চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশের সব হল বন্ধ ঘোষণা: কী বলেন নির্মাতারা?

এপ্রিল থেকে দেশের সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে প্রদর্শক সমিতির নেতারা। এমন ঘোষণায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলচ্চিত্র অঙ্গনে…

১২ এপ্রিল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হচ্ছে দেশের সব সিনেমা হল। সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে ডেকে এমন ঘোষণাই দিয়েছিলেন হল মালিক সমিতির সংগঠন ‘প্রদর্শক সমিতি’র নেতারা।

বিজ্ঞাপন

দেশের সিনেমা হল টিকিয়ে রাখার জন্য পর্যাপ্ত কনটেন্ট (সিনেমা) নেই। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে গুনতে হলের মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। সিনেমা হলগুলোকে বাঁচানোর কিংবা দেশের ছবির উৎপাদন বাড়ানোর এবং উপমহাদেশের ছবি আমদানির বাঁধা-নিষেধ অপসারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ায় দেশের হল বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রদর্শক সমিতির নেতাদের।

তাদের এমন সিদ্ধান্ত চলচ্চিত্র অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এমন সিদ্ধান্তকে অনেকে সাধুবাদ জানালেও কড়া সমালোচনা করেছেন অভিনেতা অভিনেত্রীসহ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কেউ কেউ। চ্যানেল আই অনলাইন জানতে চেষ্টা করেছে, প্রদর্শক সমিতির এমন সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছে পরিচালকরা। এই বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, পরিচালক সমিতির মহাসচিব বদিউল আলম খোকন, সুপারহিট ছবি ‘মনপুরা’ খ্যাত নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম ও সাম্প্রতিক সময়ের আরেক হিট ছবি ‘ঢাকা অ্যাটাক’-এর নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন:

হল বন্ধ হলে আমাদের ক্ষতি নেই, শিল্পকলাতে সিনেমা চালাবো: গুলজার
হল বন্ধের ঘোষণায় চ্যানেল আই অনলাইনকে পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, হল মালিক সমিতি যদি সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকে যে হল বন্ধ করে দিবে, তাহলে দিক। এ বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। এতে আমাদের চলচ্চিত্রের কোনো ক্ষতি হবে বলে আমি মনে করছি না। কয়েকজন আছে শুধু ভারতীয় ছবি আমদানি করার পাঁয়তারায় থাকে, তারাই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার যেনো একটু নমনীয় হয় এজন্য এরকম করছে, এছাড়া অন্যকিছু নয়। বেশ কয়েকজন হল মালিকদের সাথে আমরা কথা বলেছি, তারা সংগঠণের এমন সিদ্ধান্ত মেনে তাদের হল বন্ধ করার পক্ষে নয় বলে আমাদের জানিয়েছে।

হল মালিকদের দাবী, ভালো কন্টেন্ট নেই। এ কারণে ভারতীয় ছবি আমদানির কথা বলছেন তারা। এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে গুলজার বলেন, ভালো কন্টেন্ট আমরা দেই না? আমরা মনপুরা, আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক-এর মতো সুপার হিট ছবি দেইনি? এগুলোর টাকা দেয় না কেন হল মালিকরা? টাকা ফেরত না দিলে ভালো কন্টেন্ট তৈরী হবে কীভাবে? যে প্রডিউসার মনপুরা, আয়নাবাজি, ঢাকা অ্যাটাক কিংবা এরকম আরো বেশকিছু হিট ছবি নির্মাণে অর্থ লগ্নি করলো, তারা কি হলের টাকাটা বুঝে পাইছে? কেউ পায়নি। আর পায়নি দেখেই ভালো কন্টেন্ট নির্মাণ করেও পরবর্তীতে তারা আর সিনেমাতে লগ্নি করতে আসেনি। এতে সার্বিক ভাবে ক্ষতি হয়েছে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির।

সিনেমা হল বন্ধ হলে বিকল্প ব্যবস্থায় সিনেমা প্রদর্শনী চালাবেন বলেও জানান গুলজার। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সিনেমা হল বন্ধ হলে আমরাও বিকল্প ব্যবস্থায় সিনেমা দেখানোর কথা ভাবছি। শিল্পকলা একাডেমির সাথে কথা বলেছি, সরকারি ভাবে জেলাগুলোতে সিনেপ্লেক্স হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা শিল্পকলার অডিটোরিয়ামকে মিনি সিনেমা হলে রূপান্তর করে আমাদের সিনেমা চালাবো। এখন বিকল্প ব্যবস্থায় সিনেমা প্রদর্শনীর মাধ্যমেও টাকা উঠে আসছে, দর্শক বিকল্প ব্যবস্থায় ছবি দেখছে। এমন নজির আছে আমাদের। এছাড়া মান্ধাতা আমলের সিনেমা হলে এখন কেউ যেতেও চায় না। কোনো পরিবেশ নাই হলের ভেতরের, বাইরের। বাথরুমের পরিবেশ নাই, একটা ভালো ওয়াশরুম পর্যন্ত নাই। কয়েক যুগ আগে হয়তো দাদা একটা সিনেমা হল তৈরী করেছিলো, সেটার কোনো পরিবর্তন করেনি। মানুষের রুচি পাল্টে গেছে, প্রযুক্তির ছোঁয়া চারদিকে, অথচ একটা হলেও প্রজেকশান ব্যবস্থা ভালো নেই, সাউন্ড ব্যবস্থা ভালো নেই। এসব হলে কেন দর্শক যাবে?

ই-টিকেটিং ব্যবস্থাই বর্তমান সংকট পরিস্থিতির সমাধান এনে দিতে পারে: বদিউল আলম খোকন  

হল বন্ধ করে দিক। চলচ্চিত্রে যে সমস্যগুলো এই মুহূর্তে বিরাজমান, এগুলো হল বন্ধ না করলে একটা সুষ্ঠু সমাধান হবে না। কেনো না হল মালিকদের সাথে প্রযোজক ও পরিচালকদের অনেক ঝামেলা আছে। আমরা বহু কষ্ট করে ছবি বানাই, সেটা হলে গেলে সেখান থেকে আমরা কী পাবো এটাও বিহিত হওয়া দরকার। ধরেন একটা সিনেমার টিকিটের দাম ১০০ টাকা, কিন্তু সেখান থেকে প্রডিউসার হিসেবে আমি যদি মাত্র ১০ টাকা পাই, এটা কি কোন যুক্তিপূর্ণ কথা হল? সিনেমা হলে ১০০ টাকার টিকেট থেকে যদি আমি দশ টাকা পাই, এটাতো নেহায়েত অমানবিক একটা ব্যাপার! অথচ এই চর্চাই হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। যিনি প্রডিউসার সিনেমায় অর্থলগ্নি করেন, তাকে অনবরত এই সব পরিস্থিতির ভিতর দিয়েই সিনেমা প্রযোজনা করে যেতে হচ্ছে। অমানবিক পরিস্থিতির শেষ দরকার। এখন যদি সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে সিনেমার টিকেট ব্যবস্থা এবং পার্সেন্টেজ নিয়ে যে অভিযোগগুলো সেগুলোরও সুরাহা হবে। এমনিতেই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বহুদিন ধরেই ভুক্তভোগী। হল বন্ধের এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আমরা মনে করছি টিকেট ব্যবস্থায় যে অসামঞ্জস্যতা সেগুলোর একটা সুষ্ঠু সুরাহা হবে।

হল বন্ধের ঘোষণার পেছনে হল মালিকদের লোকায়িত কারণ আছে বলে মনে করেন পরিচালক সমিতির এই মহাসচিব। তিনি বলেন, হঠাৎ করে হল বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণার পেছনে একটা লুকায়িত কারণ আছে। কারণটা হল, সিনেমা হল মালিকদের মধ্যে অনেকেই হিন্দি ছবি আমদানি করে বাংলাদেশে মুক্তি দিয়ে দিতে চায়। আর ওরা ভালো ছবি ভালো ছবি করে, টাকা না দিলে ভালো ছবি তৈরি হবে কীভাবে? ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘আয়নাবাজি’ এই ছবিগুলির প্রডিউসার পরবর্তীতে কি আর সিনেমা করতে পারছে? পারে নাই। কেন পারে নাই কারণ টিকিট বিক্রির কোটি কোটি টাকা হল মালিকরা সেইসব প্রডিউসারকে বুঝিয়ে দেয় নাই।

