চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দুই পরিবারের দ্বন্দ্বে সাড়ে ৩ বছর মর্গে লিপার লাশ

লিপা রায় আর লাইজু। ধর্ম, জাতপাত আর সমাজের তীব্র বাধা উপেক্ষা করে একে অন্যকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই ভালোবাসাই তাদের জন্য কাল হয়েছে। সমাজের প্রচলিত ধারা বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে তাদের দু’জনকেই।

এখানেই শেষ হয়নি তাদের ভালোবাসার করুণ পরিণতির গল্প। দুই পরিবারের রেষারেষিতে মৃত্যুর সাড়ে ৩ বছর হলে গেলেও লিপার লাশ এখনো পড়ে আছে মর্গে।

হিন্দু ধর্মাবলম্বী লিপার পরিবার বলছে, তার শেষকৃত্য হবে হিন্দু ধর্মমতে। আর লাইজুর পরিবারের দাবি, তাদের পুত্রবধূ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাই তার সৎকার হবে ইসলাম ধর্ম মতে।

এমন যুক্তিতে গত সাড়ে ৩ বছর ধরে রেষারেষিতে লিপ্ত দুই পরিবার। এখন লাশের দখল নিতে চলছে মামলা। যা নিম্ন আদালত ঘুরে বর্তমানে বিচারাধীন উচ্চ আদালতে। আর বিচারাধীন থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও হস্তান্তর করতে পারছেন না লিপার লাশ।

তবে লিপার মরদেহ নিতে অনড় অবস্থানে দুই পরিবার। লাশের দাবি ছাড়তে নারাজ কোনো পক্ষই।

ঘটনা ছিল ২০১৪ সালের। নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার দামুনিয়া ইউনিয়নের লিপা রায় তখন ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সনাতন ধর্মাবলম্বী লিপার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে পার্শ্ববর্তী ৭ নং গোড়াগাড়ি ইউনিয়নের মুসলিম ধর্মাবলম্বী জহুরুল হকের ছেলে লাইজুর সঙ্গে।

সমাজ তাদের সম্পর্ককে মেনে না নেয়ার ভয়ে পালিয়ে যান তারা। এসময় থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন লিপার বাবা অক্ষয় কুমার রায়। ঘটনার ১০/১২ দিন পর লিপাকে উদ্ধার করা হয় নীলফামারী থেকে। সেসময় পলাতক ছিলো লাইজু।

এরপর লিপাকে থানা হেফাজত থেকে কোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক পাঠানো হয় রাজশাহী সেভহোমে। পরবর্তীতে সেখান থেকে নীলফামারী কোর্টে যেদিন লিপা রায়কে হাজির করা হয় সেদিনেই বিষপানে আত্মহত্যা করে লাইজু।

এ ঘটনার পরপরই লিপাকে তার বাবা-মায়ের জিম্মায় দিয়ে দেয়া হয়। বাবার বাড়ি থাকাকালে প্রায় ৩ মাস পরই বিষপানে আত্মাহত্যা করে লিপা।

ঘটনা চাঞ্চল্যকর মোড় নেয় এরপর। ছেলের বাবা জহুরুল হক থানায় একটি মামলা দয়ের করেন।  সেখানে ছেলের বাবা দাবি করেন মেয়েটি তার পুত্রবধূ। মেয়েটি ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছে এবং ইসলামি শরিয়ত মেনেই বিয়ে হয়েছে তাদের। তাই মেয়েটির সৎকার ইসলামি মতেই হবে।

আর মেয়ের বাবা দাবি করেন অপহরণ করে জোরপূর্বক বিয়ে করা হয়েছে তার মেয়েকে। বিয়েটি নিয়ে বৈধতার প্রশ্ন তুলে হিন্দু ধর্মমতেই সৎকার করতে চান মেয়ের মরদেহ।

শুরু হয় আইনী লড়াই। ছেলের বাবা আদালতের আশ্রয় নেন। নিম্ন আদালত ছেলের বাবার আবেদনের পক্ষে রায় দেন। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়ের বাবা আপিল করেন। এবার জেলা আদালতে রায় হয় মেয়ের বাবার পক্ষে।

