চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধোনির জানা উচিত ক্রিকেট শুধু একটা খেলা, যুদ্ধ নয়

ভারতীয় দ্য প্রিন্টের সম্পাদকমণ্ডলীর প্রধান শেখর গুপ্ত’র লেখা অবলম্বনে

‘রাজনীতি ভাগাভাগি করে, খেলাধুলা একত্রিত করে’ -আমরা গতানুগতিক এই উক্তি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারছি না। এমনকি আইসিসির বিশ্বকাপের সময়ও না, যে শিরোপা ভারত দুইবার জিতেছে।

বিজ্ঞাপন

এখানে একটা অপরিহার্য শর্ত আছে: এটা একত্রিত করে, কিন্তু স্বপক্ষে। ভারতীয় হিসেবে আমরা যেমন আমাদের দলের পেছনে একত্রিত হই। অন্যরা তাদের দলের পেছনে হয়। মহেন্দ্র সিং ধোনি সেনাবাহিনীর প্রতীক অর্থাৎ ‘ফ্লাইং ড্যাগার’ আঁকা উইকেটকিপিং গ্লাভস হাতে উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে সেই আইসিসি ধোনির এই কাজে আপত্তি তুলেছে। আইসিসির নিয়মানুসারে কোনো খেলোয়াড় তাদের খেলার সরঞ্জাম বা পোশাকে কোনো বাণিজ্যিক, ধর্মীয় ও মিলিটারি লোগো লাগাতে পারে না।

সেই সমস্ত লোগোই ব্যবহার করা যায়, যে স্পন্সরগুলো, যাদের সঙ্গে আইসিসির চুক্তি আছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বোর্ড দ্বারা অনুমোদিত। তবে সেখানে জাতীয় প্রতীক অনুমোদন করা যেতে পারে। যেকোনো কিছু অনুমোদন করা যায় না। আর যেকোনো সামরিক ব্যাপার তো নিঃসন্দেহেই না। কারণ, এটা খেলাধুলার একটি ক্ষেত্র, সামরিক যুদ্ধ নয়।

ধোনির গ্লাভস থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই ‘বলিদান’ চিহ্ন তুলে ফেলার জন্য ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে অনুরোধ জানায় আইসিসি। যদিও বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে ধোনি এই উইকেটকিপিং গ্লাভস পরেই খেলবেন বলে প্রথমে জানিয়ে দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। এ ব্যাপারে বিসিসিআই আইসিসিকে অনুরোধ করে চিঠিও দেয়। তবে আইসিসি না মানায় শেষ পর্যন্ত ওই ‘প্রতীক’ ছাড়াই নামবেন ভারতের বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অধিনায়ক।

গ্লাভস বিতর্কে অনেকেই ধোনির পাশে দাঁড়িয়েছেন। জনপ্রিয় মতামতও আছে ধোনির গ্লাভস বিতর্কের পেছনে। এটা নিয়ে চিন্তা করুন: বিশ্বকাপে টিম ভারত, মহেন্দ্র সিং ধোনি এবং আমাদের বীরত্বপূর্ণ বিশেষ বাহিনী, যারা দীর্ঘদিন আগে পোস্ট-উরি ঘটনায় শুধু সার্জিক্যাল স্ট্রাইকই করেনি, সেটি দিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে আরও কিছুটা রঙিনভাবে তা অমর করে তুলেছিল। কিন্তু কোন ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এই অপ্রত্যাশিত ট্রিপল-চুম্বকের অন্যদিক নিয়ে তর্ক করবে?

কিন্তু কাউকে না কাউকে তো সেটা করতে হবে এবং বলতে হবে আইসিসিই ঠিক। ধোনির উচিত গ্লাভস থেকে ‘বলিদান’ চিহ্ন সরিয়ে ফেলা। খেলার মাঠ যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক, সেখানে হত্যা বা হত্যা করার প্রতীকের কোনো জায়গা থাকা উচিত নয়। আর এ জন্যই আমাদের কাউকে না কাউকে স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতরানোর সাহস করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের মধ্যে যারা খেলাধুলাকে ভালোবাসে এবং ভারতের জয় দেখতে চায়।

যদি আমাদের ক্রীড়া জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেটা উঠতেও পারে। তাহলে যিশু খ্রিস্টের ধার করা পুরানো একটি লাইন সান্ত্বনাদায়ক হতে পারে: বাবা, তাদের ক্ষমা করুন, কারণ তারা (যারা আমাদের দেশপ্রেমিক হওয়ার অভিযোগ করে) তারা কি করছে তা জানে না।’

আসুন আমরা প্রথমে ‘জাতীয়তাবাদীদের’ এবং তাদের তূরীবাদক বিতর্কগুলোর তালিকাভুক্ত করি, যা কমান্ডো-কমিক চ্যানেলে ইতোমধ্যে ক্ষতিকারক হ্যাশট্যাগ চালাচ্ছে যেমন #ধোনিকিপ দ্য গ্লাভস।