এই পরিস্থিতির মধ্যে বদিউল আলম খোকন দেশের হলগুলোতে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করার জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, টিকিট বিক্রি নিয়ে হল মালিকদের প্রচুর মার প্যাঁচ আছে। একটা উদাহরণ দেই, মধুমিতা হলে ডিসি টিকিটের দাম দেড়শ টাকা। এই ১৫০ টাকার মধ্যে মাত্র ৩০ টাকা দেন ছবির প্রডিউসার। এই দেড়শো টাকার মধ্যে ৩০ টাকা পেয়ে প্রডিউসার মেশিন ভাড়া নেয়, পোস্টার বানায়, ব্যানার বানায়, প্রমোশন চালায়, একজন রিপ্রেজেন্টেটর নেয়। এই অবস্থায় আমি বহুদিন ধরে বলছি রিপ্রেজেন্টেটর না নিয়ে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা চালু করতে, কিন্তু হল মালিকরা ই-টিকেটিং ব্যবস্থায় রাজি না। কেন রাজি না কারণ ই-টিকেটিং ব্যবস্থা হলে আর কোনো মারপ্যাঁচ থাকে না। ই-টিকিটিং হলে কিন্তু সারাদিনে ওই হলটাতে কতগুলি লোক সিনেমা দেখল, শোতে কতজন লোক হলো সব খবর অটোমেটিকলি মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রডিউসারও খবর পেয়ে যাবেন। ই-টিকেটিং ব্যবস্থায় যে তারা যাচ্ছে না এর মধ্যে কিন্তু একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে।

এসব কারণে আমরা চাই সিনেমা হলগুলো বন্ধ হোক। সিনেমা হলগুলো বন্ধ হলে টোটাল চলচ্চিত্রে এক ধরনের পরিবর্তন আসবে। সরকারের সাথে বসে প্রডিউসার, ডিরেক্টর, হল মালিক এক ধরনের সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছুতে পারলে চলচ্চিত্রের মন্দ হাওয়া কাটবে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা জরুরি। চলচ্চিত্র নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এভাবে কোন দেশের চলচ্চিত্র ব্যবস্থা চলতে পারে না। খুব ভয়ঙ্কর একটা সময় পার করছে আমাদের চলচ্চিত্র। আমরাও চাই চলচ্চিত্রের এই সংকটকালে সরকার একটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখুক। কারণ আমরা বিশ্বাস করি সংস্কৃতি না বাঁচলে দেশ ও বাঁচবে না।

সংলাপ ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়: গিয়াস উদ্দিন সেলিম
প্রদর্শক, প্রডিউসার, সিনেমার টেকনিশিয়ান একটা ছাড়া আরেকটা কিন্তু চলবেনা এবং একটা দেশের সিনেমা শিল্পের উন্নয়ন সেই দেশের সরকারের সুদৃষ্টি ছাড়া সম্ভবও নয়। আমাদের চলচ্চিত্রে যে পরিস্থিতি এই মুহূর্তে তৈরী হয়েছে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি সরকারি উদ্যোগে সিনেমা সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটা সংলাপ হতে পারে। আমি মনে করি, সংলাপে চলচ্চিত্রের সমস্ত ক্রাইসিস নিয়ে সবাই সবার সেক্টর থেকে কথা বলুক। বিশ্বাস করি সমস্যার সমাধানও সংলাপ থেকে বের হয়ে আসবে। বলছিলেন ‘মনপুরা’-খ্যাত দেশের জনপ্রিয় নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম।

হল বন্ধের কারণ হিসেবে প্রদর্শক সমিতি দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর কথা তাদের বক্তৃতায় জানিয়েছে। এরমধ্যে একটি তারা বলেছেন দেশে ভালো কন্টেন্ট (সিনেমা) নাই, আর এ কারণে ভারতীয় ছবি আমদানির উপর বাধা নিষেধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সেলিম বলেন, এ বিষয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। হল মালিকরা কেন ভারতীয় ছবি আমদানি করতে বলছেন, এ বিষয়ে বিশদ কিছু তারা বলেনি। আরেকটি কথা হল মালিকরা বলেছেন যে, আমাদের এখানে ভালো ছবি হচ্ছে না। এই কথাতো কিছুটা সত্যই। আমি মনে করি, হল চালানোর জন্য গুনে মানে যতগুলো ছবি প্রতি বছর হওয়া দরকার তা আমাদের হচ্ছে না। আমার কাছে মনে হয়, সপ্তাহে আমাদের দেশের হলগুলোতে একটা নতুন ছবি দরকার। সেটা যে ধরনের হোক। সে ক্ষেত্রে বছরেই আমাদের এখানে ছবি হচ্ছে ৩০/৪০টি।

