চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের কারণ কি আইএস-আল কায়েদা দ্বন্দ্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘটিত একের পর এক হত্যাকাণ্ডের কয়েকটি ঘটনায় কথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দেশে জঙ্গি দলটির অস্তিত্ব নেই বলে বরাবরই দাবি করা হচ্ছে। তাহলে কি বাংলাদেশে দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গিদল আইএস এবং আল-কায়েদার মধ্যকার দ্বন্দ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত হতে চলেছে বা ইতিমধ্যেই পরিণত হয়েছে?  এমনই আশঙ্কা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।

একের পর এক হত্যা, এর পেছনে দেশীয়-আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠির সম্পৃক্ততা, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উপস্থিতির সম্ভাব্যতা, রাজনৈতিক দোষারোপসহ বিস্তারিত বিষয় উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে। এছাড়া প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি, যুবসমাজ ও উর্বর ভূমির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি, অধ্যাপক এবং শিক্ষাবিদদের টার্গেট করা জেএমবির সাথে এখন আইএসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অধিকতর বলেই মনে করা হচ্ছে।  এছাড়াও অধিকাংশ সন্দেহভাজন হামলাকারী নিষিদ্ধঘোষিত স্থানীয় জঙ্গি গ্রুপ জামাতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য, বলছে পুলিশ। তেমনি ব্লগার এবং নাস্তিকদের উপর হামলা করা স্থানীয় জঙ্গিদল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সাথে আবার সম্প্রতি গড়ে উঠা ভারতীয় উপমহাদেশের আল কায়েদার (একিউআইএস) বেশি ঘনিষ্ঠতা লক্ষ্য করা যায়।

এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের সন্ত্রাস বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সাজান গোহেলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গিদল আইএস এবং আল-কায়েদার মধ্যকার দ্বন্দ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত হতে চলেছে বা ইতিমধ্যেই পরিণত হয়েছে।  

সিএনএন-এ ২১ জুন তারিখে প্রকাশিত বিশ্লেষণধর্মী এই প্রতিবেদনে নয়াদিল্লির ব্যুরো প্রধান রবি আগারওয়াল চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের দেশটিতে জঙ্গি গোষ্ঠির প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন। যার থেকে রক্ষা পাবে না প্রতিবেশী ভারতও।

তবে সাম্প্রতিক এই সকল জঙ্গি হামলার পেছনে দায় স্বীকারের সত্যতা নিয়ে অঞ্চলটির শীর্ষ বিশ্লেষকদের মধ্যেও ঐক্যমত নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তবে সাউথ এশিয়া টেরোরিজম পোর্টালের নির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনি অবশ্য আইএস বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে বলে মনে করছেন না। জঙ্গিদলটিকে প্রভাবের বিশাল বিস্তৃতির ধারণা দিতেই এর সাথে সম্মন্ধযুক্ত মিডিয়ায় হত্যার দায় স্বীকার করা হয় বলে অভিমত তার। “পুরো বিশ্বজুড়েই তারা বিস্তার চায়।”

“আইএস যদি আসলেই এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকে তবে আসল অস্ত্রাদি কোথায়? প্রশিক্ষিত এবং  যুদ্ধফেরত জঙ্গিরা কোথায়?” প্রশ্ন ছুড়ে অজয় বর্বর এবং মধ্যযুগীয় কায়দায় চাপাতি আক্রমণের পেছনে আইএস সংশ্লিষ্টতা উড়িয়ে দেন।

বাংলাদেশে পরবর্তীতে আরও বড় আকারে এবং সমন্বিতভাবে উচ্চমাত্রার হামলা পরিচালনায় আইএসের আকাঙ্খার কথা উল্লেখ করা হয়েছিলো জঙ্গি দলটির প্রচারণামূলক ম্যাগাজিন ‘দাবিকে’। এরপরও বাংলাদেশ সরকারের সম্পূর্ণ স্বীকার না করার অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন গোহেল।  

“ছুরিকাঘাত বা কুপিয়ে হত্যা বাংলাদেশে নতুন নয়।” কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই নিম্নস্তরের সহিংসতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান থাকলেও সত্য বা মিথ্যা যেভাবেই হোক আইএস নামটি যুক্ত করে একে একটি বৃহৎ রূপ দেয়া হচ্ছে বলে মত সাহনির। ছোটখাট হামলার ক্ষেত্রে আইএসের দায় স্বীকার দলটির প্রচারণার ক্ষেত্রে অক্সিজেনের মতো, যা তাদের আরও শক্তিশালী করে তোলে।

সিএনএন এর সন্ত্রাস বিশ্লেষক পিটার বার্গেনের মতে সম্পর্ক না থাকলেও সাবেক তালেবান সদস্যরা নিজেদের আইএস বলেই পরিচিত দেয়। যা তাদেরকে আরও বড় বা নৃশংস রূপ দেয়।  

জঙ্গিদের উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক ও রাজনৈতিক দোষারপের বিষয়টিও সিএনএন প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। 

গত মাসে এই সব নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি জড়িত বলে সিএনএনকে আকারে-ইঙ্গিতে বললেও এই মাসের শুরুতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর অভিযোগ আরও জোড়ালো হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। যেখানে তিনি বলেন, “চলমান হামলাগুলোর প্রযোজক বিএনপি। পরিচালক জামায়াত। পার্শ্ব অভিনেতারা হলো এবিটি, জেএমবি এবং অন্যান্য জঙ্গি নেটওয়ার্ক।” তবে সরকারের ‘একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার অভিলাষের’ কথা তুলে ধরে বিএনপি বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে।

সম্প্রতি ঢাকা ঘুরে যাওয়া বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম মিলাম বিএনপির ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলার’ সমালোচনা করে বলেন, তারা তাদের সব সময় ব্যয় করছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে এবং সরকারকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে। সাধারণ হত্যাকাণ্ডকেও জঙ্গি হামলার মোড়ক দেওয়ার চেষ্টা থাকতে বলে তার মত। কারণ এতে দায়মুক্তির ব্যাপার রয়েছে বলেন তিনি।

জঙ্গি গ্রেপ্তারে এক সপ্তাহব্যাপি পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের উল্লেখে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ প্রকাশের কথাও উঠে আসে।  জঙ্গি ধরার নামে গিয়ে সাধারণ সন্দেহভাজন অপরাধী ধরা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। 

জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে এবং আরও সতর্ক করে তুলতে পুলিশের পক্ষ থেকে মাগুরায় স্থানীয় মানুষদের হাতে বাঁশের লাঠি ও বাশি তুলে দেওয়াকে কৌতুকপূর্ণ বলেই মন্তব্য করা হয়েছে।