চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নুরুল হক নুরের ছোট কাঁধে বড় বোঝা

বুঝতে শেখার পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখেছি ১৯৮৬ সালে। এরশাদের ওই নির্বাচন ছিল অর্থ ও পেশী শক্তির নির্বাচন। নির্বাচন পরিচালনাকারীরা, আমরা বুঝি তারা কারা, জেলায় জেলায় বস্তা বস্তা টাকা পাঠিয়েছিল। সঙ্গে মাস্তানি তো ছিলই। তবে, পেশী শক্তিতে আওয়ামী লীগও কম ছিল না। এরশাদের টাকা, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এবং মাস্তানদের ঠেকিয়ে আওয়ামী লীগ জোট ১০০’র বেশি আসনে জয়লাভ করে। বিএনপি ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল।

এরশাদের জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসনে জিতে তথাকথিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় স্বভাবতঃই আওয়ামী লীগ জোট নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। সংসদ ভবনের বাইরে বিকল্প অধিবেশনও ডাকে আওয়ামী লীগসহ বিরোধীদল। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত তারা শপথ নেয় এবং দুই বছর পর পদত্যাগের আগে পর্যন্ত বিরোধীদলে থেকে সময় সময় অধিবেশনে যোগ দেয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে অভাবনীয়ভাবে আওয়ামী লীগ হেরে যাবার পর সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ আনলেও আওয়ামী লীগ সংসদে যোগ দেয় এবং সময় সময় অধিবেশন বয়কটসহ প্রায় পাঁচ বছর সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করে।

একইভাবে ৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি কারচুপির অভিযোগ আনলেও পাঁচ বছর তারা বিরোধীদল হিসেবে সংসদে ছিল, যদিও পাল্লা দিয়ে তাদেরও ছিল অধিবেশন বয়কটের সংস্কৃতি।

২০০১ এর নির্বাচনে হেরে যাবার পর স্থূল কারচুপির অভিযোগ আনলেও আওয়ামী লীগ অধিবেশন বয়কটের সংস্কৃতি ধরে রেখেই বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করে।

এরপর ২০০৮ এর নির্বাচনে ৩০টিরও কম আসন পাবার পর নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ তুললেও শপথ নিয়েছে বিএনপি, বিরোধীদলের ভূমিকাও পালন করেছে তারা।

এর মানে দাঁড়াচ্ছে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও, নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা হলেও, জাতীয়ভাবেই শপথ না নেওয়া এবং সুচারুভাবে না হলেও দায়িত্ব পালন না করার কোনো নজীর নেই।

সুতরাং, নুরুল হক নুরদের ভাষায় ডাকসু নির্বাচনে অনিয়ম হয়ে থাকলেও যারা জয়ী হয়েছে তাদের দেশের ঐতিহ্য অনুযায়ী দায়িত্ব না নেওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। তাদের স্বাভাবিক যুক্তি হতে পারে, এতো অনিয়মের পরও ভিপি এবং একটি সম্পাদকীয় পদে নুরদের জয় ঠেকিয়ে রাখা যায়নি। সুতরাং, আবারও ভোটের দাবি জানানো হলে তাদের ভাষায় যে পদগুলোতে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে শুধু সেই পদগুলোতে ভোট হবে।

এখানে মনে রাখা উচিত যে, যারা পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছেন তারা ভোটের প্রতিযোগিতার ধারেকাছেও ছিলেন না। তারা কেউ নুরের মতো এমন ভোট পাননি ‘যাতে তার/তাদের জয় ঠেকিয়ে রাখা যায়নি’।

কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নুরুল হক নুরের যে উত্থান, তার জয়ে সেই আন্দোলন-তাদের সংগঠন ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ-সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। তাদের আশা অনুযায়ী পুরোপুরি জয় না এলেও, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদের ভাষায় ‘অর্জিত বিজয় সুসংহত করতে’ নুরকে ডাকসু ভিপির দায়িত্ব নেওয়া উচিত।

তাকে কোনোভাবেই চরমপন্থা অনুসরণ করে ভিপির দায়িত্ব পালন থেকে দূরে থাকা উচিত হবে না। বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, চরম কোনো পথ এদেশে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এক্ষেত্রেও হবে না। নুরের দায়িত্ব না নেওয়া মানে তার এবং তাদের আন্দোলনের এখানেই পরিসমাপ্তি।

প্রশ্ন হচ্ছে সেই আন্দোলনটা কী?

একথা সত্য যে কোটাবিরোধী আন্দোলনের শুরুটা নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক ও বিভ্রান্তি আছে। শুরুর দিকে শাহবাগের ‘প্রজন্ম চত্বর’কে ‘মেধা চত্বর’ নাম দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননার একটা চেষ্টা ছিল। কিন্তু, বাস্তবতা বলছে, পরে এ আন্দোলন আর স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে বা নিয়ন্ত্রণে ছিল না।

ডাকসু নির্বাচন-বিক্ষোভনতুন নেতৃত্বে সাধারণের কাছে এটি একটি যৌক্তিক আন্দোলন হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সেই আন্দোলনে তাদের প্রাথমিক জয় এসেছে, যদিও কোনোভাবেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা একেবারেই তুলে দেয়া উচিত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা এবং সে সঙ্গে শহীদ পরিবারগুলোর জন্য যৌক্তিক একটি কোটা রাখা উচিত যা তাদের কিছু সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সম্মানও জানাবে।