নানামুখি অভিযোগের কথা তুলে ধরে গিয়াস উদ্দিন সেলিম বলেন, আমাদের এখানে সিনেমা নির্মাণ করতে গেলেও নানা সমস্যা আছে। তারমধ্যে বাজেট স্বল্পতা সবার উপরে। তাও ছবিটা যদি হয় কোনো ভাবে, তারপর দেখা যায় হল মালিকরা টাকা দেয় না ঠিক ঠাক মতো। হলের পরিবেশ ভালো না, দর্শক সাধারণ হলে সিনেমা দেখতে এসে কোনো কমফোর্ট পায় না। সারা দেশের কোনো সিনেমা হলে ভালো ব্যবস্থাপনা নাই। সব মিলিয়ে একটা নাজুক অবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরেই। হল মালিকদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগতো অসত্য নয়, তাহলে দর্শক কেন যাবে ওইসব সিনেমা হলে?

মান সম্মত প্রডিউসার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, টেকনিশিয়ান-কলাকুশলী, মান সম্মত ডিস্ট্রিবিউশান ব্যবস্থা এগুলো একটা চলচ্চিত্রের সফল হওয়া কিংবা না হওয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রদর্শক সমিতি যে দাবিদাওয়া করেছেন আমার মনে হয়, তাদের সাথে বসেই চলচ্চিত্রের অন্যান্যদের নিয়ে আলাপ আলাচোনার ভিত্তিকে একটা সুষ্ঠু সমাধানের দিকে যাওয়া উচিত। না হলে আমরা একে অন্যকে পারস্পারিক দোষারোপ করেই যাবো। সিনেমা যেহেতু তথ্যমন্ত্রণালয়ের অধিনে, আমার মনে হয় যে বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের পরস্পরের মধ্যে জটিলতা আছে সেগুলো দ্রুতই সমাধানে উদ্যোগী হওয়া উচিত মন্ত্রণালয়ের।

বছরে অন্তত ২৫টি হিট, সেমি হিট ছবি আমাদের ভীষণ জরুরী: দীপঙ্কর দীপন

সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণায় ‘ঢাকা অ্যাটাক’ খ্যাত নির্মাতা দীপঙ্কর দীপন বলেন, আমি আশা টকিজ নামে একটি ধারাবাহিক নাটক তৈরীর সময় ঢাকার আশে পাশের সিনেমা হল গুলো নিয়ে বিস্তর রিসার্চ করেছি। দেখেছি কতো কষ্ট করে সিনেমা হলগুলো বেঁচে আছে। কেউ লক্ষ্য করলে দেখবেন, সিনেমা হলগুলো সাধারণ শহরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় তৈরী হয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গায় কিন্তু সিনেমা হলগুলো নির্মিত। ফলে সব সময় চাহিদা আছে যে এখানে মার্কেট করো, এটা করো সেটা করো। কিন্তু এতো চাপ থাকার পরেও ক্রমাগত লস দিয়েও সিনেমা হলগুলোকে কিন্তু টিকিয়ে রেখেছেন মালিকরা। এরজন্য তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। নতুন বছরের তিন মাস হতে চললো, কয়টা সিনেমা ব্যবসা সফল হয়েছে? বা গেল বছরের পুরোটা সময় যদি হিসেবে করেন, তাহলে কয়টা সিনেমা হিটের তালিকায় নাম পাওয়া যাবে? ফলে ভালো কন্টেন্ট (সিনেমা) তৈরী হচ্ছে না এটা যেমন সত্যি, তেমনি আরেকটি সত্যি আমাদের খুঁজে বের করতে হবে কেন আমাদের একের পর এক হিট, সুপার হিট সিনেমা হচ্ছে না। এরজন্য কিন্তু কোনো অংশে কম দায়ি নয় হল মালিকরা।

এরপর তিনি বলেন, আমরা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, বেশকিছু ছবি সুপার হিট, বাম্পার হিট হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ টিকেট কেটে হলগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে কিছু ছবি দেখেছে। কিন্তু যখন প্রডিউসারকে সেই ন্যায্য টাকার হিসেবে বুঝিয়ে দেয়ার সময় এসেছে, তখন সেটা প্রচুর গড়মিল করেছে হল মালিকরা। আর এরফলে হিট ছবির প্রযোজকরাও এমন বাজে অভিজ্ঞতার কারণে পরবর্তীতে আর সিনেমা করতে অর্থ লগ্নি করেনি। তারা দূরে সরে গেছেন। তারমধ্যে আবার আছেন কিছু মধ্যসত্ত্বভুগি। সত্যি কথা বলতে গেলে, এই মুহূর্তে ইন্ডাস্ট্রিতে রেগুলার প্রডিউসার নাই বললেই চলে। যে কারণে দিন দিন আমাদের কন্টেন্ট কমে যাচ্ছে। যাদের কারণে কন্টেন্ট কমছে, এখন তারাই উচ্চ গলায় বলছেন ‘আমাদের কন্টেন্ট নাই’! এখন এই সমস্যার সমাধান কোথায়?