প্রথমত, আমাদের অবশ্যই সশস্ত্র বাহিনীকে সম্মান করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে ভারতকে দোষ দেয়া হচ্ছে, তাই যেখানেই তারা উপস্থিত থাকবে সেখানে একটি বিবৃতি অবশ্যই তৈরি করা উচিত।

তৃতীয়ত, আপনি নিজের পছন্দ অনুযায়ী একজন ব্যক্তিকে অস্বীকার করতে পারবেন না, বিশেষ করে ধোনি বিশেষ বাহিনীর একজন সম্মানিক লেফ. কর্নেল। প্যারাসুট জাম্পে যোগ্যতা অর্জনের পর তিনি সেনাবাহিনীর প্রতীক অর্থাৎ ‘ফ্লাইং ড্যাগার’ অর্জন করেছেন। আপনি তাকে তার ফৌজি উর্দির জন্য অস্বীকার করতে পারেন না।

কিন্তু তৃতীয় উত্তর সহজ: তার (ধোনি) রেজিমেন্ট ভারতের হয়ে ক্রিকেট খেলছে না। বরং তারা ভারতের জন্য খারাপ লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। কিন্তু এই সৈন্য যুদ্ধের সময় বিসিসিআই’র লোগো বুকে লাগাচ্ছে না। এছাড়া ভারতের হকি বা অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনও সেটা করছে না। যদিও তাদের সবাই ভারতের গর্ব ও গৌরবের প্রতিনিধিত্ব করে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের অবশ্যই সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান করা উচিত এবং সেটা করাও হয়। কিন্তু এরপরও, এই বক্তব্য, কাশ্মীরে পাকিস্তানিরা যা করছে তার প্রতিবাদ হিসাবে, লর্ডস, ওল্ড ট্র্যাফোর্ড বা ওভালে আমাদের ক্রিকেটারদের দ্বারা তেমনটা করা উচিত? সেটা আসলে অর্থহীন।

প্রতিবাদ রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিকদের মাধ্যমে করা হয়, আর যুদ্ধ সৈন্যরা করে। ক্রীড়াবিদরা তাদের ক্রীড়া ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তাদের সামরিক বাহিনীর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়ার মাধ্যমে নয় বরং জয়লাভের মাধ্যমে তাদের জাতির জন্য গৌরব বয়ে আনেন।

কারণ এটা খেলা, যেখানে দুজন খেলে। একজন ভারতীয় তার সেনাবাহিনীর রঙে পরিণত হলে, পাকিস্তানিরাও সেটা করতে পারবে। ক্রিকেট এমন একটি খেলা যা তাদের মধ্যে একজনই জিততে পারে। কিন্তু সেটি সেনাবাহিনীর রঙে পরিণত হলে সামরিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিতে পারে। এমনটা হলে তা দ্রুতই সমর্থকদের মধ্যে চলে যাবে এবং বিশেষ করে সেটা ভারত ও পাকিস্তানিদের মধ্যে। তখন এটা অতীতের ইরান ও ইরাক যুদ্ধের মতো তিক্ত প্রতিযোগিতার স্মরণে শত্রুতা ঘটাবে।

১৯৪৫ সালে জর্জ অরওয়েল তার দূরদর্শী প্রবন্ধ ‘স্পিরিট অব স্পোর্টসে’ লিখেছেন, ‘আন্তর্জাতিক স্তরের খেলা সত্যিকারভাবে যুদ্ধের অভয়ারণ্য।’ তিনি বলেছিলেন, ‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হল খেলোয়াড়দের আচরণ কিন্তু দর্শকদের আচরণের মনোভাব নয় এবং দর্শকদের পেছনে জাতি নিজেই উন্মত্ততার আচরণ করে।’

আমাদের পুরুষ ও মহিলা অ্যাথলেটরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় অনেকবেশি সাফল্যের সাথে, তবে সেটা অপহরণশীল বা ‘বন্দী-বন্দী’ যুদ্ধের মনোভাব প্রদর্শন করে নয়, বরং কেবলমাত্র খেলেই। খেলার সময় এবং পরে দুই দল বন্ধুত্বপূর্ণ এবং স্পোর্টিং স্পিরিট নিয়ে একে অপরের পরিবার এবং সন্তানদের শুভেচ্ছাও জানিয়েছে।

এই সন্ধিক্ষণ, সৌভাগ্যক্রমে, আসলেই যুদ্ধ হয়নি– বালাকোটে একটি ছোট্ট সংঘর্ষ ছিল যা প্রায় তিন মাস আগে ঘটে। ১৯৭১ সালে যখন ভারত-পাকিস্তান তুমুল (আসলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ) যুদ্ধ চলে তখনও সুনীল গাভাস্কার এবং জহির আব্বাস বিশ্ব একাদশের হয়ে এক দলে অস্ট্রেলিয়ায় খেলেছেন। যখন আবার আইএএফ (ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স) নিয়মিতভাবে করাচিতে বোমা হামলা চালায়।

