চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নটরডেম ক্যাথেড্রাল যখন পুড়ছে, তখন আমিও পুড়ছি স্মৃতির অনলে

আগুনের লেলিহান শিখায় যখন পুড়ছে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন চার্চ- নটরডেম ক্যাথেড্রাল তখন আমিও পুড়ছি স্মৃতির অনলে।

বিজ্ঞাপন

পুড়ছি অনন্য দুর্লভ স্মৃতির সুখ-সৌভাগ্যের আরেক যাতনায়। ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনের নিউজ কাভার শেষে ফ্রান্স দেখার সুযোগ হয়েছিলো। তখন খুব সংক্ষিপ্ত এক ঝটিকা সফরে দেখার সুযোগ হয়েছিলো ফ্রান্সের- ই নয় বিশ্বের বৃহত্তম ও বহুল জনপ্রিয় প্রাচীন এই চার্চটি।

পৃথিবীর বৃহত্তম ও বহুল পরিচিত ক্যাথেড্রালের একটি, যার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১১৬৩ খ্রিষ্টাব্দে এবং নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ। ফ্রেঞ্চ রাজতন্ত্র’র সঙ্গে এই নটরডেম ক্যাথেড্রালের সম্পর্ক সুগভীর। সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে রাজাদের রাজ্যাভিষেক এই নটরডেম ক্যাথেড্রালেই হত।

সংস্কার কাজ চলাকালীন ৮৫০ বছরের পুরনো ক্যাথেড্রালটি ১৫ এই এপ্রিল ২০১৯ পোড়ার দৃশ্য দেখে কেঁদেছে ফরাসীরা। কেঁদেছি আমিও কারণ বহুদিনের জমানো অর্থে বহুব্যয় করে বহু ক্রোশ দুরের এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজটি সেদিন মাত্র এক চক্করে ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয় সময়ের অভাবে।

নটরডেম ক্যাথেড্রালটি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের উপাসনালয় চার্চ হলেও প্রায় হাজার বছরের শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম সাক্ষীও বটে। তাই ভবিষ্যতে সময় নিয়ে ঘুরে দেখার সম্ভাবনা জ্বলে গেল আগুনের লেলিহান শিখায়। ৮৫০ বছরের প্রাচীন ভবনটি পুরোপুরি তৈরি করতে সময় লেগেছিল দুই শতক-নির্মাণ কাজ চলেছে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতক ধরে। এটি ফ্রান্সের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনার একটি। এই ক্যাথেড্রাল দেখতে প্রতিবছর প্যারিসে লাখ লাখ পর্যটক ভিড় জমায়। ফরাসি ইতিহাসবিদ কামিলি পাস্কাল তাই দারুণ দুঃখ নিয়ে বলেছেন,আগুন ধ্বংস করে দিচ্ছে ‘অমূল্য ঐতিহ্য’। ৮৫০বছর ধরে এই ক্যাথেড্রাল প্যারিসে দাঁড়িয়ে ছিল।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খুশির এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় নটরডেমের ঘণ্টাধ্বনি তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে। নটরডেমের মত অন্য কোন নিদর্শন বা জায়গা ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেনা। জাতীয় প্রতীক হিসেবে এর কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বী আইফেল টাওয়ার।

১২০০ শতক থেকে প্যারিসে দাঁড়িয়েছিল নটরডাম। । ভিক্টর হুগোর ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নটরডেম’ ফরাসিদের কাছে নটরডেম ডি প্যারিস হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল।

ঝটিকা সফরে ফ্রান্সের ঐতিহ্যময় ‘নটরডেম ক্যাথেড্রালের সামনে একটি ছবিও ছিলো। তবে এই ঐতিহ্যময় স্থাপনার দুইপাশ ঘিরেই রয়েছে ঐতিহ্যের ছড়াছড়ি।

