়ে শাহরিয়ার মুনাদের বাড়ির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হয়। এরই মাঝে একদিন বিকেলে শাহরিয়ার মুনাকে ফোন করে অশ্লীল প্রস্তাব দেয়। মুনা তাতে অসম্মতি জানালে শাহরিয়ারের বিভিন্ন সময় মুঠোফোনে ধারণ করা মুনার ছবি ও ভিডিও অশ্লীলভাবে এডিট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয় শাহরিয়ার। এমনকি মুনা এবং তার সন্তানদের মেরে ফেলারও হুমকি দেয় সে। এতেও মুনা রাজি না হলে, শাহরিয়ার ব্যবহার করেন সাইবার অস্ত্র। মুনার ছবি ও ভিডিও বিকৃতভাবে এডিট করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। এতে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয় মুনা ও তার পরিবার।

এমনই আরেক ঘটনার শিকার লায়লা (ছদ্মনাম)। তার বয়স ৩৫। রাজধানী ধানমন্ডি এলাকার বাসিন্দা এ নারীর সঙ্গে ২০১১ সালে ফেসবুকে পরিচয় হয় তার চেয়ে বয়সে ৫ বছরের ছোট রনি নামের এক যুবকের সঙ্গে। পরিচয়ের পর থেকেই তাদের মধ্যে ফেসবুক আর ম্যাসেঞ্জারে আদান-প্রদান হতে থাকে ক্ষুদেবার্তা। মাসখানেকের মধ্যেই তাদের সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে। এরপর বিভিন্ন স্থানে তারা একান্তে সময় কাটাতে থাকে। কৌশলে রনি তাদের একান্ত মুহূর্তের কিছু ছবি ও ‍ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখে।

এক পর্যায়ে রনির অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে লায়লা তার স্বামীকে পুরো বিষয়টি জানান। পরবর্তীতে লায়লা যখন সম্পর্কটি থেকে বেরিয়ে আসতে চান। তখন রনি তাদের একান্ত মুহূর্তে তোলা সেই ভিডিও এবং ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। বিষয়টি চুপচাপ মিটিয়ে ফেলার জন্য লায়লা ও তার স্বামী রনির অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে উল্টো হুমকি আসকে থাকে সেদিক থেকে। এমনকি তারা দুই লক্ষ টাকা দাবি করে লায়লার কাছে। লায়লার পরিবার থেকে সেই টাকা পরিশোধ করা হলেও রনি তাদের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

এমনকি ছবিগুলো পাঠাতে থাকে লায়লার আত্নীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের কাছে। এমন সাইবার ক্রাইমের শিকার নারীরা অনেকে হারিয়ে ফেলছেন তাদের স্বাভাবিক জীবন। মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন সারা জীবনের জন্য। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র কাউকে ধর্ষণ করে তা ক্যামেরায় ধারণ করে। পরবর্তীতে সেই ছবি বা ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘বর্তমানে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ  মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। ভালবাসা বা মনোভাব প্রকাশের অভিব্যক্তিটা তারা বোঝে না। পারিবারিক যথাযথ আচরণগত পরিচর্যার অভাবে এসব মানুষগুলো অনেক বেশি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে থাকে। আর সেখান থেকেই তারা সাইবার অপরাধের মত কুরুচিপূর্ণ কাজ করছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল করিম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘বর্তমানে ইন্টারনেট, ফেসবুক খুব বেশি সহজলভ্য হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক বা অল্প বয়সেই ঝুঁকিপূর্ণ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে। পরবর্তীতে পুরনো সম্পর্কটাকে ভুলে যখন কেউ নতুন কোন বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে, তখনই ঘটছে সাইবার ক্রাইমের মত গুরুতর অপরাধ।’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দেয়া তথ্যমতে গত ১ বছরে খোদ ঢাকা মহানগর এলাকায় সাইবার ক্রাইমের অভিযোগ জমা পড়েছে ২০০টির বেশি। অভিযোগকারীদের প্রায় ৮০ ভাগই নারী। তবে এই সময়ে ঘটনার শিকার হয়েও অভিযোগ করেন নি, তাদের সংখ্যা কয়েক হাজার বলে ধারণা করেন সংশ্নিষ্টরা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নাজমুল ইসলাম সুমন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে এখন আমাদের অনেক বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আজ যার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক, কাল সেটি নাও থাকতে পারে। তাই ভিডিও ও ছবি তোলার সময় আমাদের অনেক বেশি সচেতন থাকা প্রয়োজন।’

ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করা থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, অতিমাত্রায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে এবং বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষের জীবনে দিন দিন অপসংস্কৃতি বিরাজ করছে। কিশোর-কিশোরীরা শিকার হচ্ছেন প্রতারণামূলক প্রেমের সম্পর্কের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যৌন বিষয়ক ওয়েবসাইটগুলো দেখার কারণে তাদের মধ্যে কমে যাচ্ছে নীতি-নৈতিকতা। ফলশ্রুতিতে তারা জড়িয়ে পড়ছে সাইবার ক্রাইমসহ নানা অপকর্মে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাইবার ক্রাইমের হাত থেকে রক্ষায় পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরো বেশি দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন বলে মনে করেন সমাজ বিজ্ঞানীরা।