চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নদী একটি জীবন্ত স্বত্তা, তাকে বাঁচাতে হবে

নদীরও প্রাণ আছে। নদীও হাসে। কিন্তু নদীর স্বাভাবিক গতি প্রকৃতির উপর হস্তক্ষেপ করলে নদী কাঁদে। নীরবে রক্তক্ষরণ হয় নদীর বুকে। নদী একটি জীবন্ত স্বত্তা, তাকে বাঁচাতে হবে। নদীর অধিকার আছে আমাদের মত বেঁচে থাকার।

বিজ্ঞাপন

নদী বাঁচাতে নদীকে জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন নদী নিয়ে কাজ করা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষক এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা।

তারা বলেছেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দখল, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন করে নদী মেরে ফেলছি আমরা। কারণ নদীর অনুভূতিকে আমরা আমলে নেই না। নদীর নিজস্ব একটা স্বত্তা আছে সেটি আমরা ভাবিনা।

পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ‘রিভার: এ লিভিং বিয়িং’ নামের ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি দুই দিনব্যাপী একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলেনে এমন কথা উঠে আসে। আলোচকরা বলেন, নদীর অধিকার রক্ষায় এবং নদীকে নদীর মতো থাকতে দিয়ে তার অনুভূতিকে আমলে নিয়ে তার  স্বত্তার স্বীকৃতি দিতে হবে।

দু’দিনের আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের প্রথম দিনে মূল বিষয় তুলে ধরতে গিয়ে একশন এইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে আমাদের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। নদী মরে যাওয়ার প্রভাব পরে আমাদের জীবন-জীবিকায়। ফলে নদীকে নদীর মত থাকতে দেয়ার বিকল্প নেই। নদীর জীবনকে মানুষের মূল্যায়ন করতে হবে। এছাড়া নদী বাঁচানো যাবে না।’

অনুষ্ঠানের শুরুতে ফারাহ্ কবির একটি ধারণাপত্র তুলে ধরেন। ধারণাপত্রে বলা হয়, পানি এবং জীবন সমার্থক। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পানির অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে নদীর অধিকার এখনো ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পায়নি।

দক্ষিণ এশিয়া শত-শত নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত। যেহেতু এ নদীগুলোর অধিকাংশই আন্তঃসীমান্ত নদী, তাই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং মায়ানমারে বসবাসরত মানুষের কাছে এসব নদীর পানি একটি সাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ। যা মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

ধারণাপত্রে বলা হয়, নদীরও অনুভূতি আছে। আছে বেঁচে থাকার অধিকার। এজন্য একে বাস্তবিক ও আইনগতভাবে জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিৎ। তখন নদীকে নদীর মতো থাকতে দেয়া আরো বেগবান হবে। এক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড এবং ভারতের দৃষ্টান্তকে বিবেচনায় নেয়া যায়, যেখানে আইন প্রণয়ন এবং আদালতের বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে নদীকে মানুষের মতই সমান আইনগত অধিকার দেয়া হয়েছে। হোয়াঙ্গানুই, গঙ্গা এবং যমুনা নদীর এখন আইনগত অধিকার আছে, যার অর্থ হল এদের অবশ্যই জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, ‘নদীকে বাঁচাতে হলে আমাদের নদীকে ভালভাবে বুঝতে হবে। নদী একটি জীবন্ত স্বত্তা। আমাদের এই জীবন্ত স্বত্তাকে ভালভাবে বুঝতে হবে। নদীর অনুভূতিকে বুঝতে হবে। এসব অনুধাবনের পর নদী বিষয়ক প্রকল্প হাতে নিতে হবে। নদীর যে স্বত্তা আছে সেটি বুঝা যায় যখন নদী মরে গেলে মানুষের উপর তার প্রভাব পরে। নদী যখন খারাপ থাকে তখন মানুষের জীবনেও খারাপ প্রভাব পড়ে। নদী যে একটি জীবন্ত স্বত্তা তা আমরা আমলে নেই না।

