চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুধভাত বদি বনাম একরামের সন্তানদের দুধভাত

ছোটবেলায় দাঁড়িয়াবান্ধা, বৌচি, হা-ডু-ডু, খেলা আমাদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল। একসাথে অনেকে মিলে খেলা যেত। স্কুলের টিফিনের সময় ও স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে খেলতাম পাড়ায় বন্ধুদের সাথে। অধিকাংশ সময় দেখা যেত একজন বাড়তি আছে, আনাড়ি খেলোয়াড় বা বয়সে ছোট। খেলায় না নিলে মন খারাপ করবে। তখন দুই দল প্রধান তাকে দুই দলেই নিত। তাকে বলা হতো পেট কাটা বা দুধভাত।

দুই দল প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের আউট করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যেত। কিন্তু দুধভাত বা পেটকাটা খেলোয়াড়কে সামনে পেলেও ধরত না। কারণ খেলার নিয়ম ছিল পেটকাটা আউট হয় না, কারণ সে দুইদলেই খেলে। তাই প্রতিপক্ষের সামনে ঘুরঘুর করলেও কেউ তার দিকে খেয়াল করতো না। তাকে ধরতে যেয়ে সময় নষ্ট করত না।

সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে উনি পেটকাটা বা দুধভাত। যে ইয়াবা ব্যবসায় প্রধান হয়ে আছে। আবার ইয়াবাসহ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও আছেন। তবে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার পেটকাটার মত আনাড়ি, ছোট বা বাড়তি নয়। উনি সব থেকে শক্তিশালী দেখা যাচ্ছে। উনি সব দলে আছেন। মাদকের বিরদ্ধে যুদ্ধের নানান খবর দেখে মনে হচ্ছে চলছে দাঁড়িয়াবান্দা খেলা হাতের ফাঁক দিয়ে শক্তিশালী পেটকাটা বা দুধভাতরা বের করে দিয়ে ছোট, আনাড়ি মানে খুচরো মাদক বিক্রেতাদের ধরে মেরে ফেলা হচ্ছে।

টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত। কথিত মাদক যুদ্ধে মেরে ফেলা হয় তাকে। এই ঘটনার পর শহরে আমজনতা থেকে শুরু করে সরকারি দলের নেতাকর্মীরাও দাবী করছে, একরামু হক আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও সৎ নেতা ছিল। সে কখনোই ইয়াবা ব্যবসা বা কোন ধরনের মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল না। সে নিরাপধ। তার নামে কোন মামলা নেই।

সমর চৌধুরী, জর্জ কোর্টে আইনজীবীর সহায়তাকারী, তাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে আটক করেছে পুলিশ, শুধু তাই না তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তার গ্রামের বাড়ীতে অভিযান চালানো হয় এবং বিছানার নীচে ইয়াবা ও অস্ত্র পাওয়া যায়। তাকে জমি নিয়ে বিবাদে জড়িত এক প্রবাসীর পক্ষ নিয়ে পুলিশ ফাঁসিয়েছে বলে দাবি করছে তার কন্যা।

‘মাদক বিরোধী যুদ্ধ’ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে এ ধরনের ঘটনায়। একদল সুবিধাবাদী টাকার জোরে স্বার্থে ব্যবহার করছে প্রশাসনকে। আর প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি টাকার বিনিয়মে অন্যায়ভাবে নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে।

দেশে মাদক আমদানীকারকরা ক্ষমতাবান ও প্রভূত সম্পদের মালিক, শত অভিযোগের পরও তাদের  একজনও ধরা বা মারা পরেনি। তাদের সেফ প্যাসেজের বাইরে রেখে চুনোপুঁটি মেরে কি হবে। কদিন মাদক ব্যবসায় ভাটা পড়বে, কিছুদিন পরে আবার জমে উঠবে।

বিভিন্ন সূত্র সংস্থার সূত্রমতে, গত এক দশক ধরে বদিকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে সরকারি সকল সংস্থার ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা। সরকারি সকল সংস্থাও গোয়েন্দা প্রতিবেদন দিয়েছে এমপি বদির বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালে সরকারি এক তালিকায় বদির নাম উঠে আসে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ওই তালিকায় বলা হয়েছে,আব্দুর রহমান বদির ছত্রছায়ায় আরো অনেকে ইয়াবা ব্যবসা করছেন। এমনকি ২০১৫ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা টেকনাফের শীর্ষ ৭৯ মানব পাচারকারীর তালিকায়ও তার নাম ছিল এক নম্বরে।

দেশে মাদক ইয়াবার গডফাদার ও ব্যবসায়ীর তালিকায় টানা ১০ বছর ধরে ছিল সাংসদ বদির নাম। কিন্তু গত মার্চ মাসে একটি সংস্থার তালিকা থেকে সেই নাম বাদ দেওয়া হয়। তবে সেই তালিকায় বদির পাঁচ ভাই, এক ফুপাতো ভাই, দুই বেয়াই ও এক ভাগ্নের নাম আছে।

এদিকে ইয়াবার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠার শুরু থেকে সরকার দলীয় এ সংসদ সদস্য বারবার ইয়াবার সাথে তিনি কোনভাবেই জড়িত নন বলে দাবি করেছেন। দাবি করেছেন এটি তার ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্র।

বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া সাক্ষাৎকারে সাংসদ বলেছেন ‘অভিযোগ থাকলেও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে, আমি ইয়াবা বা অন্য কোন মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিছু মিডিয়াও ইয়াবা ব্যবসা করছে। সাংবাদিকরাও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আমি যখন মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেই, তখনই মিডিয়ারা সিন্ডিকেট করে আমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এ কারণে সংসদে আমি চ্যালেঞ্জ করে বক্তব্য দিয়েছি।’

ক্রসফায়ার নিয়ে বদি বলেছেন, ক্রসফায়ার আরও আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য আমাদের সবারই সহযোগিতা করা প্রয়োজন। যুব সমাজকে বাঁচাতে এটা অপরিহার্য।

বিভিন্ন মন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বারবার বলে আসছেন মাদকবিরোধী অভিযানে যে যত বড় নেতাই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অথচ এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

ইয়াবা ও মাদকরোধে চলছে যুদ্ধ। যুদ্ধ তো দুইদলের মধ্যে হয়। কিন্তু সেরকম কিছু না হলেও চলছে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের জন্য হত্যা। ‘মাদকের মূল হোতা বা গডফাদার’ যারা শক্তিশালী তারা এই যুদ্ধে দুধভাত, তাদের ছেড়ে দিয়ে খুচরো ব্যবসায়ী মারলে কি মাদক নির্মূল করা সম্ভব! মাদক দেশে ঢোকার ট্যানেলে গুলিতে নিরছিদ্র পাহারা বসাতে হবে। পাশাপাশি শক্তিশালী দুধভাত বা পেটকাটা মাদক গডফাদারদের নির্মূল করতে হবে। না হলে এদেশ থেকে কখনোই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail