চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দ্বিগুণ ভাড়ায় আন্তনগর বাসগুলো কী সেবা দেয়?

ঈদ এলেই উৎসবের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বেশী আলোচিত হয় যাত্রাপথে জনদুর্ভোগের বিষয়টি। এবছর অন্যবারের তুলনায় দুর্ভোগের খবর কম পাওয়া গেছে। দুর্ভোগ কম হলেও কেবল ঈদের আগে পরের কয়েকদিনে সড়ক দুর্ঘটনায় আমরা কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। দুর্ঘটনায় মৃত্যু যেনো আমরা নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছি। এ নিয়ে তাই কথাবার্তা খুব কম। শুধু যে হারায় সে-ই বুঝে।

সেই বুঝদার আমাদের দায়িত্বশীল আর কর্তাব্যক্তিরা হবেন কি না জানা নেই। কিন্তু, তারা যখন দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলেন, তখন মনে হয় এ বিষয়ে দুয়েকটা কথা হয়তো বলাই যায়। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন দুর্ভোগ কমের বাহবা নিচ্ছেন, তখন দু’-চারটা কথা বললে ক্ষতি কী! তাদের বাহবা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়াই যায়: ঘন্টার পর ঘন্টায় যাত্রাপথে জ্যামে বসে থাকাই কি একমাত্র দুর্ভোগ?

ঈদের মৌসুমে টিকিট না পাওয়ায় এবার মানের দিক থেকে চতুর্থ সারির বাসে ভ্রমণ করতে বাধ্য হয়েছি। এই জার্নিটা না করলে বুঝতাম না, প্রায় দ্বিগুণ টাকায় বাড়তি যাত্রীর চাপে বাস সার্ভিসগুলো কী সেবা দেয়? সারা বছর টিকিটের দাম ৪শ’-৫শ’ টাকা, ঈদের সময় ৭শ’ টকা।

বাসে ওঠার সময় বক্সে লাগেজ তোলার কাজ নিজেদেরই করতে হয়েছে। সুপারভাইজার ব্যস্ত ভাংতি যাত্রী তোলায়। রাজশাহী থেকে যাত্রা করা বাসে নাটোর, বনপাড়া থেকে যেসব যাত্রী উঠবেন সেসব সিট খালি যায় না। অন্য যাত্রী তোলা হয়। টিকিটের বাইরে এসব যাত্রীর ভাড়ার টাকা যায় বাসের স্টাফদের পকেটে। বাসে ওঠার পর দেখা গেলো ‘মুড়ির টিনে’র মতো অবস্থা। বনেটে ৪ জন যাত্রী। তাদের ব্যাগ-বোচকায় বাসের ভেতরে ঢোকা দায়।

বাস চালুর পরই কান ফাটানো হর্ন! সঙ্গে চালকের সহকারীর চীৎকার। পুরো পথে সামনে যাওয়ার সুযোগ পেতে অবিরাম হর্ন চলতেই থাকলো। ওভারটেক করার জন্য নিজের লেন ছেড়ে বিপরীত লেন দখল করে চলতে থাকলো বাসগুলো। বিপরীত দিক থেকে গাড়ী এলে তখন তারা নিজের লেনে ফেরত আসেন। এমন বেপরো যানবাহনের রাস্তায় দুর্ঘটনা না হওয়াই অস্বাভাবিক।

বছরে কয়েকবার আমার রাজশাহী-ঢাকা যাতায়াত শুরু ১৯৯৬ সালে। তখনো বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু চালু হয়নি। ফেরি পারাপারে এই পথ পাড়ি দিতে লাগতো প্রায় ৯ ঘন্টা। ঈদের মৌসুমে একই পথে সর্বোচ্চ ১৮ ঘন্টাও কাটিয়েছি।

সেতু চালু হওয়ার পর আহা কী আনন্দ! চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টায় ঢাকা থেকে রাজশাহী বা রাজশাহী থেকে ঢাকা! ভাবা যায়! এখন ভাবতে না পারলেও ঘটনা সত্যি ছিলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৮ ঘন্টাও গায়ে লাগতো না। কিন্তু বয়সে বুড়ো হওয়ার পথে এখন ৭ ঘন্টার ভ্রমণকেও ধকল মনে হয়। ৪-৫ ঘন্টায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আফসোস বাড়ায়। সেই সাড়ে চার ঘন্টার ভ্রমণ এখন নিয়মিত যাত্রীদের জন্যও ৭/৮ ঘন্টার ভ্রমণ হয়ে গেছে। সময় বাড়লেও কোন বাস খালি যায় বা আসে না।

তবে ট্রেনে যাত্রীদের চাপ বাড়ার বিষয়টা লক্ষণীয়। বাড়তি যাত্রীর কথা বিবেচনা করে বিরতিহীন ট্রেন ‘বনলতা’ চালু করা হয়েছে। খুব ইচ্ছা থাকলেও সঠিক সময়ে চেষ্টা করেও ট্রেনের টিকিট মিলেনি। আধা বেলায় সব টিকিট বিক্রি কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব হয়তো।

তো ৭/৮ ঘন্টার ভ্রমণের বিষয়টা মেনে নিয়ে যাত্রীরা বাসে চেপে বসছেন। কারণ ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের চাহিদা বেড়েছে। তাদের সামনে অন্য উপায় নেই।

প্রয়োজনের তাগিদেই রাজশাহীর প্রায় বন্ধ হওয়া বিমানবন্দরটিও কয়েক বছর থেকে আবার পুরোপুরি সচল হয়েছে। ঈদের মৌসুমে আকাশ পথে ভাড়া ৪-৫ হাজার টাকা। সেখানেও সিট খালি থাকে না।

গতকালের ভ্রমণে খেয়াল করলাম, রাতের বেলাতেও রাস্তা খালি নেই। প্রচুর গাড়ী। জ্যাম না থাকলেও রয়েছে যানবাহনের সারি। এর মধ্যে অর্ধেক মালবাহী ট্রাক। ট্রাক ভর্তি করে আনা হচ্ছে তাজা মাছ। বিশেষ ব্যস্থাপনায় ট্রাকে পানি মজুদ করে তাজা মাছ আনা হচ্ছে উত্তরবঙ্গে বিভিন্ন জেলা থেকে। এগুলো ছাড়াও রয়েছে গরু, মুরগীসহ নানা পণ্যবাহী ট্রাক।

সাদা চোখেই দেখা যায় যানবাহনের তুলনায় রাস্তার স্বল্পতা। দুই লেনের এই রাস্তা খুব দ্রুত চার লেন করা জরুরি। তা না হলে এই রাস্তায় যাতায়াতের সময় বাড়তেই থাকবে। আর সামনের গাড়িকে সরে যেতে বাধ্য করতে হাইড্রোলিক হর্নের অত্যাচার বাড়বে। যাত্রী, চালক এবং বাস সহকারীদের অসুস্থতা বাড়বে। বাড়বে দুর্ঘটনা।

এসব দুর্ঘটনা হয়তো আমরা প্রতিদিন নিজ চোখে দেখতে পাই না। পত্রিকার খবর না হলে জানতেও পারি না।দুর্ভোগের ভ্রমণের কারণে কত মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, পঙ্গু হয়ে পড়ছে সেসবও জানতে পারি না। কোন পরিসংখ্যানও আমাদের হাতে নেই। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা এবং কার্যকরী উদ্যোগ সবচেয়ে জরুরি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)