চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষির জন্য যা চাই

বইছে নির্বাচনী হাওয়া। আমি যখন লেখাটি লিখছি তখন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা শুরু করেছে। কদিন ধরেই ভাবছিলাম দলগুলোর ইশতেহারে কৃষির জন্য কী কী থাকা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

কৃষিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের কৃষি এগিয়েছে অনেক-খানি, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আরও কিছু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলে কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্ত করবে অন্যরকম সাফল্য। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমাকে যেতে হয় কৃষকের কাছে। প্রতি বছর ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তুলে আনতে চেষ্টা করি একেবারে মাঠপর্যায়ের কৃষকের চাহিদা, প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তির তথ্যটুকু। কৃষকের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই আমি আশা করছি রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। পাশাপাশি নতুন সরকার গঠনের পর কৃষিতে এ বিষয়গুলোর প্রতিফলন দেখতে চাই।

১. কৃষকের জন্য চাই উন্নত ও আধুনিক বাজার-ব্যবস্থা। যশোরের প্রত্যন্ত এক গ্রামে যে শিম বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা কেজি, ঢাকার বাজারে তা বিক্রি হয় ১০০ টাকা কেজি দরে। কৃষক অনেক ক্ষেত্রেই তার ফসলের ন্যায্য দামটা পায় না। চীনের কৃষিতে ব্যাপক উন্নয়নের পেছনে রয়েছে চীন সরকার কৃষককে উন্নত বাজারব্যবস্থার আওতায় এনেছে। অনলাইনভিত্তিক বাজারে কৃষক নিজেই তার পণ্য বিক্রি করতে পারছে। আবার অকশনেও সরাসরি অংশ নিতে পারছে।

কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট অনুষ্ঠানে

২. সারা পৃথিবীই এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির বৈরিতার শিকার। বাংলাদেশের কৃষিও ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছে বেশ কয়েকবার। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ জরুরি। সেইসঙ্গে প্রয়োজন কৃষিতে শস্যবীমা চালুকরণ।

৩. বর্তমান সময়ে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্যের বিষয়েও পৃথিবীর মানুষজন সচেতন হয়ে উঠছে। বিদেশের বেশ কয়েকটি হোলসেল মার্কেট ঘুরে যে অভিজ্ঞতাটি আমার হয়েছে তা হলো, বাংলাদেশের ফল-ফসলে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ হয় এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। আমাদের দেশের পান পাশের দেশ ভারত হয়ে দেশে বাইরের বাজারে রপ্তানি হচ্ছে এমন দৃশ্যও আমি দেখেছি। বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্য মানেই ‘নিরাপদ খাদ্য’ এই বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হবে। এর জন্য সরকারিভাবেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিজ্ঞাপন

৪. আওয়ামী লীগ তাদের ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছিল ‘কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়া হবে।’ এর প্রতিফলন কিছুটা দেখা গেলেও কৃষকের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কৃষক তাদের উৎপাদিত টমেটো, পেয়ারা প্রভৃতি ফল-ফসলের প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ হয়েছে। কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটের বিভিন্ন সেশনে তাদের দাবি ছিল উৎপাদিত পণ্যের ভ্যালু অ্যাড করার জন্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা। যেমন ঝালকাঠির পেয়ারা চাষিরা বলছিলেন, তাদের একটা জ্যাম-জেলি তৈরির কারখানা থাকলে মৌসুমের ফলন থেকে আরও বেশি দাম পাওয়া সম্ভব হতো। মুন্সীগঞ্জের কৃষক আলু চাষ করে লোকসান গুনছে। অথচ আমাদের বাজারে ভারতীয় আলুর চিপস দেদারসে বিক্রি হচ্ছে।

৫. বিগত বছরগুলোয় কৃষি গবেষণায় প্রচুর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এর পাশাপাশি গবেষণার সাফল্য কৃষকপর্যায়ে কতটুকু পৌঁছাল সেটুকুও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিদেশ থেকে যন্ত্র বা প্রযুক্তি আমদানি না করে দেশে সে যন্ত্র বা প্রযুক্তি তৈরি করার পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে যারা কৃষিযন্ত্র তৈরির পদক্ষেপ নিচ্ছেন তাদের উৎসাহ দিতে হবে।

৬. কৃষি উপকরণ কৃষকের হাতের নাগালে রাখতে হবে। বিশেষ করে বীজ নিয়ে কৃষক দুর্ভোগের শিকার হয়। কৃষকের জন্য মানসম্মত বীজের ব্যবস্থা করতে হবে। সারা বিশ্বে কৃষি দারুণ আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত হয়ে উঠেছে। ফলে কৃষি কৃষকের জন্য হয়ে উঠেছে সহজে। নতুন সব প্রযুক্তির সঙ্গে এ দেশের কৃষককে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। কৃষকের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন ফসল চাষ ও প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষককে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে। এমনকি ফল-ফসল রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা অনুসরণ করে কৃষক যেন উৎপাদন করে সে বিষয়েও কৃষককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

৭. কৃষি এখন শিল্প। সারা পৃথিবীই প্রযুক্তির কৃষির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কৃষির ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে নিশ্চিত লাভ জেনে শিল্পোদ্যোক্তারা কৃষিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করছেন। সাধারণ কৃষক এ ব্যয়ভার বহন করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কৃষকের জমি হারানোর ভয় যেমন আছে, আছে তার নিজের জমিতেই শ্রমিক হওয়ার আশঙ্কা। সে ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই একটা নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে কৃষক ও শিল্পোদ্যোক্তার মধ্যে একটা অংশীদারমূলক সম্পর্ক থাকবে।

৮. সামান্য একটি তথ্যই বদলে দিতে পারে কৃষির চিত্র। তথ্যপ্রাপ্তি কৃষকের জন্য সহজ করতে হবে। ডিজিটাল তথ্য কেন্দ্রগুলোকে কৃষকের তথ্য কেন্দ্রে রূপান্তর করার পদেক্ষপ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কৃষককে তথ্য কেন্দ্র সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন করে তুলতে হবে। কৃষকের তথ্য আদান-প্রদানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়বদ্ধতা আনতে হবে।

৯. অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সারা পৃথিবীই নগরকৃষিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। বড় বড় শহরে অট্টালিকায় চলছে পুরোদস্তুর চাষবাস। আমেরিকা, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, পর্তুগাল থেকে শুরু করে দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, জাপান, কোরিয়ায়ও নগরকৃষি আলোড়িত এক বিষয়। আমাদের দেশের আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনের নকশা অনুমোদনকালে ছাদকৃষির সুযোগ রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

১০. কৃষকের জন্য ভর্তুকি চালু রাখতে হবে। কৃষি ঋণ প্রাপ্তি যেন সহজ হয় এবং কম সময়ে পাওয়া যায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।