আবার এক্ষেত্রে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশও আমরা মনে রাখতে পারি। সেখানে বলা হয়েছে, সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশের কেউ একবার কোটা সুবিধা পেলে তার উত্তরসূরি আর কেউ সেটা পাবে না। বিষয়টা ব্যাখ্যা করা হয়েছে এভাবে: দলিত সম্প্রদায়ের একজন যদি কোটায় প্রথম শ্রেণির একটি চাকরি পান এবং তিনি উপ বা যুগ্ম বা অতিরিক্ত বা পূর্ণ সচিব হিসেবে অবসরে যান, তাহলে তার পুত্র বা কন্যার কি দলিত সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত? উচিত না। কারণ সেই পুত্র বা কন্যা রাষ্ট্রের এবং সমাজের সকল সুবিধা নিয়েই বড় হয়েছে, এখন সে আর পিছিয়ে থাকা দলিত সম্প্রদায়ের অবস্থানে নেই। সে কোটা সুবিধা পেলে বরং দলিত সম্প্রদায়ের যার এ সুবিধা পাওয়া উচিত সে বঞ্চিত হবে।

এ বঞ্চিত থাকা না থাকার অবস্থান থেকে বাংলাদেশে নারী বা জেলা কোটা অথবা প্রতিবন্ধী কোটা তুলে দেয়াও বাস্তবসম্মত নয়। কোটা আন্দোলনকারীদের এ বিষয়ে যৌক্তিক অবস্থানে যেমন থাকতে হবে, তেমনই সরকারকেও অভিমানী হলে চলবে না।

ডাকসুসকলের মধ্যে সেই শুভবোধ জাগ্রত হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। তার আগে আবার আমরা মূল বিষয়ে ফিরে যাই। সেটা নুরুল হক নুরের দায়িত্ব নেওয়া না নেওয়া প্রসঙ্গে।

এখন সময়টা এরকম যে দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিরোধী মত নেই। আগের জাতীয় সংসদ এবং এখনকার সংসদে যে বিরোধীদল, তারা সরকারেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ। ছিটেফোঁটা যে বাম তারা ঠেলে দিলেও সরকারের বাইরে যেতে রাজি নয়।

সে হিসেবে এখন ডাকসুই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে সরকারি দল ও সরকার সমর্থকদের চ্যালেঞ্জ করে একজন ভিপি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও ডাকসুর শুধুই একটি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ হওয়ার কথা, কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা ঘটনায় ডাকসু শুধু সেই ছোট অবস্থানে নেই। এর একটি জাতীয়ভিত্তিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণভবনে ডাকসু এবং হল সংসদে নির্বাচিতদের চা-চক্রে আমন্ত্রণ তার একটা প্রমাণ।

ডাকসুর অতীত বিবেচনায় নুরুল হক নুর জাতীয়ভাবেই একটি কণ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, যে কণ্ঠ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা। যে কণ্ঠ শুধু ছাত্রসমাজকেই প্রতিনিধিত্ব করে না, বাংলাদেশের একটি বৃহৎ শ্রেণিকেও প্রতিনিধিত্ব করে।

ডাকসু নির্বাচনপরে একেকজন পেটমোটা কর্মকর্তা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রচলিত রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের এক ধরনের শ্রেণিচ্যুতি ঘটিয়েই নুরুকে নির্বাচিত করেছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাময়িক শ্রেণিচ্যুতির বিষয়টা অস্বাভাবিক নয়।

এরকম সাময়িক চেতনার কারণেই যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রসমাজকে আমরা সামনের সারিতে দেখি।

দেশের যেকোনো ঘটনায় এখন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে মাঝেমধ্যে যে আন্দোলন আমরা গড়ে উঠতে দেখি, সেটাকে যেহেতু প্রচলিত রাজনীতি বা ছাত্ররাজনীতি কেন্দ্রিভূত করতে পারেনি বা পারবে না, তাই ডাকসু ভিপি হিসেবে নুর তার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে। ভিপি নির্বাচিত হওয়া তাকে একদিকে এ বিষয়ে দায়বদ্ধ করেছে, অন্যদিকে তাকে অলিখিত একটা কর্তৃত্বও দিয়েছে।

দেশকে এককেন্দ্রিক চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে সাময়িক বুদবুদের মতো হলেও প্রতিবাদ থাকা জরুরি। কিন্তু নেতৃত্বহীনতায় সেটা যেন একেবারে হারিয়ে না যায় কিংবা নৈরাজ্যে পরিণত না হয়, তার জন্য কেন্দ্রিভূত নেতৃত্বও প্রয়োজন। ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের সামনে সেই সুযোগ এসেছে। বিরোধীদলহীনতার এ সময়ে বুদবুদের আন্দোলনে নেতৃত্বের এ বিষয়টি সরকারকেও বুঝতে হবে।

আর নুরকে বুঝতে হবে, প্রচলিত রাষ্ট্র কাঠামোতে প্রতিষ্ঠান খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডাকসু ভিপি নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি খুব জনপ্রিয় নেতা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কর্তৃত্ব তার ছিল না। শিক্ষার্থীরা তাকে ভোট দিয়ে সেই উপহারটা দিয়েছে।

নৈরাজ্যবাদীদের কথায় কান দিয়ে সেটা তার হারানো উচিত হবে না। নুরুল হক নুরের ডাকসু ভিপির দায়িত্ব গ্রহণ তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দেশের ছাত্রসমাজ এবং দেশের জন্য কল্যাণকর একটি ঘটনা হবে।

সেই কল্যাণটা নিশ্চিত করার জন্য নুরের ছোট কাঁধে হয়তো ছেলেমেয়েরা বড় বোঝাই চাপিয়ে দিয়েছে। এ ভার বহন নির্ভর করবে তার নিজের যোগ্যতা এবং অন্যদের সহযোগিতার উপর। ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের জন্য শুভকামনা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)