চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে মোহাম্মদ শাহ্ কামাল ২৩ মার্চ ২০১৫ তারিখে যোগদান করেন। ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে সরকারের সিনিয়র সচিব পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বি. কম, সন্মান এবং ১ম শ্রেণিতে এম. কম ডিগ্রী লাভ করেন।

বিজ্ঞাপন

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরি জীবনে মাঠ প্রশাসনে সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট, গাজীপুর, উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও গাজীপুর সদর, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া সদর, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শরীয়তপুর এবং জেলা প্রশাসক, কিশোরগঞ্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ দায়িত্ব পালন করেন। নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম প্রশাসক ছিলেন এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেক সামাজিক ও মানবিক কল্যাণমূলক সংগঠনের কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ স্কাউটের জাতীয় কমিশনার সমাজ উন্নয়ন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্কাউট কর্মকাণ্ডে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে জাতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদক গোল্ডেন টাইগার এবং সিলভার ইলিশ প্রদান করে সন্মানিত করা হয়েছে।

দেশ-বিদেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট হতে তিনি ডিগ্রি অর্জন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন- এগুলোর মধ্যে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ইউএসএ, ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগ ডেনমার্ক, ইউনিভার্সিটি অব কোরিয়া সিউল, ওলভারহ্যাম্পটন ইইনিভার্সিটি ইংল্যান্ড, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সিঙ্গাপুর, লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিক্স, শ্রামপাটুম ইউনিভার্সিটি থাইল্যান্ড, সিভিল অফিসার্স ষ্টাফ কলেজ সিঙ্গাপুর এবং অ্যাডমিনিষ্ট্রেটিভি কলেজ চায়না ইত্যাদি।

প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার বিষয়ে একজন স্বীকৃত পেশাদার বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের উপর দিয়ে অতিক্রম করা ঘূর্ণিঝড় ফণীসহ ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা বিষয়ে একান্ত সাক্ষাতকার দেন তিনি।

প্রশ্ন: এবার ঘূর্ণিঝড় ফণী আঘাত আনার আগেই বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট অচল যায়, কেন?
মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: ওয়েবসাইট অচল হওয়ার পরে প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় আবহাওয়া অধিদপ্তরকে আমরা এই একই প্রশ্ন করি, যে প্রশ্ন আপনি আমাকে করলেন। তাদের ব্যাখা হলো- একসাথে সর্বোচ্চ এক লাখ লোক ওয়েব সাইটে ঢুকতে পারবে। কিন্তু ফণীর সময়ে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লাখ লোক প্রতিনিয়ত ওয়েব সাইটে ঢোকায় হ্যাং হয়ে যায়। তবে পরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট আবার সচল হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন: ফণীর আগে সিডর, আইলা, মহাসেন, মোরা অনেক ঘূর্ণিঝড় এসেছে। এই ক্যাপাসিটি আগে থেকেই কেন বিল্ড আপ হলো না?
মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: ক্যাপাসিটি বিল্ড আপ হয়েছে। ওয়েবসাইট একটা হ্যাং হয়েছে। কিন্তু বিকল্প আরেকটি ওয়েবসাইট ছিল। আমাদের জাপানের সাথে চুক্তি আছে। এই ডাটা কালেকশন হয় জাপান থেকে। জাপানের ওই ডাটার সাথে আমরা পরীক্ষা করে মিলিয়ে তথ্য সবাইকে দেই।

প্রশ্ন: সাধারণ মানুষ কি আর চুক্তি বোঝে? তারা তো দেখে সেবা?
মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: ওয়েবসাইট অনেকগুলো। আমাদেরটা আছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আছে, যারা এই সব নিয়ে কাজ করে তাদের আছে। আমরা নিয়মিত জেলা প্রশাসনকে অবহিত করছি। সকলে কিন্তু তথ্য পাচ্ছে। এছাড়া মিডিয়ার বদৌলতে অনেক সহজে মানুষ তথ্য পাচ্ছে। টেকনিক্যাল বিষয় তাই একটা অচল হয়ে যেতেই পারে। পরে কিন্তু ওই সাইট আবার সচল হয়।