আরও একটা এমন ঘটনা ঘটে। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডেই যখন বিশ্বকাপে দুদল দিনের বেলা মুখোমুখি হয়েছিল, ঠিক তখন (ভারত-পাকিস্তানে রাত) কার্গিলে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে। সেসময়ও দুদলের খেলোয়াড়রা একে অপরের সঙ্গে হ্যান্ডসেক করেছে, মাটিতে পড়ে যাওয়া খেলোয়াড়কে হাত ধরে টেনে তুলেছে, প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানের খুলে যাওয়া জুতার ফিতা বেঁধে দিয়েছে। তখন কেউই টাইগার হিলের (যুদ্ধক্ষেত্র) কথা ভাবেনি।

সামরিক প্রতীক, তাদের ল্যানার্ড এবং অ্যাপলেটাইট, পদক, স্ট্রিং এবং ফাইনারি, ব্যান্ড, মার্চে এবং স্টাইলের ইউনিফর্ম সবকিছুই নিরানন্দ। যেখানে সাফল্য বা ব্যর্থতা যুদ্ধে বিজয় বা পরাজয়ের মতো দেখায়।

যেকোনো খেলার মতো– ১৬জুন ম্যানচেস্টারে ভারত-পাকিস্তান লিগ ম্যাচেও একদল জিতবে, অন্যটি হারবে। তাহলে কি সেই যুদ্ধে আপনার সেনাবাহিনীও হেরে যাবে? ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে উভয় পক্ষ যদি তাদের ‘বাহিনী’ জড়ো করে তাহলে কী হবে? কিছু ঘটলে ব্রিটিশ পুলিশ কী তা সামাল দিতে পারবে?

এই পয়েন্টে আমরা আবার অরওয়েলে ফিরি। ১৯৩৬ সালে বার্লিন অলিম্পিকের উদাহরণ টেনে তিনি লিখেছেন, ‘আমি সর্বদা আশ্চর্য হই, যখন আমি শুনি যে, খেলা জাতিগুলোর মধ্যে সৌভাগ্যর সৃষ্টি করে এবং বিশ্বের যে সাধারণ মানুষ ফুটবল বা ক্রিকেটে একে অপরের সাথে খেলে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষেত্রে মুখোমুখি হওয়ার কোনো প্রবণতা পায় না।’ তিনি ঠিক বা বেঠিক উভয়টাই হয়তো ছিলেন। কিন্তু বার্লিন অলিম্পিকের ঠিক তিন বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে যায় বিশ্ব।

বিশ্বযুদ্ধ ও ঠাণ্ডা যুদ্ধের পর থেকে মানব সভ্যতা এগিয়ে চলেছে। ঘন ঘন খেলাধুলার যোগাযোগ বিষাক্ত ও পুরনো শত্রুদের জন্য একটি প্রতিষেধক হয়ে উঠেছে। এটি খেলোয়াড়দের, তাদের ভক্তদের, তাদের পরিবার এবং বন্ধুদেরকে একে অপরের সম্পর্কে আরও জানতে, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তুলতে, কখনো কখনো এমনকি খেলাধুলার মাধ্যমে একে অপরের সাথে মিলে তাদের হতাশাকে দূর করতে সহায়তা দেয়।

আমি প্রশংসা করি যে, আজ এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক জনপ্রিয় নয়, আবার রাজনৈতিকভাবেও সঠিক নয়। কিন্তু, অলিম্পিক থেকে পিং-পং, বাস্কেটবল থেকে ক্রিকেট, ফুটবল থেকে হকি, নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতামূলক খেলা সামরিক শত্রুতার প্রান্তকে মসৃণ করতে সাহায্য করেছে, আমাদের মনের উপরের ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করেছে।

আমরা অবশ্যই সেনাবাহিনীর একজন ব্যক্তিকে বিশেষ ভক্তি শ্রদ্ধা করি, বিশেষ করে সেটি সম্মানের সাথে প্রদর্শনও করি। উদাহরণস্বরূপ, ধোনি তার বিশেষ বাহিনীর ‘পোশাকে’ পদ্মভূষণ পুরস্কার গ্রহণ করেন, যার মধ্যে মেরুন টুপিও রয়েছে। এটি একটি পুরোপুরি ভালো ইঙ্গিত ছিল।

সেনাবাহিনীর একজন সদস্য হলেও ধোনি তার রেজিমেন্টকে মাঠে নিতে পারেন না। স্টাম্পের পেছনে তিনি কখনোই হত্যাকারীর প্রবৃত্তি নিয়ে থাকতে পারেন না। ক্রিজের ব্যাটসম্যানকে ক্যাচ আউট করে প্রতিবার তার হাতের তালুতে ‘ড্যাগারের’ অনুপ্রেরণা অনুভব করতে পারেন না। প্রতীক থাকুক বা না থাকুক, স্টাম্পের পেছনে একমাত্র গ্লাভস জোড়াই ধোনির জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে থাকবে!