চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে মোদিতে মুগ্ধ আমাদের বুদ্ধিজীবীরা!

সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতার সময় যারা তুমুল করতালিতে তাকে সম্মানিত করেছেন তারা সবাই নিশ্চয়ই মোদির রাজনীতিতে আমোদিত নন। বিশেষ করে মোদির দল বিজেপির দর্শন এবং বাংলাদেশী ওই বরেণ্যজনদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে আদর্শিক জায়গার ফারাক খুবই স্পষ্ট।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে তা হলে আমরা মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র দর্শনটা একনজর চোখ বুলাই। নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিজেপির দর্শন হিসেবে এক কথায় ‘হিন্দুত্ব’র কথা উল্লেখ করা আছে। ঢাল হিসেবে যদিও এই ‘হিন্দুত্ব’-কে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে না দেখে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা আছে, কিন্তু তাদের অতীত কর্মকাণ্ড এবং ‘সংঘ’ পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করে, এখানে পুরো বিষয়টাই ধর্মকেন্দ্রিক।

‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’ বা আরএসএসের সঙ্গে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বিজেপি গৌরবের সঙ্গে নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রচার করেছে এভাবে: আরএসএসের যত্নে গড়া ভারতীয় জনতা পার্টি আজ ‘সংঘ পরিবার’র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সদস্য। সঙ্গে তারা একথাও বলে যে আরএসএসের মতো বিজেপিও একক ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী।

আরএসএস এবং বিজেপির কাছে সেই একক ভারতীয় সংস্কৃতি যে ধর্ম সেটা তারা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কর্মকাণ্ড এবং বক্তৃতা-বিবৃতিতে বারবারই প্রমাণ করেছে। গুজরাট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নাম জড়িয়ে খোদ নরেন্দ্র মোদিও সেটা থেকে ব্যতিক্রম কিছু নন।

নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের ঠিক আগে আগেই আরএসএসের বর্তমান প্রধান মোহান ভগবতের জন্য ‘জেড-প্লাস’ সিকিউরিটি নিশ্চিত করেছে মোদি সরকার। ভারতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এই সর্বোচ্চ ‘জেড-প্লাস’ নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন।

ধর্মীয় রাজনীতির চর্চা করা বিজেপি ক্ষমতায় থাকলে আরএসএস এরকম সর্বোচ্চ সম্মান পেলেও ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেসের সময় কয়েকবার নিষিদ্ধ হয়েছে আরএসএস। এর প্রথমটি সাবেক আরএসএস কর্মীর গুলিতে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী নিহত হওয়ার পর। ইন্দিরা আমলে জরুরি অবস্থার সময় আরএসএস নিষিদ্ধ হয়। আর বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাময়িক নিষিদ্ধ হয় ‘সংঘ পরিবার’র সদস্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার সময় নরেন্দ্র মোদি রাজনীতিতে বড় কোনো নাম ছিলো না। তাই সেখানে তার ভূমিকার কোনো উল্লেখ নেই। তবে সেদিন ‘সংঘ পরিবার’র যে দেড় লাখ কর্মী জড়ো হয়েছিলো তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মোদির নেতা লাল কৃষ্ণ আদভানি।

ঘটনার ১০ দিন পর নরসীমা রাও সরকার যে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করে ১৬ বছর ধরে তারা ৩৯৯টি বৈঠক করে ২০০৯ সালের ৩০ জুন রিপোর্ট জমা দেয়। এতে বলা হয়, অযোধ্যার ঘটনা স্বতঃস্ফূর্ত ছিলো না, অপরিকল্পিতও ছিলো না। বিজেপি এবং ভিএইচপিসহ ‘সংঘ পরিবার’র সদস্যরা ছয় মাস ধরে পরিকল্পনা করে ওই ঘটনা ঘটায়।

বিজ্ঞাপন

মূলতঃ বাবরি মসজিদের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান। সেই পথেই আজ নরেন্দ্র মোদি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী। গণতন্ত্রকে যেহেতু আপনি অসম্মান করতে পারেন না, তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও আপনাকে সম্মান জানাতে হবে। সেই সম্মানের জায়গা থেকে ‘নিষিদ্ধ তালিকা’ থেকে মোদির নাম মুছে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

একইরকম সম্মানের জায়গা থেকে হয়তো বাংলাদেশের বরেণ্যজনরা নরেন্দ্র মোদির জনবক্তৃতায় তাকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ দিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বাস করতে চাই, নিশ্চয়ই তারা মোদির ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চর্চাকে বিরোধিতা করবেন। কারণ বাংলাদেশের এই বিশিষ্টজনেরা তাদের রক্তের মধ্যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিবিরোধী। বক্তৃতা-বিবৃতিতে তারা সেটা বারবার প্রমাণ করেছেন।

তাদের সেই প্রমাণের কিছু উদাহরণ আমরা দেখতে পারি।

মোদির সফরের মাসখানেক আগে ১০ মে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা বাসস পরিবেশিত খবরে দেখা যায় ‘গণতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম’ বিষয়ক এক আলোচনা সভায় বক্তৃতা করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সংবাদটিতে বলা হয়েছে: অধ্যাপক আনিসুজ্জামান দেশ থেকে সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নির্মূলে সরকারের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রধর্মকে ইসলাম করার মধ্য দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা দেশ জুড়ে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।

তাঁর মতোই অবস্থান ড. কামাল হোসেনের। দৈনিক ইত্তেফাকে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি খবরে দেখা যায় বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ধর্মকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা আমাদের জাতিগত ঐক্য ধ্বংস করে।

এরকম ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও’ কনভেনশনে ‘ধর্মের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানোকে দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সেই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।’ (কালের কণ্ঠ, ৬ অক্টোবর, ২০১৩)

কনভেনশনের যারা আয়োজক ছিলেন এবং কনভেনশনে যে বক্তারা বলেছিলেন যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি সকল নষ্টের শেকড়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে সবাইকে-ই ঘুরে দাঁড়াতে হবে; তাদের অনেকেই ঢাকায় মোদির বক্তৃতার সময় মুহূর্মুহূ করতালি দিয়েছেন।

তাদের অনেকেই আবার সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে ‘বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চেতনা ফিরিয়ে আনতে সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। তাঁদের অনেকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করেন। (দৈনিক প্রথম আলো, ৫ মে, ২০১১)

তাদের প্রস্তাবমতো ভারতে যদি ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকতো তা হলে মোদির বিজেপির কোনো অস্তিত্বই থাকতো না। যে দর্শনে মোদি বিশ্বাস করেন, তাতে তাঁকে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করতে হতো। তা হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতেন না। সেক্ষেত্রে আমাদের বিশিষ্টজনেরা তাকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ও দিতে পারতেন না।

তারপরও আমাদের শুভবুদ্ধির বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চয়ই ধর্মীয় এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষেই থাকবেন। সেটাই তো শুভবুদ্ধির পরিচায়ক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)