চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেখতে হলে ফিটফাট, চলে আসুন সদরঘাট: শাজাহান খান

‘বিতর্কিত এই মানুষটি যা তৈরী করে গেলো তা মূল্যয়নের ভার আপনাদের’

সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিক নেতা শাজাহান খান ছিলেন সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের গঠন করা কমিটির চেয়ারম্যান। এই পদে তার আসার পর থেকে সমালোচনা ছিল নানা মহল থেকে।

‘বিতর্কিত’ একজন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এমন কথা শুনতে হয়েছে স্বয়ং শাজাহান খানকেই।

বিজ্ঞাপন

এমন সব সমালোচনার জবাবে চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেছেন: আমি যখন নৌপরিবহনমন্ত্রী হলাম তখন অনেকেই বলেছিলো, যার হাতে পরিবহন সেক্টর জিম্মি তাকেই করা হচ্ছে মন্ত্রী! আমি আমার কাজের মধ্যদিয়ে সকল সমালোচনার জবাব দিয়েছি। এখন যখন আমাকে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের গঠন করা কমিটির চেয়ারম্যান করা হলো তখন অনেককেই বলতে শোনা গেলো, একজন বিতর্কিত মানুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি শুধু তাদের এতোটুকু বলবো, এই বিতর্কিত মানুষটি যা তৈরী করে গেলো তা এখন মূল্যয়নের ভার আপনাদের ওপর।

শাজাহান বলেন: ৪৭ বছর ধরে আমি এই সেক্টরে নেতৃত্ব দিচ্ছি। জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে এমন কোনো সরকার যায়নি, যে সরকারের সাথে আমার চুক্তি হয়নি। আমি যখন নৌপরিবহনমন্ত্রী হলাম তখন বলা হয়েছিল যার হাতে সড়ক জিম্মি তাকে করা হলো নৌমন্ত্রী! আমি তখন বলেছিলাম আমি নৌ সেক্টর এর উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবো। এরপর থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে আজ পর্যন্ত ৪ বছর ৯ মাস একটি লঞ্চ ডুবির ঘটনা ঘটেনি। যেখানে প্রতি বছরই কোনো না কোনো লঞ্চ ডুবির ঘটনায় অসংখ্য প্রাণ ঝরে যেত।

তিনি জানান: একটা সময় বলা হতো, ‘উপরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট’। সেই অবস্থা থেকে আমি সদরঘাটের পরিবর্তন এনেছি। এখন আমি বলি, ‘দেখতে হলে ফিটফাট, চলে আসুন সদরঘাট’।

শাজাহান খান বলেন: মন্ত্রী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্দেশ দিলেন লঞ্চঘাট, ফেরিঘাটের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার। এরপর সর্বপ্রথম আমি হাত দেই সদরঘাটে। সেখানে দেখতে পেলাম ইজারা প্রথার কারণে এখানে এত অরাজকতা, অনিয়ম। আমি প্রধানমন্ত্রীকে জানাই ইজারা প্রথা বাতিল করা ছাড়া সদরঘাটের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, সদরঘাট থেকে ইজারায় প্রতিবছর কত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়? আমি তাকে জানালাম, ২ কোটি টাকা জমা হয়। তিনি বললেন, মাত্র ২ কোটি টাকার জন্য মানুষের এত ভোগান্তি? তাহলে সদরঘাটের ইজারা প্রথা বাতিল করো। এরপর সদরঘাটের ইজারা প্রথা বাতিল করার পাশাপাশি সেখান থেকে ৩০০ হকারকে উচ্ছেদ করি। এই তিনশ’ হকার আমার বিরুদ্ধে সদরঘাটে অবস্থান নেয়। সেই অবস্থা মোকাবেলা করে সদরঘাটের স্বাভাবিক অবস্থা আমি ফিরিয়ে এনেছি।

তিনি বলেন: নৌ সেক্টরে যদি আমরা শৃঙ্খলা ফেরাতে পারি, পরিবহন সেক্টরে কেন পারব না? সেই জায়গা থেকে নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটা কমিটি গঠন করা হয়; সেই কমিটির দায়িত্ব দেয়া হয় আমাকে। তখন অনেককেই বলতে শোনা গেছে একজন বিতর্কিত লোককে দিয়ে কমিটি করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

‘‘আমি এতটুকু বলতে পারি এই বিতর্কিত মানুষ যেটা তৈরি করেছে সেটা আগের যে কোনো প্রস্তাবনা থেকে আকাশ পাতাল পার্থক্য। আমরা নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১১১ সুপারিশ রেখেছি।  সুপারিশ ১১১ হলেও মূলত সাতটি সুপারিশকে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’’

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের গঠন করা কমিটির সুপারিশগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন: প্রথমে রাখা হয়েছে সচেতনতামূলক শিক্ষা। সচেতন শুধু ড্রাইভারকে করবেন? না, শুধু ড্রাইভারকে নয় সচেতন করতে হবে মালিক-শ্রমিক, পথচারী, যাত্রী, পুলিশ, সরকার সকলকেই। নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

‘‘দ্বিতীয়ত আমরা যেটা বলেছি, যথাযথ প্রশিক্ষণ এর মধ্যদিয়ে চালক এবং বিআরটিএ কর্মকর্তা কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। সরকার একটি প্রজেক্টে ১ লক্ষ ড্রাইভার তৈরি করছে। সে ড্রাইভার কেন তৈরি করা হচ্ছে, বিদেশে পাঠানোর জন্য! আমাদের দেশের জন্য নয়। আমরা যখন একজন ডাক্তার তৈরি করি, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করি, কৃষিবিদ, মেরিনার্স এই সমস্ত পেশাজীবীদের তৈরি করি তখন তাদের জন্য সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন যখন ড্রাইভার, সরকার কেন সেখানে ভর্তুকি দিচ্ছে না? আমাদের প্রস্তাবনা হচ্ছে প্রণোদনার মাধ্যমে যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মধ্যদিয়ে দক্ষ ড্রাইভার তৈরি করা হোক।’’

শাজাহান খান জানান: এরপর আমরা সব থেকে গুরুত্ব দিয়েছি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান (বিআরটিএ) সক্ষমতা বৃদ্ধিতে। আমি যদি বিআরটিএ’র চেয়ারম্যানকে প্রশ্ন করি তিনি অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না। জনগণকে আমি বলতে চাই, আপনারা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই ড্রাইভারের ফাঁসি দাবি করেন। ফাঁসি কোনো সমাধান নয়। পৃথিবীর কোথাও ফাঁসির আইন নেই। আমাদের দেশে হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি। তবে যদি ফাঁসি সমাধান হতো দেশে আর কোনো হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো না।

তিনি বলেন: এরপর আমরা বলেছি যানবহন প্রকৌশলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের আগে ঠিক করতে হবে আমাদের রাস্তার জন্য যে গাড়ি গুলো নির্বাচন করা হবে, তা কী সাইজের হবে। সেই অনুযায়ী গাড়ি তৈরি করা হবে। আমরা এর স্পেসিফিকেশনটা করে দিচ্ছি, এটা মানতে হবে।

‘এরপর যেটা উন্নয়ন করতে হবে সেটা সড়কের অবকাঠামোগত দিক।’

এমন করে ১১১টি সুপারিশ কমিটির পক্ষ থেকে রাখা হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে। যা গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয় সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের গঠিত কমিটি।