এ পর্যায়ে ছেলের বাবা পুনরায় উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।

মেয়ের বাবা অক্ষয় কুমার রায় চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “রায় আমাদের পক্ষে হবার পরও আমরা পেয়েও পাচ্ছিনা আমাদের মেয়ের মরদেহ। এ কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার না।

মেয়ে লিপা রায়কে নিয়ে কথা বলতেও কষ্ট হয় বাবা অক্ষয় কুমারের। বাবার শুধু এখন একটাই চাওয়া সনাতন ধর্মমতে মেয়ের মরদেহ সৎকার করা।

লিপা রায়ের মরদেহ নিয়ে কী করবে লাইজুর পরিবার বিষয়টি এখনো বোধগম্য নয় লিপার ভাই মিঠুন সরকারের। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: “আমরা আমাদের বোনের মরদেহ সৎকার করতে চাই। এটা খুব স্বাভাবিক যে বোনের লাশ আমরাই পাবো কিন্তু ছেলের বাবা কেনো যে বোনের লাশ চাইছেন সেই প্রশ্নেও উত্তর এখনো পাইনি।”

চার-ভাইবোনের মধ্যে লিপা ছিলো দ্বিতীয় আর তাই ভাই মিঠুনের সাথে তার সম্পর্কটাও ছিলো অন্যরকম। লিপার স্মৃতি মনে হলে এখনো কষ্ট পান ভাই মিঠুন। সবকিছু ভুলে স্বাভাবিক জীবন চান তিনি।

নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার ৫ নং দামুনিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মনোরঞ্জন রায় চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান: বিষয়টি নিয়ে ছেলের উপজেলা ৭ নং গোদাগাড়ী উপজেলার তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ছেলের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে সমঝোতার মাধ্যমে মেয়ের পরিবারকে লাশ হস্তান্তরের অনুরোধ করা হলেও কর্ণপাত করেননি চেয়ারম্যান ও ছেলের বাবা।

একই কথা বলেন ছেলের ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ। তিনি জানান: শুরু থেকেই বিষয়টি নিয়ে ছেলের বাবা জহুরুল হককে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। “তোমার ছেলেই নাই তুমি মেয়ের লাশ দিয়ে কী করবা?”

তবে ছেলের বাবা জহুরুল হক এলাকার মেম্বার ও প্রভাবশালী হওয়ায় কারো কথাই মানতে রাজি নন। নিজের জেদ  ও ক্ষোভ বজায় রাখতেই লাশের দাবি ছাড়ছেন না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফাইল ছবি

এভাবে লাশটি আটকে রাখার কারণ কী? কেনই বা তারা লাশের দাবি ছাড়তে নারাজ? প্রশ্ন করা হলে ছেলের চাচা শরীফুল জানান, মেয়ে মুসলিম হয়েই আমার ভাতিজাকে বিয়ে করেছে। এ সংক্রান্ত হলফনামার যাবতীয় কাগজও রয়েছে তাদের হাতে।

“আমরা চাই মুসলিম শরীয়ত মোতাবেকই তার দাফন সম্পন্ন হোক।” নিজেদের অবস্থান থেকে কোনভাবেই সরে আসতে রাজি নন ছেলের চাচা।

বলেন: “সনাতন ধর্মাবলম্বী মেয়েটি মুসলিম হয়েই আমার ভাতিজাকে বিয়ে করেছে। আর আমরা কোনভাবেই পারিনা তাকে ধর্ম হারা করতে। তাকে ধর্মহারা করলে সে যেমন জান্নাত হারাবে, অামরাও তেমনি জান্নাত হারাবো।”

এই বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মওদুদ আহমেদ জানান: আদালতকে লাশের বিষয়ে বার বার চিঠি দিয়ে অবহিত করা হলেও আদালতের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগ। এমনকি  মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত লাশটি সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়ে কিছুদিন পর পর আদালত চিঠি দেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

FacebookTwitterInstagramPinterestLinkedInGoogle+YoutubeRedditDribbbleBehanceGithubCodePenEmail