চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নিত্যপুরাণ: মায়াজালে আবদ্ধ দুই ঘণ্টা

রিভিউ:

গত শুক্রবারের কথা। সেদিন অফিস ছিল সকালে। অফিস, সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ও অন্যান্য ব্যস্ততায় দীর্ঘদিন একান্ত নিজের সাথে কিছু সময় কাটানো হয়ে উঠছিল না। ভাবছিলাম শুক্রবার বিকালে কী করা যায়! নিজেকে সময় দেওয়া, ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা অথবা মুগ্ধ হয়ে একদিকে চেয়ে থাকার মতো কী আছে?

খুব বেশি ভাবতে হলো না। সাধারণত একান্তে সময় কাটাতে চাইলে থিয়েটার বেছে নেই। দেড় দুই ঘণ্টা একাগ্রতার সঙ্গে বসে থাকা, লাল-নীল আলোর নিচে শিল্পীদের প্রতিভার বিচ্ছুরণ ও তাদের মর্মভেদী সংলাপ শুধু মঞ্চেই পাওয়া যায়। মনে পড়লো অনেক আগে একটা নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। ১৭ আগস্ট(শুক্রবার) দেশ নাটক’-এর ‘নিত্যপুরাণ’-এর বিশেষ পর্ব মঞ্চস্থ হবে। এখন পর্যন্ত দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয় করা শিরিন খান মনি, নাজনিন হাসান চুমকি, বন্যা মির্জা ও সুষমা সরকারকে দেখা যাবে এক সাথে। এক নাটকে চার দ্রৌপদী। মিস করা যায়!

দাওয়াত কবুল করলাম। অফিস থেকে চলে গেলাম সোজা শিল্পকলায়। টিকেট নিয়ে শিল্পকলায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে বসলাম নির্ধারিত আসনে। আলোছায়ার ঢেউয়ে তাল মিলিয়ে মিষ্টি সুরে বাজছিল রাগ। ধীরে ধীরে সব আলো নিভে গেলো। মঞ্চে শুনশান নীরবতা। জগত না জগতের বাইরে বোঝা যায় না। সময় না সময়ের বাইরে বোঝা যায় না। ক্ষীণ আলোয় নীরবতা ভাঙ্গে। মঞ্চে দেখা যায় বেদনাক্রান্ত একলব্যকে। মহাভারতের একলব্য নয়। মহাভারতের অনেক অনেক পরের একলব্য। যে একলব্য নিয়তিকে অস্বীকার করে গড়তে চায় নতুন নিয়তি। লিখতে চায় নিজের ভাগ্য। ভাঙতে চায় পঞ্চপাণ্ডবের কুটিল মহত্ত্ব।

মহাভারতের একলব্যকে প্রায় সবাই চেনেন। সেই একলব্য, যে সমরবিদ্যা লাভের আশায় দ্রোণাচার্যের দারস্থ হয়েছিল। একলব্য নিম্নবর্ণের, অ-ব্রাহ্মণ বলে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। দ্রোণাচার্য অর্জুনকে শেখান সমস্ত রণকৌশল। তৈরি করেন মহাবীররুপে। কিন্তু একটি প্রতিযোগিতায় দেখা যায় অর্জুনের চেয়েও বড় বীর একজন আছে। এমনসব সমরবিদ্যা সে জানে যা অর্জুন কল্পনাও করতে পারে না। এও কি সম্ভব! অর্জুন যায় গুরুর কাছে। গুরু শুনে অবাক। এমনটা কখনোই সম্ভব না। তিনি তো কাউকে শেখাননি। একলব্যের কাছে গিয়ে দেখা যায়, দ্রোণাচার্য একলব্যকে শিক্ষা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সে নির্জন জঙ্গলে গিয়ে গুরুর ভাস্কর্য বানায়। তারপর গুরুকে কল্পনা করে, তাকে মনের আসনে বসিয়ে কল্পগুরুর জগত তৈরি করে বাস্তবে শিখতে শুরু করে সমরবিদ্যা। ছাপিয়ে যায় মহাবীর অর্জুনকে। সরাসরি না শেখালেও তার  আধ্যাত্মিক গুরু দ্রোণাচার্য। একলব্যের কাছে গুরুদক্ষিণা চান। একলব্য এক বাক্যে রাজি হয়। গুরুদক্ষিণা হিসেবে দ্রোণাচার্য চান একলব্যের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল। আর কখনো তির ছুড়তে পারে না একলব্য। হেরে যায় একলব্য। কিন্তু প্রমাণিত হয় ব্রাহ্মণদের মিথ্যাচার।

নিত্যপুরাণ নাটকের একলব্য মহাভারতের একলব্যের পরিণতি জানে। এখন আর সে ভুল করতে চায় না। অস্ত্রচালনায় সর্বজ্ঞানে জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি কুটিলতায়ও পঞ্চপাণ্ডবের চেয়ে এগিয়ে থাকে।

