চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নিতান্তই প্রতারণার গল্প

দুপুর দেড়টা। উত্তরায় আজমপুর বাসস্ট্যান্ডে বাস থেকে নামলেন দীপা (ছদ্মনাম)। সাথে খাবারের ব্যাগ আর ছোট হ্যান্ডব্যাগ। ১৩ নম্বর সেক্টরের একটি হাসপাতালে ছোটবোনের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে যাচ্ছেন। বাস থেকে নেমেই পাশে দাঁড়ানো রিকশায় উঠলেন। বেশ নির্জন রাস্তা। কিছুদূর যাওয়ার পর চেইন পড়ে যাওয়ার কথা বলে থামে রিকশাওয়ালা।

বিজ্ঞাপন

চেইন ঠিক করে কিছুদূর গিয়ে রাস্তায় টাকা পড়ে থাকতে দেখে আবারো থেমে তা কুড়িয়ে নেয়। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর এক পথচারী রিকশাওয়ালাকে থামিয়ে একটা ঠিকানা জানতে চায়। এরপর নিজে থেকেই জানায়, এক ছেলে আর তার মা এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ৩ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের বিস্কুট হারিয়ে ফেলেছে। খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে সিএনজি অটোরিক্সায় করে চলে গেছে।

যাহোক, রিকশাওয়ালা আবারো চলতে শুরু করে। চতুর্থ দফায় আবারো থামে। এবারের কারণ চাকা পাঙ্কচার। পাশে দাঁড়ানো আরেক রিকশা ডেকে প্যাসেঞ্জারকে পৌঁছে দিতে বলে প্রথম রিকশাওয়ালা। অর্ধেক রাস্তার ভাড়া মিটিয়ে দীপা উঠে পড়েন নতুন রিকশায়। সে সময় খুচরা টাকা ফেরত দিতে গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া টাকা বের করে প্রথম রিকশাচালক। এরপর দ্বিতীয় রিকশাচালককে টাকা কুড়িয়ে পাওয়ার গল্প শোনায় প্রথমজন। তখনই ভাঁজ করা সেই টাকার ভেতর দেখে কাগজে মোড়ানো স্বর্ণের বিস্কুট। কোনো এক স্বর্ণকারকে উদ্দেশ্য করে কাগজে লেখা, ‘বিশ্বস্ত ছোটভাইকে দিয়ে ৩ ভরি ওজনের স্বর্ণের বিস্কুট পাঠানো হয়েছে। তা দিয়ে এক জোড়া চুড়ি আর চেইন বানিয়ে দিয়েন।’

এই ফাঁকে বলে রাখি, দীপার হাতে স্বর্ণের আংটি, চুড়ি, গলায় চেইন আর কানে স্বর্ণের দুল ছিলো। আংটিটা ছিলো দৃশ্যমান। প্রথম রিকশওয়ালা বলতে থাকে, কুড়িয়ে পাওয়া বিস্কুটটা মহাজনের কাছে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে ছোটবোনের বিয়ের জন্য অলংকার বানাবে। শুভাকাঙ্খী দ্বিতীয় রিকশাওয়ালা সাবধান করে দেয়। বোকামি না করার পরামর্শ দিয়ে বলে, মহাজন যেখানে মানুষকে পাওনা টাকাই ঠিকমতো দেয় না সেখানে স্বর্ণের বিস্কুট নিয়ে কি টাকা দেবে? তার চেয়ে জুয়েলারিতে যাওয়ার কথা বলে। তখন আবার প্রথমজনের যুক্তি, তার মতো মানুষের কাছে স্বর্ণের বিস্কুট দেখলে লোকজন চোর ভাবতে পারে, উল্টো বিপদে ফেলতে পারে জুয়েলারির লোকজন। এরকম কথাবার্তায় পথ চলতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

চাকা পাঙ্কচার হওয়া রিকশা টেনে দীপার রিকশার সঙ্গে পুরো পথ যেতে থাকে প্রথম রিকশাওয়ালা। এক পর্যায়ে দু’জনই দীপাকে বলতে থাকে সে যেনো বিস্কুটটা নিয়ে নেয়। কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস তাই দীপা যা দেবে তাতেই চলবে, কোনো ঝামেলাও হবে না। রিকশাওয়ালা দু’জনের পীড়াপীড়িতে দীপাও একসময় কনভিন্সড হয়ে গেলেন। তারও মনে হয়, গরিব রিকশাওয়ালার সাহায্য তো হবে! পরনের আংটি আর চেইন দিয়ে নিয়ে নেয় ‘স্বর্ণের বিস্কুট’।

রিকশা থেকে নেমেই বুঝতে পারলেন প্রতারিত হয়েছেন তিনি। এরপর শুরু হলো তার মানসিক যন্ত্রণা। সবকিছু ছাপিয়ে তার মনে হতে থাকলো, তার মতো এরকম আরো অনেকেই নিশ্চয়ই প্রতারক সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়ছেন! কী করে সবাইকে সচেতন করবেন তিনি!

দীপার মতো অনেকেই প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কখনো সুন্দর গল্প বা নাটকের ফাঁদ পেতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতারক-ছিনতাইকারীরা হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা-পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র। গল্পের জালে কাজ না হলে কখনও অস্ত্রের মুখে কখনও হামলা করে অর্থ-সম্পদের সঙ্গে প্রাণটাও কেড়ে নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়।

চারদিকে অবিশ্বাস, সন্দেহ আর আতঙ্ক। প্রতারণা-ছিনতাই ও সড়ক দুর্ঘটনার ভয়। পদে পদে যেন কোনো না কোনো ফাঁদ পাতা। কখন কোন ফাঁদ কার জন্যে অপেক্ষা করছে কে জানে! তবে হ্যাঁ, জনসচেতনতা আর সামাজিক প্রতিরোধে নিশ্চয়ই গুটি কয়েক মন্দের পরাজয় হবে। নিরাপত্তাহীনতা আর অবিশ্বাসের মধ্যেও তেমনই সুন্দর দিনের অপেক্ষায় আছে মানুষ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)