চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ফটোগ্রাফির মিউজিয়াম করবো: নাসির আলী মামুন

মাদার তেরেসা থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানীসহ অগণিত বিখ্যাত মানুষের পোর্ট্রেট তাঁর ক্যামেরায় বন্দী হয়েছে। পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফিকে তিনি নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আর কেউ নন, নাসির আলী মামুন। ১৯৫৩ সালের পহেলা জুলাই পুরানো ঢাকার মৌলভীবাজারে জন্ম তাঁর।

১৯৭২ সালে দেশে প্রথম পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করেন তিনি। কবি শামসুর রাহমান তাকে ‘ক্যামেরার কবি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। চ্যানেল আই অনলাইন এর সঙ্গে কথা বলেছেন নাসির আলী মামুন। সেখানে শোনালেন ফটোগ্রাফি ও নিজের ফটোগ্রাফি জীবনের নানান গল্প।

চ্যানেল আই অনলাইন: বিশ্বের প্রথম ছবির ইতিহাসটা কেমন ছিলো?

নাসির আলী মামুন: ফ্রান্সের প্যারিস শহরে প্রথম শুরু হয় ফটোগ্রাফি। বিশ্বের প্রথম ছবিটি তুলতে সময় লেগেছিল প্রায় আট ঘন্টা। ১৮২৬ সালে ছবিটি তুলেছিলেন ফান্সের বিজ্ঞানী জোসেফ নীসফোর নীপসে। নিজেই বানিয়েছিলেন ক্যামেরার মতো একটি যন্ত্র যা দিয়ে ছবি তোলা সম্ভব। সেই যন্ত্রে বিভিন্ন প্রকারের রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে তাদের বাড়ির গেট ও বাড়ির বাগানের ছবিটা তুলেছিলেন। অনেক সীমাবদ্ধতার ভেতর ছবিটি তোলা হয় তাই ছবিটা ছিল আউট অব ফোকাস। তবে হালকা হালকা ইমেজ বোঝা যায়। এর কয়েক বছর পর কাঁচের প্লেট তৈরি হলো যা অনেকটা নেগিটিভের মতো।

চ্যানেল আই অনলাইন: বাংলাদেশের প্রথম ছবির ইতিহাসটা কেমন?

নাসির আলী মামুন: বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাস লেখা হয়নি। তাই আমাদের ফটোগ্রাফির শুরুটা অনেকটা অন্তরালেই থেকে গেছে। যারা বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির ভিত্তি রচনা করেছিলেন তারা কেউই লিখে রাখেন নি। ঢাকায় ফটোগ্রাফির শুরু ১৮৯৫-১৮৯৯ সালের দিকে। পুরান ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর পরিবারের সদস্যরা তাদের ছবি তোলার জন্য জার্মান এক ফটোগ্রাফার ফিৎস ক্যাপ কে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন। এই ফটোগ্রাফার পুরান ঢাকায় একটি ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফি স্টুডিও চালু করেছিলেন। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষ ছবি তোলার সুযোগ পেতেন না। বনেদী ও ধনী বংশের মানুষরা ১৯১৪ সালের বেশ কিছুদিন পরে ছবি তোলার সুযোগ পায়। আর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগে আমাদের দেশে ছবি তোলার জন্য স্টুডিওর অস্তিত্ব ছিল। তবে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা ও ফরিদপুরে স্টুডিও ছিল।এবং শোনা যায় অনান্য জেলাতেও স্টুডিও ছিল।

চ্যানেল আই অনলাইন: আমাদের ফটোগ্রাফির সমালোচনা হয় না কেন?

নাসির আলী মামুন: দেশে ফটোগ্রাফির কোনো আলোচক সমালোচক নেই। আমাদের এই ব্যাপারগুলোতে আরো বেশি যত্নবান হতে হবে, জানতে হবে। কারণ ফটোগ্রাফি এখন প্রধান শিল্পে পরিণত হয়েছে। সরকার এগিয়ে আসলে ফটোগ্রাফি শিল্পটা আরও জোরদার ও বেগবান হবে। তবে ফটোগ্রাফিকে আরো বিকশিত করতে চাইলে সরকারের উচিত শিল্পকলা একাডেমীতে চারুকলা বিভাগের মতো ফটোগ্রাফি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধীনে ফটোগ্রাফি বিষয়টি চালু রয়েছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ ধরণের সুবিধা থাকা উচিত।

চ্যানেল আই অনলাইন: ফটোগ্রাফি নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা?

নাসির আলী মামুন: আমার ইচ্ছা অনুযায়ী প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছি নাম ‘ফটোজিয়াম’ অর্থাৎ ফটোগ্রাফির মিউজিয়াম। ফটোগ্রাফিকে ভিত্তি করে ফটোগ্রাফির জাদুঘর করতে চাই। গতানুগতিক জাদুঘর এটি নয়। এখানে থাকবে মূলত বিখ্যাত মানুষদের পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি এবং তাদের আঁকা চিত্রকর্ম। এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা বিখ্যাত মানুষ তাদের লেখা আঁকা ছবিও থাকবে সেখানে।

চ্যানেল আই অনলাইন: পেশা হিসেবে ফটোগ্রাফিকে নিতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?

নাসির আলী মামুন: যারা পেশা হিসেবে এই ফটোগ্রাফিকে বেছে নিতে চান তাদের দ্রুত এই জগতে আসতে অনুরোধ করছি। আপনাদের মেধা মনন কাজে লাগিয়ে ফটোগ্রাফিকে আরো বিকশিত করুন। বিভিন্ন পত্র পত্রিকাসহ টেলিভিশনেও এখন ফটোগ্রাফার লাগে। চাকরিরও বেশ সুযোগ রয়েছে। তাই আপনারা এই শিল্পের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করুন।

চ্যানেল আই অনলাইন: আপনার পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি নিয়ে কিছু বলুন?

