চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শহর থেকে গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া মাদক মহামারীর চিত্র

মাদকের বিস্তৃতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন-৩

বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও গত কয়েক দশকে ভারত থেকে আসা ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইন, অ্যাম্পুলের বাজারে পরিণত হয়।  শুরুর দিকে ইয়াবার টার্গেট থাইল্যান্ড হলেও এখন যেনো একমাত্র টার্গেট বাংলাদেশ।  বাংলাদেশের মাদক বাজারে ভারতের অন্যসব মাদককে ছাড়িয়ে মাত্র কয়েক বছরে একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম করেছে মিয়ানমারের ইয়াবা। এই দুই দেশের সীমান্ত সংলগ্ন ৩২ টি জেলা দিয়ে এসব মাদক নামের ভাইরাস আসছে দেশে।  শহর থেকে গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মহামারীর মতো।

বিজ্ঞাপন

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ভেতর মাদক পাচারের পরিমাণ বেড়ে চলেছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে বেড়েছে মাদকাসক্তের সংখ্যা।  যা মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশের বেশি।

চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে বাংলাদেশে মাদকের সার্বিক চিত্র সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক (ডিএনসি) মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন আহমেদ।
এক কথায় বর্তমানে দেশে মাদক আগ্রাসন তুলে ধরে তিনি বলেন: আমাদের বিশেষজ্ঞদের দেয়া তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে।  অর্থাৎ এটা মোট জনসংখ্যার ৪ শতাংশের বেশি। ফলে এই সংখ্যাটি আমাদের আতঙ্কিত করে তুলেছে।

মাদকাসক্তরা নতুন মাদকাসক্তের সংখ্যার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন: আমরা জেনেছি যে, প্রতি ১০ জন মাদকাসক্ত একজন নতুন মাদকাসক্তের সৃষ্টি করে। এভাবে যদি বাড়তে থাকে তাহলে এই সংখ্যা একসময় আমাদের উপর পাথরের মতো চেপে বসবে।

ডিএনসি’র বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য মতে, আগের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণ মানুষ মাদক ব্যবসায় জড়াচ্ছে।

বাংলাদেশে ঢুকে পড়া মাদকের মধ্যে উদ্ধার করা মাদকদ্রব্যের পরিমাণের ভিত্তিতে করা ডিএনসি’র পরিসংখ্যান জানাচ্ছে: ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ইয়াবা, হেরোইন, ফেন্সিডিল, গাঁজা, অ্যাম্পুল আটকের পরিমাণ বেশি।

২০১৬ সালে ইয়াবা আটকের পরিমাণ ছিলো ২ কোটি ৯৪ লাখ পিসের বেশি কিন্তু ২০১৭ সালে এই আটকের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৭৯ হাজার পিস। ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা আটক করা হয় চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে।

২০১৬ সালে হেরোইন আটকের পরিমাণ ছিলো ২৬৬ কেজি, ২০১৭ সালে আটকের পরিমাণ বেড়ে হয় ৪০১ কেজি।  ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি হেরোইন আটক হয় রাজশাহী অঞ্চল থেকে।

ডিএনসি’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে ফেন্সিডিলের উৎপাদন ও পাচার বন্ধে ভারত কঠোর হয়েছে বলা হলেও ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে আটক করা ফেন্সিডিলের সংখ্যা বেশি ছিলো।

২০১৬ সালে ৫ লাখ ৬৬ হাজার বোতল ফেন্সিডিল আটক করা হয়েছিলো। ৭ লাখ ২০ হাজার বোতলের বেশি ফেন্সিডিল আটক করা হয় ২০১৭ সালে। ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি ফেন্সিডিল আটক হয় রাজশাহী অঞ্চল থেকে। এরপরেই ছিলো খুলনা অঞ্চল।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে গাঁজা একটি পুরানো মাদক। তবু বর্তমানে অন্যান্য মাদকের আগ্রাসনের মধ্যেও গাঁজার প্রাদুর্ভাব আগের চেয়ে কমেনি বরং বেড়েছে। ২০১৬ সালে গাঁজা আটকের পরিমাণ ছিলো ৪৭ হাজার ১০১ কেজি এবং ২০১৭ সালে ৬৯ হাজার ৯৮৯ কেজি। ২০১৬ সালে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ গাঁজা আটক হয় ঢাকা অঞ্চল থেকে।

ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইনের চেয়ে দেশে ইঞ্জেক্টিং মাদক অ্যাম্পুলের প্রাদুর্ভাব কিছুটা সহনীয় হলেও এর ঝুঁকি অত্যন্ত মারাত্মক।

কারণ হিসেবে ডিএনসি মহাপরিচালক বলেন: ইঞ্জেক্টিং মাদক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে আছে। আশঙ্কার কারণ হচ্ছে যারা সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক সেবন করছে তাদের মধ্যে ২৭ শতাংশই এইচআইভি-এইডসে আক্রান্ত।

২০১৬ সালে এই মারাত্মক মাদক আটকের পরিমাণ ছিলো ১ লাখ ৫২ হাজার।  ২০১৭ সালে আটক করা হয় ১ লাখ ৯ হাজার অ্যাম্পুল।মাদক

বিপুল পরিমাণ মাদকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা খুব দ্রুত বেড়ে চলেছে।  প্রতিবেদনের উঠে আসা রূঢ় বাস্তবতা বলছে গত দশক থেকে মাদকের বিস্তৃত থাবায় শিকারে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের কিশোর, পথশিশু, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।  আগে মাদকদ্রব্য কেবল শহরে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।  মাদকের এই আগ্রাসন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহর থেকে মফস্বল পর্যন্ত গড়ে ওঠা শত শত মাদক নিরাময় কেন্দ্র এই ভয়াবহ পরিস্থিতিরই জানান দিচ্ছে।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে: ২০১২ সালে চিকিৎসা নিতে আসা ইয়াবা আসক্তের পরিমাণ ছিলো মাত্র ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ যা ২০১৬ সালের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী গিয়ে দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৬১ শতাংশে।

হেরোইন আসক্তের মধ্যে চিকিৎসা নিতে আসার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিলো ২০১২ সালে,৪২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে হেরোইন আসক্তির চিকিৎসা নিয়েছে ৩৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।

ফেন্সিডিল আসক্তদের মধ্যে ২০১৩ সালে চিকিৎসা নেয়ার হার সবচেয়ে বেশি ছিলো, ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৬ সালে ফেন্সিডিলে আসক্তের মধ্যে চিকিৎসা নেয়ার হার ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

গাঁজায় আসক্তদের মধ্যে চিকিৎসা নেয়াদের হার সবচেয়ে বেশি ছিলো ২০১৪ ও ২০১৫ সালে। এই দুবছরে ৩২ শতাংশের বেশি গাঁজা আসক্ত চিকিৎসা নেয়। ২০১৬ সালে চিকিৎসা নেয় ১৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

চিকিৎসা নিতে আসা অ্যাম্পুলে আসক্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলো ২০১১ সালে। ২০১৬ সালে চিকিৎসা নেয়ার হার ছিলো ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন:

মাদকের বিস্তৃতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন-১

মাদকের বিস্তৃতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন-২