বিজ্ঞাপন

কারণ নটরডেম ক্যাথেড্রালের অদূরে রয়েছে আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ। ফরাসি ভাষায় যা Arc de triomphe de l’Étoile ‘বিজয় খিলান’ নামে পরিচিত। এই বিজয় খিলান প্যারিসের তথা ফ্রান্সের একটি বিখ্যাত স্মৃতিসৌধ যা অভিজাত এবং বিখ্যাত শঁজেলিজে মহারাস্তার পশ্চিম প্রান্তে প্লাস দ্য লেতোয়াল ‘তারকা চত্বর’; বা সড়কের মহাসমুদ্র বা এক যোগে ১২ টি রাস্তার মহা মিলনস্থল এর কেন্দ্রে অবস্থিত।

এর একদিকে রয়েছে বিখ্যাত লুভ মিউজিয়াম অন্যপাশে ফ্রান্সের আর্থিক  প্রতিষ্ঠানগুলো। সেই বিশ্বের সবচেয়ে মহামূল্যাবান সামগ্রী বিক্রেতাদের শো রুমের রাস্তায় দাঁড়িয়ে অভিনব এক কাজ করেছিলাম আমি।

রাস্তাগুলো এত ঝকঝকে ছিলো যে আঙুলের ডগা রাস্তায় ঘষে তা নিজ গালে ছুঁয়েছিলাম। কিন্তু আশ্চর্য পথের বিছানো কালো পাথরের সেই রাস্তাটি এতটাই সমৃণ আর ধুলোহীন ছিলো যে, নিজের শরীরের সবচেয়ে স্পর্শ কাতর স্থানে ছোয়াতেও কুণ্ঠাবোধ হয় নি। তখন আরেকবার দেশের কথা মনে হয়েছিলো।

জেনেছিলাম শতবছরের ঐ রাস্তার পাথর খয়ে এতটা মসৃণ হয়েছে আর সকাল বিকাল গরমপানি-সাবানে ধৌত করা হয়। তাই এই আলিশান রাস্তার মসৃণতা নিজ হাতে ছুঁয়েছি আর আমার সোনার বাংলার রাস্তাঘাট এরকম শতবছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী তৈরি হবে কবে তা ভেবেছি। আর ঐসব রাস্তা টিকে থাকবে আরও শতবছর !কবে হবে এমনতর আশায় বুক বেঁধেছি!

বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পকলা জাদুঘর এবং ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি ঐতিহাসিক লুভ্য জাদুঘর। বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পর্যটক পরিদর্শন করেছে শিল্পকলার এই জাদুঘরটি। ইতিহাস বলছে, লুভর জাদুঘরটি লুভর প্রাসাদে অবস্থিত।

ফ্রান্সের রাজা ২য় ফিলিপ প্রাসাদটিকে আদিতে ১২শ থেকে ১৩শ শতকে একটি দুর্গ হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। জাদুঘরের ভূমিনিন্মস্থ তলাতে এখনও এই দুর্গের অবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। সময়ের সাথে সাথে প্যারিস নগরীর আয়তন বৃদ্ধি পেলে দুর্গটির প্রতিরক্ষামূলক সুবিধাটির দরকার ফুরিয়ে যায়।

১৫৪৬ সালে ফরাসি রাজা ১ম ফ্রঁসোয়া এটিকে ফরাসি রাজাদের মূল বাসভবনে রূপান্তরিত করেন। সেই ফ্রান্সের প্রাণকেন্দ্রের দৃশ্যমান সারি সারি এক প্রান্তে নটরডেম ক্যাথিডালের সুউচ্চ খিলান ভেঙে পড়ায় নিশ্চিতভাবে অনিন্দ্য ফ্রান্সের অনন্য সৌন্দর্যের অঙ্গহানি হলো ।

তাই ব্যথিত হৃদয়ে বলতে চাই, কী হলো হায় আজ প্রকৃতির? পুরাতন ঢাকা থেকে বনানীর এফ আর টাওয়ার, সেখান থেকে হাজার মাইল দূরের আটলান্টাটিক পাড়ি দিয়ে সৌন্দর্যের অনিন্দ্য ভুবন নটরডেম ক্যাথেড্যালে কোন ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে গেল!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)