অর্জুনের কুকুরের গলায় সাতটি তির বিঁধিয়ে শিকারে বের হওয়া পাঁচ ভাইয়ের মুখোমুখি হয় একলব্য। যে হরিণ শিকারের জন্য পঞ্চপাণ্ডব পাহাড় ডিঙ্গাতে যাচ্ছিল তুখোড় হিসাব নিকাশে তির ছুঁড়ে পাহাড়ের এপার থেকেই সেই হরিণবধ করে একলব্য। এসব দেখে পঞ্চপাণ্ডবের মাথায় আগুন ধরে যায়। এ যেন পঞ্চপাণ্ডবের মৃত্যুর হুমকি। তারা হত্যা করতে চায় একলব্যকে। কিন্তু শিকারে এসে হত্যার বিধান নেই। কী করা?  সমাধান দেয় পাঁচ দেবতার বড় দেবতা যুধিষ্ঠির। অর্জুনের সাথে প্রতিযোগিতা হবে। যে হারবে তার মৃত্যু। ধূর্ত একলব্য পরিষ্কার করে নেয়, এই লড়াই অর্জুনের একার না পাঁচ দেবতার পক্ষ থেকে অর্জুনের? একার হলে হারবে বা জিতবে শুধু অর্জুন। পাঁচ দেবতার পক্ষ থেকে হলে তার জয় পরাজয়ের সাথে জড়িয়ে যাবে পঞ্চপাণ্ডবের জয়-পরাজয়।

পাঁচ ভাই মিলে এক স্ত্রীর সংসার করা দেবতারা জানায়, পঞ্চপাণ্ডব শরীরে আলাদা। সত্ত্বায় এক। এ লড়াই পাঁচ দেবতার প্রতিনিধিত্ব করা অর্জুনের লড়াই।

দূর পাহাড়ের চূড়ায় অন্ধকারে, গাছের ডালে রাখা হয় দ্রৌপদীর একটি চুল। তির বিদ্ধ করতে হবে সেই চুলে। সর্বাস্ত্রবীদ অর্জুন লক্ষ্যভেদে বিফল হয়। পেঁচার পাখার বাতাসে নড়ে ওঠে চুল। অরণ্যচারী একলব্যের ভুল হয় না। নিখুঁত নিশানায় কয়েকগুণ বেশি মনোযোগে দ্বিখণ্ডিত করে দ্রৌপদীর কুন্তল। যার এক পাশ উড়ে এসে আদর মেখে দেয় একলব্যের মুখে।

পাঁচ দেবতাকে হত্যার বৈধতা পায় একলব্য। এরপরই শুরু হয় ক্ষমতাবান হঠাৎ ক্ষমতাহীন হলে কেমন দেখায় তার মঞ্চায়ন। একলব্য বর্ণবৈষম্যে পরিহাস করতে থাকে নানাভাবে। বহুবছর ধরে পঞ্চপাণ্ডবকে খতম করার জন্য একলব্য বানিয়ে রেখেছিল বিশেষ তির। দেখা যায় সেখান থেকে একটা নেই। পাখি ঠোঁটে করে নিয়ে গেছে।

শুরু হয় একলব্যের আরেক খেল। সিদ্ধান্ত নেয় একজনকে মুক্তি দিবে। পঞ্চপাণ্ডবের যে বাঁচতে চাইবে তাকে বাঁচিয়ে দেবে। পাঁচজনকে আত্মায় এক বলা হয়, আসলে তারা এক নয় তাই প্রমাণের চেষ্টা। একপর্যায়ে এই সমস্যা সমাধানের জন্য ডাকতে বলা হয় দ্রৌপদীকে। অর্জুনকে বলা হয় তির ছুঁড়ে সংকেত পাঠাতে। যুধিষ্ঠিরের পরামর্শে অর্জুন একটি নয়, এক সঙ্গে দুইটি তির ছুঁড়ে।

দ্রৌপদী হাজির হলে তাকে ফেলা হয় নির্মম এক পরীক্ষায়। পাঁচ স্বামীর মধ্যে দ্রৌপদী যাকে বেশি ভালোবাসে সেই পাবে মুক্তি। বাকি চারজনকে করা হবে সংহার। দ্রৌপদী কাকে বেশি ভালোবাসে কিংবা কে বেশি ভালোবাসে দ্রৌপদীকে। এমন এক দ্বন্দ্বের মধ্যে দেখা দেয় একলব্যের প্রেমিকরূপ। জঙ্গলে বসবাস করলে কী হবে, একলব্য প্রেম ও জীবনের যে সংজ্ঞায়ন দাঁড় করায় দ্রৌপদীর কাছে তা কেবল নতুনই লাগে না, বরং স্বর্গীয় লাগে। মোহিত হয়ে যায় দ্রৌপদী। একলব্য দ্রৌপদীর কাছে প্রেম ভিক্ষা চায়। একলব্যের ভাষায়, ‘কড়ে আঙ্গুলের নখ থেকে তুলে দেওয়া একফোঁটা প্রেম।’ দ্রৌপদী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় একলব্যের আকুলতায়। এক ফোটা প্রেম। যা পাঁচ স্বামীর ঘর করেও পায়নি দ্রৌপদী, অরণ্যচারী একলব্যও পায়নি কখনো।

ধর্মের খোলস পরে থাকা অধর্ম প্রায় পরাজিত। জয়ের ঘ্রাণ পেতে শুরু করে একলব্যের। তখন ঘটে অন্য ঘটনা। মঞ্চে হাজির দ্রোণাচার্য। সত্য গোপন করে অর্জুন আরেকটি তির ছুঁড়েছিল গুরুর উদ্দেশ্যে। প্রিয় শিষ্যের তিরবার্তা পেয়ে ছুটে এসেছেন গুরু। অর্জুনের গুরু। একলব্যের গুরু।

তারপর কী হয়?

