চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রধান বিচারপতির চাওয়ামতো পরিপক্ক না হলে কী হবে

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেয়া রায় সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখার পর থেকেই নানামুখি প্রতিক্রিয়ায় এক ধরণের অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকার তাৎক্ষণিক এবং পরে বিভিন্ন সময়ে যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সে অধিকার তাদের আছে। তাদের অনেক বক্তব্য যৌক্তিক। আবার কিছু বক্তব্য অসত্য কিংবা ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল বিশ্লেষণ।

বিজ্ঞাপন

তবে, সবচেয়ে বেশি সমস্যা করছেন ভাড়াটে খেলোয়াড় হিসেবে যারা সরকারের পক্ষে মাঠে নেমেছেন কিংবা সরকারের কেউ কেউ যাদেরকে ভাড়াটে খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামিয়েছেন। এরা এমন কিছু বক্তব্য দিচ্ছেন যা তাদের অতীত অবস্থানের পরিপন্থী। প্রধান বিচারপতির সর্বশেষ বক্তব্যে মনে হচ্ছে, সরকারের চেয়েও এ ভাড়াটে খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ আদালতকে বেশি বিরক্তির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন।

সেই বিরক্তিটা সপ্তাহ শুরুর দিন আদালতে বসেই প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা প্রকাশ করে দিয়েছেন। আমরা বলছি না যে, বিরক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি প্রচ্ছন্নে আরো কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু, এটা সত্য যে, তার বক্তব্যেও এক ধরণের অস্বস্তির বিষয় আছে যে অস্বস্তিটা শুরু হয়েছিল আপিল বিভাগের রায়ের পর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিক্রিয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে হুমকিমূলক বক্তব্যে।

সেটা নতুন মাত্রা পেয়েছে রোববার আদালতে দেয়া প্রধান বিচারপতির কিছু প্রতিক্রিয়ায়। এদিন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা শুনানিতে উপস্থিত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ যথেষ্ট ধৈর্য ধরছে।’

বিডিনিউজের একটি সংবাদ বলছে, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা প্রসঙ্গে বিচারপতি সিনহা সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে অযোগ্য ঘোষণা করে সেদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় দেওয়ার পরের পরিস্থিতি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরও পরিপক্কতা দরকার।

বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রোববার আবারও সময়ের আবেদন করলে অ্যাটর্নি জেনারেলকে আলোচনায় বসার আহ্বানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন: গত তারিখে কী কথা ছিল? কার সঙ্গে কে কে থাকবে তা ঠিক করে আলাপ-আলোচনা করার কথা ছিল। কে কে থাকবে?

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল ‘ল মিনিস্টার’ এর কথা জানালে প্রধান বিচারপতি বলেন: এতোই আমরা ইয়ে হয়ে গেলাম… আলোচনা পর্যন্ত করলেন না!

বিজ্ঞাপন

প্রধান বিচারপতি তখন আরো বলেন, ‘আপনারা মিডিয়াতে অনেক কথা বলেন। কোর্টে এসে অন্য কথা বলেন। আপনাদের বলছি, আপনাকে নয়। আপনিই বলেন। কবে কী হবে?’ অ্যাটর্নি জেনারেল তখন ‘একটা আনস্ট্যাবল সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে,’ বলে মন্তব্য করলে প্রধান বিচারপতি ‘আনস্ট্যাবল সিচুয়েশনের’বিষয়ে জানতে চান। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সবটা নিয়েই আমি বিব্রত।’

বিচারপতি এস কে সিনহা তখন বলেন, ‘আপনারা ঝড় তুলছেন। আমরা কোন মন্তব্য করেছি? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘না, আপনারা করেননি।’

মাসদার হোসেন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামকে প্রধান বিচারপতি বলেন: আমরা বিচার বিভাগ ধৈর্য ধরছি। যথেষ্ট ধৈর্য ধরছি। আজকে একজন কলামিস্টের লেখা পড়েছি… সেখানে ধৈর্যর কথাই বলা হল। পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে ইয়ে করল। সেখানে কিছুই হয়নি। আমাদের আরও পরিপক্কতা দরকার।’

প্রধান বিচারপতির আজকের বক্তব্যে আমরা যদি মূল শব্দগুলোর দিকে তাকাই তাহলে এ শব্দগুলো আমরা পাই: ধৈর্য, পাকিস্তান, নওয়াজ শরিফ, বিব্রত, পরিপক্কতা, মিডিয়াতে কথা, ঝড় এবং আনস্টেবল সিচুয়েশন।

আসলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়গুলো এরকমই। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকার পর থেকে এক ধরণের বিব্রতকর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মিডিয়াতে কথা চালাচালির কারণে ঝড়টা গতি পেয়েছে আরো বেশি। এসব কারণে একরকম ‘আনস্ট্যাবল সিচুয়েশন’ও আমরা দেখছি। কিন্তু, পরিস্থিতিটাকে ‘স্ট্যাবল’ করার জন্য আমরা তেমন একটা ধৈর্য দেখানোর প্রবণতা দেখছি না। সেজন্য পরিপক্কতা খুব জরুরি। সব মহল থেকেই এ পরিপক্কতার প্রমাণ রাখতে হবে।

আমাদের পরিপক্কতাহীনতা এবং ধৈর্যহীনতার কারণে ঝড়টা যদি আরো গতি পায় তাহলে অ্যাটর্নি জেনারেল যে ‘আনস্ট্যাবল সিচুয়েশন’র কথা বলেছেন সেটা আরো আনস্ট্যাবল হলে কারো জন্যই তা মঙ্গলকর হবে না।

ষোড়শ সংশোধনীর রায়েও প্রধান বিচারপতি সংসদ এবং গণতন্ত্রকে সেই পরিপক্কতা অর্জনের কথা বলেছিলেন। এ পরিপক্কতাটা আমরা দেখাতে পারি না? আমরা সবাই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)