নাসির আলী মামুন: ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে আমি পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফির সূচনা করি। তখনকার সময় ছিল চরম বৈরী পরিবেশ। আমার ফটোগ্রাফির কোনো ট্রেনিং ছিল না। পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি কি তা ফটোগ্রাফাররাই বুঝতো না। ঐ সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ফটোগ্রাফি বা ফ্রিলান্সার ছাপা হতো তা কৌতুহলের সঙ্গে দেখতাম।

আমানুল হক, নইবউদ্দীন আহমেদ, ডক্টর নওয়াজেশ আহমেদ, মঞ্জুরুল আলম বেগ, আনোয়ার হোসেনের মতো আধুনিক মাপের ফটোগ্রাফাররা আমাদের আলোকচিত্র জগতে বিরাট প্রতিভা। প্রকৃতি ছিল তাদের প্রধান বিষয়। কেউ পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না বলে আমার ধারণা। আমিই প্রথম পোর্ট্রেট করা শুরু করলাম একটি বিশেষ বিষয়ের মধ্য দিয়ে। বিষয়টি ছিল সবার পোর্ট্রেট আমি করবো না। যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব, যারা সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল, শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান রাজনীতি এবং খেলাধূলা অঙ্গনে বিখ্যাত তাদের পোর্ট্রেট করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমী প্রথম আমার একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী করে।

আমি আমার ফটোগ্রাফির জীবনে ৪৩ বছর পার করেছি অত্যন্ত বৈরী পরিবেশের মধ্য দিয়ে। এখনো নানান সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।কারণ শুরুর দিকে আমার ক্যামেরা ছিল না, আমাকে কেউ চিনত না। তবে এখন যারা ৯০ পরবর্তী সময়ে পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফিতে এসেছেন তাদের সামনে শিক্ষার অনেক কিছু রয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে পারছে তারা।

চ্যানেল আই অনলাইন: এদেশের নারী ফটোগ্রাফাররা কেমন করছে বলে মনে করছেন?

নাসির আলী মামুন: বাংলাদেশে মেধাবী নারী ফটোগ্রাফার রয়েছে। তারপরও দৈনিক পত্রিকাগুলোতে দু’একজন নারী ফটোগ্রাফার কেনো? আমি জানি এক্ষেত্রে নারীর নানান সীমাবদ্ধতার কথা। পত্রিকার পুরুষ সিনিয়র সহকর্মীরা হয়তো মনে করে নারীরা ফটোগ্রাফি করতে পারবে না, হরতালসহ মিছিল মিটিংয়ের ছবি তুলতে পারবে না। এরকম ধারণা ঠিক না।

আমি দেখেছি বিভিন্ন সহিংসতায় ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন জেলাতেও নারীরা অনেক কাজ করে আসে এবং তাদের ছবি পত্রিকার প্রথম পেজে ছাপা হয়। ছেলেদের চেয়ে তাদের ছবি খারাপ না, বরং কোনো কোনো অংশে ভালো। আমি মনে করি নারীরা যদি এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে চায় তাদের জন্য জায়গা খোলা রয়েছে, এবং তারা তাদের জায়গা নিজেরাই জয় করে নিতে পারবে।

চ্যানেল আই অনলাইন: বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি তুলতে গিয়ে কোনো স্মৃতি?

নাসির আলী মামুন: ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সে অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ১৬ জনকে প্রেসিন্ডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম নামে একটি মেডেল দিবে। এটি আমেরিকার সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান অ্যাওয়ার্ড। ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস ছিলেন ১৬ জনের একজন।আমি জানতাম এই প্রোগ্রামে পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আসবে।

হোয়াইট হাউসের প্রোগ্রামে ঢোকার একটু পর লক্ষ্য করলাম সাদা মাইক্রোবাসে করে একটি বিশাল হুইল চেয়ারে স্টিফেন হকিং কে নামানো হচ্ছে। তখন প্রজাপতির মতো আমার রক্ত টগবগ করে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। ডক্টর ইউনুসকে আমি অনুরোধ করলাম স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে উনার ছবি তোলার জন্য। তিনি রাজী হলেন। হকিং সাদা রংয়ের একটা শার্ট আর কালো রংয়ের স্যুট পড়া ছিলেন। তার হুইল চেয়ারটিও সাধারণ না। তার সঙ্গে ছবি তুললাম, তার ছবি তুললাম, তার শরীরে হাত দিলাম।

তার হাত হিম ঘরে রাখা লাশের মতো ঠান্ডা!!! তিনি মাথা নাড়াতে পারে না। তার শুধু চোখ নড়ে,তাছাড়া সারাদেহ অবশ। শুধু একটা হাতের আঙ্গুল নড়ছে যা কম্পিউটারের মনিটরের দিকে। বিস্ময়কর একটা প্রোগাম। স্টিফেন হকিংয়ের পোর্ট্রেট করলাম। বারাক ওবামা, ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসসহ ডেসমন্ড টুটো, বিখ্যাত অভিনেতা সিডনি পয়টিয়ারাস উপস্থিত ছিলেন। এক অসাধারণ অনুভূতি ছিল সেটা।

চ্যানেল আই অনলাইন: সেলফি কি ফটোগ্রাফির মধ্যে পড়ে ?

নাসির আলী মামুন: অবশ্যই পড়ে, এটা খুব আনন্দের বিষয়।

চ্যানেল আই অনলাইন: চ্যানেল আই অনলাইন কে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নাসির আলী মামুন: চ্যানেল আই অনলাইনকেও ধন্যবাদ।