চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতিবাদহীন এই শহরে যেমন আছি

রাস্তায় হঠাৎ একটা মেয়ের চিৎকার,‘আমার ব্যাগ, আমার ব্যাগ…। ’পথচারীরা সবাই মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কারো চোখে কিছু পড়ছে বলে মনে হয় না। বরং মেয়েটার চিৎকারে মজা পাচ্ছে অনেকেই! আরেকজন বললেন, ‘ছিনতাই হইছে মনে হয়।’ বলেই তিনি নিজের পথে হাটা শুরু করলেন। তার মতো সবাই হেঁটে যাচ্ছেন। কেউ দৌড়ে ছিনতাইকারীর পেছন পেছন গেলো না। অবশ্য আরো কিছুক্ষণ পর বেশকিছু কৌতুহলী মানুষ জড়ো হলো। মেয়েটির কথা শুনে আহা উহু করে চলে গলো। কেউ আবার থানায় যাওয়ার পরামর্শ দিলো। কিন্তু ততক্ষণে ছিনতাইকারীরা উধাও। ঘটনাটি তিনদিন আগের। রাজধানীর মহাখালী রেলক্রসিংয়ের কাছে।

বিজ্ঞাপন

আরেকদিন রাস্তায় হাঁটার পথে এক মেয়েকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলো দুই বখাটে। মেয়েটি হুড়মুড় করে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ালো। মেয়েটি একাই দৌড়ে গিয়ে একজনের কলার ধরে ফেলল। ‘ধাক্কা দিলি ক্যান? বল ধাক্কা দিলি ক্যান’, মেয়েটির চোখে মুখে আগুনের স্ফুলিঙ্গ। কিন্তু সেই আগুনের উত্তাপ চারদিকে ছড়ায় না। আশেপাশের মানুষ তাকিয়ে মজা দ্যাখে। মিটমিট করে হাসে অনেকেই। কেউ এসে মেয়েটিকে সাহায্য করে না। কেউ এসে ছেলেটির গালে কষে চড় দিয়ে বলে না, ‘তুই অন্যায় করেছিস। ’

আরেকদিনের ঘটনা। অফিসে আসছি। সিএনজি ড্রাইভার খুব বিরক্ত মুখে বলল আফা, ‘আপনার বয়স কত? ঢাকা শহরে আইছেন কতদিন?’ আমি খুব বিব্রত হলাম। বললাম, ‘কেন? আমার বয়স দিয়ে আপনি কি করবেন?’ বললেন, ‘আপনি দুই দিনের মাইয়া আমারে রাস্তা চেনান? মাইয়া মানুষের বুদ্ধি দুই আঙ্গুল বেশি। ’ আমি বললাম, ‘মাইয়া মানুষ বলে আমি রাস্তা চিনব না? আপনি জানেন এই রাস্তা দিয়ে আমি ১০ বছর অফিস যাতায়াত করি। কোন দিক দিয়ে গেলে জ্যাম কম হবে এটা আমি ভালো জানি। ’

বিজ্ঞাপন

মিরপুর থেকে তেজগাঁও চ্যানেল আই অফিসে আসতে জ্যামে বসে থাকতে হয় বিজয় সরণী সিগন্যালে। কোন এক অদৃশ্য কারণে নভো থিয়েটারের দিককার সিগন্যালটা সময় মতো ছাড়ে না। আমার একদিন ৪০ মিনিট বসে থাকার অভিজ্ঞতা আছে ওই সিগন্যালে। অফিস টাইমে আমি খুব কৌশলে ওই সিগন্যালটা অ্যাভয়েড করি। আগারগাঁও সিগন্যাল পার হয়ে লিংক রোডে ঢুকে যাই। তারপর পিএম অফিসের সামনে দিয়ে বিজয় সরণী সিগন্যাল পার হয়ে র‌্যাগস ভবনের ফ্লাইওভারে উঠি। এরপর বাম দিয়ে তিব্বতের মোড় পার হয়েই নাবিস্কো মোড়ের একটু সামনে আমার কর্মস্থল চ্যানেল আই অফিস।

এটাই আমার জন্য শর্টকাট রাস্তা। পরিচিতি সিএনজি চালকরা আমাকে প্রতিদিন ওই রাস্তা দিয়েই নিয়ে আসে। কিন্তু এই সিএনজি চালক মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘ওদিক দিয়া য্যায়া(গিয়ে) ফায়দা কী? এতো তাড়াহুড়া থাকলে পেলেনে (প্লেন) যান না ক্যা। ’ কিছুতেই তিনি আমার দেখানো পথে যাবেন না। আমার কোন যুক্তিই তাকে কাবু করতে পারলো না। আমি অসহায়ের মতো সেদিন বসে ছিলাম। ভাবছিলাম, তার সমস্যা আসলে কী। ওদিক দিয়ে গেলে তো তার কোন সমস্যাই ছিল না। তবুও কেন যাবেন না।

অফিসে আসার পরও আমি তাকে নিয়ে ভাবছিলাম। এক সময় উপলব্ধি হয়, একটা মেয়ে তাকে সহজ রাস্তা চেনাচ্ছে, এটা মানতে পারছিলেন না। বয়সে আমার বাবার মতো। অথচ তার বেয়াদবি ছিল সীমাছাড়া। মেয়ে মানুষের কথা শুনবেন না বলেই তার সে কী বড়াই! আমাকে রীতিমতো অপমান করেছিলেন। সেদিনও দেখেছিলাম আশপাশের মানুষ শুধু তাকিয়ে ছিল। কিন্তু কেউ চোখ তোলেনি।

আমরা আসলে সবাই নিরুপায় এই ঢাকা শহরে। কিছুই করার নেই। অন্যায়গুলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। শুধু মানুষগুলোই নয়। বিব্রত ঢাকা শহরের কোকিলগুলোও। তারা শীতকালেও ভুল করে ডেকে ফেলে। কাল চ্যানেল আইয়ের ছাদে বসে সহকর্মীদের সাথে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ কোকিলের ডাক। এক সহকর্মী বলে উঠলেন, ‘ওরে কোকিল এইডা চৈত্রমাস। যা ভাগ। ’সবাই হেসে উঠলাম। কোকিলের আর কী দোষ বলুন। এই শহরে, এই যাপিত দিনে মানুষ মানুষকে চেনে না। কোকিল মাস চিনবে কী করে!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)