কারণ নদীর অধিকার ও স্বত্তা আমার ধ্বংস করছি দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত পরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরির্তনের মাধ্যমে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরো বলেন, ‘নদীকে জীবন্ত  স্বত্তা হিসেবে স্বীকৃতির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের নদীকেন্দ্রিক এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে।’

আলোচনায় আরো উঠে আসে, নদীকে জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার মূল বিষয়গুলো। এক্ষেত্রে পানির অধিকার এবং সাধারনের সুরক্ষা, পানি গণতন্ত্র, পানি বিষয়ক উদ্ভাবন এমন বিভিন্ন ধ্যান-ধারণার বিনিময় এবং সংলাপকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

সম্মেলনে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নদীর স্বত্তাকে বাঁচানোর কথা বলা হয়েছে। পানি, শক্তি, জীববৈচিত্র্য ও নদীবাহিত পলি, এই চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে নদীর বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন আলোচকরা।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের বেশিরভাগ নদী জীবন্ত  স্বত্তা থেকে মৃত স্বত্তায় পরিণত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানই নদী নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু কেউ নদীকে জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে বিবেচনা করছে না। উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে নদী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব আমাদের জীবনেও পড়ছে। এজন্য নদীকে নদীর মত থাকতে দিতে হবে। তার অনুভূতিকে বুঝতে হবে’।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে পানি দরকার; জীবনের জন্য পানি দরকার। সেই পানিই যদি না থাকে তবে আমরা থাকতে পারব না। বাস্তবতা হলো আমরা নদীগুলো মেরে ফেলছি। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ আমরা করতে পারি না। যারা প্রয়োগ করবেন তারা তা করেন না বা করতে পারেন না। নদীর মালিক রাষ্ট্র। রাষ্ট্র নদীর স্বত্তাকে বাঁচাতে আইন করেছে। তবে পরিকল্পনায় অনেক গলদ আছে। আছে সমন্বয়ের অভাব।

তিনি আরো বলেন, ‘পানি ও নদী নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেশন নদীকে তার মত থাকার অধিকার দিয়েছে। তবে রাষ্ট্রগুলো যখন এটি না মানে তখন তার প্রভাব ভাটির দেশে বেশি পরে। আমরা তার উদাহরণ। নদীর অধিকার রক্ষায় সব দেশগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে।’

আলোচনায় আসে জলবায়ু ন্যায্যতা বিষয়টিও। যেখানে বলা হয়, নদীপাড়ের মানুষ প্রতিনিয়তই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির শিকার। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এই ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সব মিলিয়ে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের যুগে বিভিন্ন দেশের মানুষের সক্রিয় কর্মকান্ড এবং উদ্যোগ কোন সাধারণ বিষয়কে এগিয়ে নেয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

এক্ষেত্রে, নদীর অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের উদ্যোগ অ্যাডভোকেসির বিষয় নির্ধারণের জন্য এই সম্মেলনের ধারণাগুলোর যোগসূত্র স্থাপন করে।

দুইদিনের এই সম্মেলনের প্রথম দিনে পানি ও শক্তি এবং জীববৈচিত্র্য ও নদীবাহিত পলি বিষয়ক মোট ছয়টি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গবেষকরা।

এছাড়া ‘নদী ও জলের ছবি’ বিষয়ক ভিন্নধর্মী ছবি প্রদশর্নীর আয়োজন করা হয় সম্মেলনে।

পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন ব্যান্ড দল ‘জলের গান’-এর সদস্যরা।

সম্মেলনের শেষদিন জলবায়ু ন্যায্যতা, এবং আন্ত:সীমান্ত নদী ও নদীর অধিকার রক্ষায় সাধারণ মানুষের উদ্যোগ বিষয়ক মোট নয়টি প্রবন্ধ উপস্থাপনের মাধ্যমে নদীকে জীবন্ত স্বত্তা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানানো হয়।