নির্মাতা মনে করেন, খুবই জটিল একটা সমস্যায় আছে আমাদের চলচ্চিত্র। পারস্পরিক বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারলেই কেবল এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এরজন্য অঙ্গীকার করতে হবে প্রডিউসার ও পরিচালককে যে, ভালো কন্টেন্টের জন্য আগামি ৬ মাসের মধ্যে ব্যবসাসফল ১০টি ছবি নির্মাণে সে অর্থ লগ্নি করবে। হল মালিকদের অঙ্গীকার করতে হবে যে, আগামি ৬ মাসের মধ্যে সে তার হলগুলোতে দর্শকের চাওয়া অনুযায়ি ভালো ও সুস্থ পরিবেশ তৈরী করে দিবে। এখন হলগুলো হচ্ছে গোডাউন। না আছে এসি, না আছে সুন্দর পরিবেশ।

ভারতীয় ছবি আমদানি করার বিষয়ে হল মালিকদের এমন আবদারকে সাময়িক খড়কুটো আকড়ে ধরে জীবন বাঁচানোর সাথে তুলনা করে দীপন বলেন, হল মালিকরা ভাবছে ভারতীয় ছবি এনে মুক্তি দিলেই দর্শক উপচে পড়বে হলে, হুমড়ি খেয়ে পড়বে। এই ধারনা প্রচণ্ড ভুল। এটা হচ্ছে ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আকড়ে ধরার মতো একটা ব্যাপার। কিন্তু খড়কুটো ধরেতো বাঁচা যায় না। সিনেমা হলের পরিবেশ ভালো না হলে ভারতীয় ছবি কেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছবি দেখতেও হলে খুব কম মানুষই যাবে। কেন, বাংলাদেশে কি এরআগে ভারতীয় ছবি রিলিজ হয়নি? অনেক ছবি রিলিজ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও হয়েছে। কিন্তু কোন্ ছবিটা ব্যবসা সফল হয়েছে, বলুকতো কেউ! ভারতীয় ছবি আসলেই যে চলবে, এটার কোনো গ্যারান্টি নাই। মূলত হল মালিকরা কোনো কিছুর উপায়ান্তর না দেখেই এমনটা বলছেন।

হলের পরিবেশ ও প্রযোজকের অর্থ লগ্নির বিষয়টি ছাড়াও দীপঙ্কর দীপন কথা বলেন বাংলা সিনেমার কন্টেন্ট নিয়ে। তিনি বলেন, ছবি মানেই কিন্তু কন্টেন্ট না। বাংলাদেশে এমন এমন ছবিও রিলিজ হয়, এই হল মালিকরাই বলে ফেলেন যে এগুলা চলবে না। সিনেমার সংখ্যার চেয়ে মান সম্মত ছবি হওয়া বেশি জরুরী। বিগত কয়েক বছরের দিকে তাকালেই সেই গুটি কয়েক সংখ্যার হিসেবে পাওয়া যাবে। মানসম্মত সিনেমার কন্টেন্ট আমাদের খুব কম। বাংলাদেশের মতো জায়গায় বছরে অন্তত ২৫টি হিট, সেমি হিট ছবি প্রয়োজন।

চলচ্চিত্রের এই সংকট সময়ে পরিচালকদেরও একটা দায় রয়েছে বলে জানান দীপঙ্কর দীপন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমরা যারা পরিচালক তাদেরও একটা বড় রকমের দায় আছে এই ইন্ডাস্ট্রির প্রতি। আমি মনে করি, ব্যবসাসফল ছবির জন্য কমার্শিয়াল টাচ দেয়া কন্টেন্ট খুব জরুরী। ভীষণ জরুরী। আর এরজন্য ঠিকঠাক, প্রফেশনাল কিছু প্রযোজকের এগিয়ে আসা জরুরী। ‘আপনাকে আমি টাকা দিলাম, আপনি একটা হিট ছবি দিবেন।’-এমন প্রফেশনাল কথা বলার মতো সাহসী প্রযোজক আমাদের জরুরী।