একলব্য আবার গুরুর ফাঁদে পা দেয়? অধর্ম টিকে যায় ধর্মের খোলসে? নাকি এবার আর ভুল করে না একলব্য। ধরে ফেলে গুরুর চাতূর্যতা?

সে প্রশ্নে ঘুরপাক খেতে খেতেই একসময় আলো জলে ওঠে। শেষ হয় নাটক। শেষ হয় নিত্যপুরাণ। মোহভঙ্গ হয় দুইঘণ্টার। ফিরে আসতে হয় বাস্তব জগতে।

বাস্তবে ফিরে এলেও একলব্যকে উদ্দেশ্য করে দ্রৌপদীর শেষ বাক্যগুলো মাথায় বাজতে থাকে। ‘তুমি বীর নও। মানুষ। নারীকে নারী নয়। মানবরূপে জ্ঞান করার আশ্চর্য হৃদয় আমি তোমারই দেখলাম প্রথম। জগতের শ্রেষ্ঠ বীর আমি তোমাকেই জানলাম এবং শ্রেষ্ঠ মানুষ।’

সবার আগে নাট্যকার ও নির্দেশক মাসুম রেজা বাহবা পাওয়ার দাবিদার। মহাভারতের এমন গল্পকে বাস্তবতার আলোকে দেখার চেষ্টা করেছেন। শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্যের গালে কষে চপেটাঘাত করেছেন। একলব্যকে দিয়ে যা বলিয়েছেন তা যেন সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কথা।

‘ধূর্তরা কখনো কখনো বিজয়ী তাদের প্রতিপক্ষের কাছে কিন্তু সকল সময় পরাজিত হয় তাদের নিজের কাছে।’

‘কুলবের উচ্চতা নিতান্তই তৃণসম। আমার কৌশলের উচ্চতার আপনার কল্পনারও অতীত।’ ‘আচার আচরণের কোনো বর্ণজ্ঞান নেই।’ ‘আপনারা হলেন সর্বোচ্চ সুবিধাভোগী সৌভাগ্যবান। হস্তিনাপুরের সবচেয়ে অক্ষম যে, এরূপ সুযোগ পেলে সেও হতে পার তো আপনাদেরই সমকক্ষ বীর। ছোট কিংবা বড়, সাদা কিংবা কালো সব পাথরেই আগুন থাকে।’ এমনসব বাক্যবারুদ বর্ষণ করিয়েছেন একলব্যের কামান থেকে।

মহাভারতের সাথে মিল রেখে সংলাপে অনেক কঠিন শব্দ, সংস্কৃত ব্যবহার করেছেন। যা গল্পের বিশ্বস্ততা বৃদ্ধি করেছে। লাইট ও মিউজিক ছিল একশতে একশো। টানা সংলাপ ও দীর্ঘক্ষণ মঞ্চে থেকে টানা সংলাপ বলে যাওয়া একলব্য চরিত্রের মামুন চৌধুরী রিপন অসাধারণ। পঞ্চপাণ্ডবের মেকআপ ও শারীরিক ভাষা ছিল পারফেক্ট।

চার দ্রৌপদীর উপস্থিতি দর্শককে আটকে রেখেছে আরও বেশি।

সব মিলিয়ে দুই ঘণ্টা জাগতিক চিন্তা চেতনা থেকে ভিন্ন এক মায়াজালে আটকে রাখার সব উপাদানের জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন নাট্যকার, নির্দেশক মাসুম রেজা।

আবার যেদিন নিত্যপুরাণ মঞ্চস্থ হবে, হয়তো সবার আগে গিয়ে বসে থাকবো। এমন নাটক কয়েকবার দেখতে হয়। বারবার দেখতে হয়।

নাটকে একলব্য চরিত্রে রূপদান করেছেন মামুন চৌধুরী রিপন, ব্যাসদেব চরিত্রে আসিফ হাসান, যুধিষ্ঠিরের চরিত্রে কামাল আহমেদ, ভীমসেন চরিত্রে ফিরোজ আলম, অর্জুনের চরিত্রে লরেন্স উজ্জ্বল গোমেজ, নকুল চরিত্রে হোসাইন নিরব, সহদেবের চরিত্রে মাইনুল হাসান মাঈন, দ্রোণাচার্যের চরিত্রে সমাপন সরকার।

নাটক: নিত্যপুরাণ। নাট্যকার, নির্দেশক মাসুম রেজা। থিয়েটার: দেশ নাটক।