প্রশ্ন: এবারের দুর্যোগ ফণী মোকাবিলায় ৫৬ হাজার স্বেচ্চাসেবক প্রস্তুত রাখা ছিল- এরা কি যথেষ্ট প্রশিক্ষিত?
মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: অবশ্যই। সারাবিশ্বের কাছে এরা পরিচিত। একমাত্র বাংলাদেশই সিপিবি রোল মডেল হিসেবে কাজ করছে মাঠে। মেগা ফোন নিয়ে তারা প্রচার করছে এবং তারা সবাই পরীক্ষিত।

প্রশ্ন: আমাদের যে পরিমাণ সাইক্লোন শেল্টার সেন্টার আছে তা কি পর্যাপ্ত?
মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: আমাদের মোট সাইক্লোন শেল্টার সেন্টার দরকার ১৯টি জেলায় ৭ হাজার। আমরা নির্মাণ করেছি ৪ হাজার ৭১টি। ২২০ টা আরও নির্মানাধীন আছে। তাই এই কারণে আমাদের সাইক্লোন সেন্টারের স্বল্পতার জন্যে ষ্কুল, কলেজ এবং প্রাইমারী ষ্কুলগুলো ব্যবহার করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৩ টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে- ২০১৫ তে কোমেন, ২০১৬ তে মোরা এবং ২০১৭ সালে হয়েছে রোয়ানো। প্রতিটিতে গড়ে ২১ থেকে ২২ লক্ষ মানুষকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি এবং সফলতার সাথে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। এই বছরও ৪ হাজার ৭১ টি সাইক্লোন শেল্টার সেন্টার রেডি ছিল। স্কুল কলেজও প্রস্তুত করে রেখেছিলাম আমরা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে উদ্ধার কাজ এবারও ঠিকমতো করেছি। জেলা প্রশাসনের ক্যাপাসিটি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি, জেলা প্রশাসকরা অনেক বেশি উদ্যোগী, স্থানীয় নেতৃবর্গরা আছেন এবং আপামর জনসাধারণের সহযোগিতাও থাকে যে কোন দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন: আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে পানীয় জল ও খাদ্যের কোন ব্যবস্থা নাকি এই বছর ছিল না?
মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: এই কথা যারা বলেছেন তারা সঠিক না। আমি কাজ করছি গত ৪ বছর। পানীয় জলের জন্যে ৩০ টা ওয়াটার মাউন্টেন ট্রাক আমরা তৈরী করেছি। যেটা প্রতি আওয়ারে ২ হাজার লিটার পানি পিউরিফাইন করে খাবার পানিতে পরিণত করে এটি জাপান থেকে আনা। গেলো ৩ বছরে ভার্নারেবল জেলাগুলোতে আমরা তা দিয়েছি। খাবারের ব্যাপারে বলব- কোন জেলাতেই এই মুহূর্তে ৪ টনের নীচে চাল নেই এবং প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কাছে এখন ১২- ১৫ লক্ষ টাকা আছে। এছাড়া আমরা শুকনো খাবার দিয়েছি।

প্রশ্ন: দুর্যোগের সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়। কিন্তু দেখা যায় যে তারা আক্রান্ত এলাকাতে যান না? হাওরে বন্যার সময়ে আমরা দেখেছি।

মোহাম্মদ শাহ্ কামাল: হাওরের বন্যা হওয়ার আগেই হাওর উন্নয়ন বোর্ডের লোকেরা বিদেশে গিয়েছিল। কিন্তু যারা দেশে ছিলেন তারা কিন্তু হাওরের বন্যার সময়ে বিদেশে যাননি। তারা সবাই আগে গিয়েছিল। এখানে তথ্যগত ভুল ছিল। ঘটনার ১৫ দিনে আগে তারা বিদেশ গিয়েছিল এবং ঘটনা ঘটার সাথে সাথে তারা আবার দেশে চলে আসে। একটা ঘটনা ঘটার পরে তা শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে যাতে এই ধরণের ঘটনা না ঘটে সেই ব্যাপারে কিন্তু সবাই সচেতন থাকে। দুর্যোগের সময়ে সবাই এক হয়ে মানবতার সেবায় কাজ করে এটি বাংলাদেশের মানুষের স্পিরিটি। এই কাজ আমরা করতে পেরেছি বলেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল।